বৃহস্পতিবার, আগস্ট ২০, ২০২৬

৯ হাজার ৩৩৩ কোটি টাকার ১০ প্রকল্প অনুমোদন,গ্রামীণ সড়ক সংস্কারেই সর্বোচ্চ বরাদ্দ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৮-২০ ০০:০৬:২৮
ছবি: সংগৃহীত।

দেশের অবকাঠামো, স্বাস্থ্য, নদীভাঙন প্রতিরোধ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও প্রতিরক্ষা খাতকে গুরুত্ব দিয়ে ৯ হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ১০টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে দেশের গ্রামীণ সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণে সর্বোচ্চ ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার পরিকল্পনা কমিশনের এনইসি সম্মেলন কক্ষে চলতি অর্থবছরের দ্বিতীয় একনেক সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
সভা শেষে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি জানান, অনুমোদিত ১০ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে ৮ হাজার ৪৮৮ কোটি ৭১ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ থেকে ৯৩৬ কোটি ৩৮ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

গ্রামীণ সড়কে বড় বিনিয়োগ
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ‘গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বাস্তবায়িতব্য প্রকল্পটির আওতায় দেশের আট বিভাগের ৬৪ জেলা ও সব উপজেলায় ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ৭ হাজার মিটার সেতু ও কালভার্ট পুনর্বাসন করা হবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, যেসব এলাকায় সড়কের দুরবস্থার কারণে মানুষের চলাচলে বেশি সমস্যা হচ্ছে, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছে। শুধু সংস্কার করেই দায়িত্ব শেষ না করে এসব সড়কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ নিশ্চিত করার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
গ্রামীণ সড়ককে দীর্ঘস্থায়ী করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও থাকছে প্রকল্পে। পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম বছরে ১০০ কিলোমিটার সড়কে রাবার-বিটুমেন প্রযুক্তি প্রয়োগ করা হবে। এর ফলাফল সন্তোষজনক হলে পরবর্তী সময়ে এর ব্যবহার বাড়ানো হবে।

ঢাকা মেডিকেলে নতুন অবকাঠামো
স্বাস্থ্য খাতেও নেওয়া হয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। ঢাকা মেডিকেল কলেজের পুরোনো ও ব্যবহার অনুপযোগী ভবন, ছাত্রাবাস এবং অন্যান্য স্থাপনা প্রতিস্থাপন ও পুনর্নির্মাণে ১ হাজার ১৫৪ কোটি ৮৩ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের আগস্ট পর্যন্ত সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে।
এ ছাড়া ১০টি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের জন্য ১৯টি আধুনিক ছাত্রাবাস নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধন অনুমোদন পেয়েছে। এতে অতিরিক্ত ২০১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হবে।

নদীভাঙন ও উপকূল রক্ষায় দুই প্রকল্প
নদীভাঙন ও উপকূলীয় ঝুঁকি মোকাবিলায়ও বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। লালমনিরহাট সদর উপজেলা ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন থেকে রক্ষায় ২৯৮ কোটি ৬৫ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট পর্যন্ত উপকূলীয় বাঁধ শক্তিশালী করতে ব্যয় হবে ৫৫৮ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

সেতু রক্ষণাবেক্ষণে প্রযুক্তির ব্যবহার
সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের অধীনে ১১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকার ‘সেতুর স্মার্ট রক্ষণাবেক্ষণ প্রযুক্তির সক্ষমতা উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। কোরিয়া আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার সহায়তায় প্রাথমিকভাবে চারটি সেতুর কাঠামোগত অবস্থা আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হবে।
এর ফলে সেতুর ক্ষয়ক্ষতি বড় আকার নেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। ভবিষ্যতে বড় সেতু, টানেলসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকেও এই ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

সৌরবিদ্যুৎ ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও দুটি প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে। জামালপুরের মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনে অতিরিক্ত ১০১ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া ঢাকায় ডেসকোর আওতাধীন এলাকায় বিদ্যুৎ অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে অতিরিক্ত ৬২৭ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ের অনুমোদন মিলেছে।
সরকারের পাঁচ বছরের মেয়াদে ১০ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য রয়েছে বলে জানান পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী।

রামু সেনানিবাসে অবকাঠামো উন্নয়ন
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে রামু সেনানিবাসের অবকাঠামো উন্নয়নে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৫৩ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে।
এ ক্ষেত্রে পাহাড় কেটে জমি সমতল না করে বিদ্যমান ভূপ্রকৃতি অক্ষুণ্ন রেখে ভবন নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রাকৃতিক উচ্চতা ও ভূমির বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে স্থাপনার নকশা করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রকল্প গ্রহণে আসছে নতুন পদ্ধতি
একনেক সভায় প্রকল্পের পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পরিকল্পনা প্রক্রিয়ায় পরিবর্তনের কথাও তুলে ধরা হয়েছে। পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জানান, বিচ্ছিন্ন প্রকল্পনির্ভর পদ্ধতি থেকে সরে গিয়ে একই ধরনের প্রকল্পকে কর্মসূচিভিত্তিক গুচ্ছের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এতে একই ধরনের কাজের পুনরাবৃত্তি চিহ্নিত করার পাশাপাশি কোন এলাকায় কী ধরনের উন্নয়ন ঘাটতি রয়েছে, সেটিও সহজে নির্ধারণ করা যাবে। ইতোমধ্যে ৪১টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে সময় ও ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও নতুন কাঠামো তৈরির কথা জানিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিটি প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সমন্বিত নজরদারি ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো যুক্ত থাকবে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারের পাঁচ বছরের কৌশলগত লক্ষ্য হলো অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, উত্তরণ, পুনর্গঠন এবং প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশকে ভঙ্গুরতা থেকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়া। একই সঙ্গে দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিস্তার এবং জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে বড় অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

একনেক, উন্নয়ন, গ্রামীণ সড়ক


এ জাতীয় আরো খবর