রবিবার, মে ৩১, ২০২৬

টাঙ্গাইলে নদীতে ফেলা হলো কোরবানির চামড়া

  • আব্দুস সাত্তার,
  • ২০২৬-০৫-৩১ ২১:৩৮:৫২

প্রতিনিধি টাঙ্গাইল:
টাঙ্গাইলে বাড়তি প্রসেসিং খরচ, তীব্র অর্থসংকট এবং মাঠপর্যায়ে কার্যকর মনিটরিংয়ের অভাবে প্রতিবছরের মতো এবারও কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বাজারে চরম অস্থিরতা ও ধস নেমেছে। চামড়া কিনে বিক্রি করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়ে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন রহিজ আলী নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী। সরকার নির্ধারিত দাম কেবল লবণযুক্ত চামড়ার জন্য প্রযোজ্য হওয়ায় এবং কাঁচা চামড়া সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও পরিবহনে অতিরিক্ত ব্যয়ের অজুহাতে আড়তদাররা ন্যায্যমূল্য দিচ্ছেন না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা পণ্যের আধিপত্য ও বকেয়া টাকা না পাওয়ার কারণে ট্যানারি মালিক ও বড় ব্যবসায়ীরা চামড়া কেনায় অনীহা দেখাচ্ছেন। ফলে চামড়ার প্রকৃত হকদাররা বঞ্চিত হচ্ছেন এবং নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ জাতীয় সম্পদ। 
সরেজমিনে দেখাগেছে, টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার শিল্পাঞ্চল খ্যাত বল্লা এলাকায় কাঁচা চামড়া কিনে বিক্রি করতে না পারায় লোকসানের মুখে পড়ে সংগ্রহ করা কাঁচা চামড়া নদীতে ফেলে দিয়েছেন রহিজ আলী নামে এক মৌসুমি ব্যবসায়ী। গত শুক্রবার (২৯ মে) বিকালে বল্লা সেতুর নিচ দিয়ে প্রবাহিত লাঙ্গুলিয়া নদীতে তিনি বেশ কয়েকটি গরুর চামড়া ফেলে দেন। 
ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ী রহিজ আলী জানান, তিনি লাভের আশায় জেলার চর ও পাহাড়ি অঞ্চলের বাড়ি বাড়ি ঘুরে দিনভর চামড়া সংগ্রহ করে বল্লা ইউনিয়ন পরিষদ এলাকায় জমা করেছিলেন। কিন্তু দিনশেষে কোনো পাইকার বা আড়তদার চামড়া কিনতে আসেননি। শেষ পর্যন্ত চামড়া সংরক্ষণ বা লবণের বাড়তি খরচ জোগাতে না পেরে এবং কোনো ক্রেতা না পেয়ে তিনি তা নদীতে ফেলে দিতে বাধ্য হন। এতে তার প্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার মূলধন খোয়া গেছে। 
এদিকে, রোববার(৩১ মে) টাঙ্গাইল জেলার চামড়া কেনাবেচার সবচেয়ে বড় ও ঐতিহ্যবাহী কেন্দ্র ঘাটাইল উপজেলার পাকুটিয়া হাটেও চামড়ার মূল্য বিপর্যয় ও ক্রেতা সংকট লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবছর কোরবানির ঈদের পর এই হাটে কোটি কোটি টাকার কাঁচা চামড়া কেনাবেচা হয়। ঢাকা, নাটোর, ময়মনসিংহ সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ট্যানারি প্রতিনিধি ও বড় পাইকাররা এখানে চামড়া সংগ্রহ করতে আসেন। তবে সপ্তাহের রোব ও বুধবার বসা বৃহৎ এ চামড়ার হাটে এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ও হতাশাজনক। 
পাকুটিয়া হাটে গিয়ে দেখা যায়, চাহিদার চেয়ে পশুর চামড়ার জোগান অনেক বেশি থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা একেবারেই সীমিত। হাটে আসা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা জানান, কাঁচা চামড়া নিয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকলেও পাইকাররা সরকার নির্ধারিত দামের অর্ধেক দামও বলছেন না। তাদের দাবি- লবণ ও শ্রমিকের মজুরি অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তারা বেশি দামে কাঁচা চামড়া কিনতে হিমশিম খাচ্ছেন। বাস্তবভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের অভাব এবং বাজার উন্মুক্ত না থাকায় পাকুটিয়ার এই বিশাল হাটেও চামড়া অবহেলায় নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। 
