ঢাকা-২০ জুন ২০২৫
চলমান ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে তেল আবিবকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দিতে নতুন করে ১৪টি সামরিক কার্গো বিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি। তুর্কি সংবাদমাধ্যম আনাদোলু এজেন্সির এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনীর ‘অপারেশনাল রেডিনেস’-অর্থাৎ সামরিক প্রস্তুতি ও হামলা সক্ষমতাকে সমর্থন দিতেই এসব চালান পাঠানো হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং জার্মানির যৌথ উদ্যোগে পাঠানো সামরিক সরঞ্জামবাহী এই বিমানগুলো সরাসরি ইসরায়েলের বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে পৌঁছেছে।
আনাদোলুর মতে, ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর গাজা উপত্যকায় হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৮০০টিরও বেশি সামরিক কার্গো বিমান ইসরায়েল পৌঁছেছে, যা এ অঞ্চলে বাইরের সহায়তায় পরিচালিত সবচেয়ে বড় সামরিক সরবরাহ কার্যক্রম হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, ১৩ জুন ইরানের বিরুদ্ধে পাল্টা হামলা শুরুর পর থেকেই তাদের মিত্র দেশগুলো সমুদ্র ও আকাশপথে সহায়তা পাঠিয়ে যাচ্ছে। তবে তারা স্পষ্ট করেনি, সামরিক সরঞ্জামের ধরন কী ছিল।
ইসরায়েলি এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেন, “আমরা যুদ্ধক্ষেত্রে যা ব্যবহার করছি, তার অধিকাংশই আমাদের মিত্রদের কাছ থেকে এসেছে। কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা তা বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করছি না।”
শুক্রবার ভোরে ইসরায়েল যে বিমান হামলা চালিয়েছে, তার জবাবে ইরানও ক্ষিপ্তভাবে পাল্টা প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে, ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় অন্তত ২৫ জন নিহত এবং শতাধিক আহত হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানের তথ্য অনুসারে, ইসরায়েলি বিমান হামলায় তাদের ৬৩৯ জন নাগরিক নিহত এবং ১,৩০০ জনেরও বেশি আহত হয়েছে।
এই তথ্যগুলোর স্বতন্ত্র যাচাই এখনো সম্ভব হয়নি, তবে উভয় পক্ষই ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির দাবি করছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এখন হতাহতদের সংখ্যা ও যুদ্ধাপরাধ সম্পর্কিত তদন্ত শুরুর আহ্বান জানিয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানির এই সরাসরি সামরিক সহায়তা কেবল ইসরায়েলের পাশে অবস্থান নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে নতুন মেরুকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে। যেহেতু চীন, রাশিয়া ও তুরস্ক ইরানের পক্ষে পরোক্ষ সমর্থন দিচ্ছে, তাই এক ধরনের "নতুন স্নায়ুযুদ্ধ পরিস্থিতি" তৈরি হচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ড. ইয়াহিয়া ফারুক বলেন, "এই যুদ্ধ কেবল ইসরায়েল-ইরান সংঘর্ষ নয়। এটা বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন বলয়ের জন্ম দিচ্ছে। পশ্চিমা শক্তি যেখানে সরাসরি তেল আবিবকে অস্ত্র দিচ্ছে, সেখানে চীন-রাশিয়া মুখে না বললেও তেহরানকে ঘিরেই তাদের কৌশলিক স্বার্থ রক্ষায় সচেষ্ট।"
যুদ্ধের ভয়াবহতায় দুই দেশেই বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী বেসামরিক স্থাপনায় হামলা জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। ইতোমধ্যেই জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল একটি তদন্ত টিম পাঠানোর পরিকল্পনা করছে।
এই মুহূর্তে যা হচ্ছে, তা নিছক সামরিক প্রতিক্রিয়ার বেশি কিছু। যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানি একদিকে ইসরায়েলকে সামরিক সাহায্য দিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করছে, অন্যদিকে ইরানও নতুন নতুন মিসাইল পরীক্ষা ও পাল্টা হামলা চালিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে।
চূড়ান্ত প্রশ্ন হচ্ছে-এই সংঘাত কতদূর যাবে? শুধু ইরান-ইসরায়েলেই থেমে থাকবে, না কি এই আগুনে জড়িয়ে পড়বে পুরো অঞ্চল?
সংবাদ সারাংশ:
১৪টি নতুন সামরিক কার্গো বিমান পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র-জার্মানি
২০২৩ থেকে এখন পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে ৮০০+ সামরিক বিমান
ইরান-ইসরায়েল পাল্টাপাল্টি হামলায় দুই পক্ষেই বহু হতাহত
জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো যুদ্ধাপরাধ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে
বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের আশঙ্কা দিন দিন বাড়ছে