বল্লার চামড়াপট্টীর মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. শামছুল, মো. লাভলু মিয়া, লিটন মিয়া, আজগর আলী সহ অনেকেই জানান, নতুন সরকার চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে। তারা ভেবেছিলেন, কেনার অন্তত কাছাকাছি দাম পাওয়া যাবে। টার্গেট ছিল, প্রতি চামড়ায় ৫০ টাকা লাভ করবেন। কিন্তু অপেক্ষা আর শেষ হচ্ছেনা। চামড়া বিক্রি করতে না পেরে কেউ কেউ নদীতে ফেলে দিচ্ছেন বা মাটিতে পুঁতে ফেলছেন। 
তারা জানান, এখন তারা চামড়ায় লবন মেখে সংরক্ষণ করছেন। লবনের দাম বেশি ও কৃত্তিম সংকট থাকায় বেশি চামড়া তারা সংরক্ষণ করতে পারছেন না। এই চামড়ায় আরও দুইবার লবন মেখে রোদে শুকিয়ে প্রায় দুই মাস সংরক্ষণ করে পরে ঢাকার ট্যানারিতে বিক্রি করবেন। 
চামড়ার পাইকারি ক্রেতা বল্লা গ্রামের আলী হোসেন জানান, স্থানীয় পর্যায়ে চামড়া সংরক্ষণের ব্যবস্থা জোরদার করা, বাজার সিন্ডিকেট ভাঙা এবং কাঁচা চামড়ার বাস্তবসম্মত মূল্য নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই চামড়া শিল্প অচিরেই আরও বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে।
চামড়া শিল্প সংশ্লিষ্ট স্থানীয়রা মনে করছে, কাঁচা চামড়া দ্রুত প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য প্রয়োজনীয় লবণ, শ্রমিকের মজুরি এবং পরিবহন খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ঢাকার সাভারের ট্যানারি মালিকদের কাছে স্থানীয় বড় আড়তদারদের কোটি কোটি টাকা বকেয়া পড়ে আছে। নগদ টাকার অভাবে তারা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া কিনতে পারছেন না। এছাড়া আন্তর্জাতিক বাজারে চীনা সিন্ডিকেট ও পণ্যের একচেটিয়া আধিপত্যের কারণে দেশের ব্যবসায়ীরা চামড়ার সঠিক রপ্তানি মূল্য পাচ্ছেন না। সরকার যে দাম নির্ধারণ করে, তা মূলত লবণযুক্ত চামড়ার জন্য। ফলে মাঠপর্যায়ে সরাসরি কাঁচা চামড়ার কোনো বাস্তবভিত্তিক মূল্য কাঠামো থাকে না। 
সংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়া নষ্ট হওয়া ঠেকাতে এবং মান ধরে রাখতে সনাতন পদ্ধতির চেয়ে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি ব্যবহার করা জরুরি। চর্বি পরিষ্কার থাকলে চামড়া সহজে পচে না এবং লবণের কার্যকারিতা বাড়ে। রোদ বা স্যাঁতসেঁতে মাটিতে না শুকিয়ে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রিত ড্রায়ারে চামড়া শুকালে আর্দ্রতা সঠিক মাত্রায় থাকে এবং চামড়ার গুণগত মান অক্ষুন্ন থাকে। 
তাদের মতে, টাঙ্গাইলের পাকুটিয়া বা এর আশেপাশে সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কোরবানির সময়ে সাময়িক চামড়া সংরক্ষণের জন্য বিশেষ হিমাগার গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবিতে পরিণত হয়েছে। ট্যানারি মালিকদের কাছ থেকে আড়তদারদের বকেয়া টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করা এবং ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে ঈদের আগে ব্যবসায়ীদের সহজ শর্তে নগদ ঋণ দেওয়া হলে এ ব্যবসায় প্রাণ ফিরে আসতে পারে। এছাড়া মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যাতে চামড়া ছাড়ানোর ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার মধ্যে সঠিক নিয়মে লবণ দিতে পারেন- সেজন্য সরকারিভাবে বিনামূল্যে বা সুলভ মূল্যে লবণ বিতরণ এবং মনিটরিং জোরদার করা অত্যাবশ্যক হয়ে পড়েছে। 
কালিহাতী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. খায়রুল ইসলাম জানান, কালিহাতী উপজেলায় সরকারের তরফ থেকে চামড়া ব্যবসায়ীদের সহযোগিতার জন্য বিনামূল্যের লবন এসেছিল। তারা চামড়া ব্যবসায়ীদের মাঝে তা বিতরণ করেছেন- তবে সবাইকে দেওয়া সম্ভব হয়নি। ব্যবসায়ীরা যাতে কাঁচা চামড়া ভালোভাবে সংরক্ষণ করতে পারে সে দিকে তারা খেয়াল রাখছেন।

 


এ জাতীয় আরো খবর