রবিবার, সেপ্টেম্বর ২০, ২০২৬

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে মুসলিম দেশগুলোকে ভূমি ছাড়ার পরামর্শ মার্কিন রাষ্ট্রদূতের,সমালোচনার ঝড়

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৬-১১ ১৩:৫২:১৩
ছবি সংগৃহিত

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনে মুসলিম দেশগুলোর ভূমি ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন ইসরায়েলে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি। সম্প্রতি বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “মুসলিম দেশগুলোর কাছে ইসরায়েলের তুলনায় ৬৪৪ গুণ বেশি জমি রয়েছে। তাই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়তে তারা কিছু জমি ছাড়তে পারে।”
এই মন্তব্য ঘিরে আন্তর্জাতিক পরিসরে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। হাকাবি বলেন, “যদি সত্যিই ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা থাকে, তবে মুসলিম দেশগুলোর কেউ বলতে পারে-এই রাষ্ট্র আমাদের এখানে গড়ে তোলা হোক।”
রাষ্ট্রদূতের এই বক্তব্য দুই রাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানকে কার্যত অস্বীকার করার সামিল বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। কারণ এ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে জাতিসংঘ, দীর্ঘদিন ধরে পশ্চিম তীর, গাজা ও পূর্ব জেরুজালেমকে নিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পক্ষে কথা বলে আসছে।
এ বিষয়ে হাকাবির ব্যাখ্যা, “পশ্চিম তীরেই কেন রাষ্ট্র হতে হবে? মুসলিম দেশগুলো এত বিশাল ভূখণ্ডের মালিক, সেখানেই তো ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ে তোলা যেতে পারে।”
তবে হাকাবির এই বক্তব্য যে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারিভাবেই গৃহীত নয়, সেটিও স্পষ্ট করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ট্যামি ব্রুস। তিনি বলেন, “রাষ্ট্রদূত হাকাবির মন্তব্য তার ব্যক্তিগত মত। মধ্যপ্রাচ্য নীতি নির্ধারণ করেন প্রেসিডেন্ট।”
সম্প্রতি পশ্চিম তীরে সহিংসতা উসকে দেওয়ার অভিযোগে ইসরায়েলের দুই ডানপন্থী মন্ত্রী ইতামার বেন-গভির ও বেজালেল স্মোটরিচ-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে যুক্তরাজ্য, নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা ও নিউজিল্যান্ড। এই নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন হাকাবি। তিনি একে “চমকে দেওয়ার মতো সিদ্ধান্ত” বলে মন্তব্য করেন এবং বলেন, “আমি আজও কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা পাইনি-কেন একটি সার্বভৌম দেশের নির্বাচিত দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে এমন ব্যবস্থা নেওয়া হলো। তারা কোনো অপরাধ করেননি।”
বিবিসি’র আরেক প্রশ্নের জবাবে হাকাবি বলেন, “আমি বলছি না যে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র কখনোই হতে পারে না। তবে সংস্কৃতি বদলাতে হবে। এখন যে সংস্কৃতি বিদ্যমান, সেখানে ইহুদিদের হত্যা করা বৈধ মনে করা হয় এবং তা পুরস্কৃতও হয়। এই মনোভাব পরিবর্তন না হলে রাষ্ট্র গঠন অর্থহীন।”
এই মাসের শেষে নিউইয়র্কে জাতিসংঘে সৌদি আরব ও ফ্রান্সের উদ্যোগে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের একটি শান্তির রোডম্যাপ বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। তবে হাকাবি এই উদ্যোগকেও “অপ্রাসঙ্গিক ও সময়োপযোগী নয়” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তার ভাষায়, “একটি যুদ্ধরত অবস্থায় এমন কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া ইসরায়েলের নিরাপত্তার জন্য হুমকি ডেকে আনবে।”
হাকাবি বহু আগে থেকেই ‘গ্রেটার ইসরায়েল’ ধারণার প্রবক্তা হিসেবে পরিচিত। তিনি দখলকৃত পশ্চিম তীরকে ‘জুদিয়া ও সামারিয়া’ নামে উল্লেখ করে থাকেন এবং সেখানে ইসরায়েলি কর্তৃত্ব চিরস্থায়ী করার পক্ষে। এই দৃষ্টিভঙ্গি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের সম্পূর্ণ পরিপন্থী বলে মনে করেন বহু মানবাধিকার সংগঠন ও ইউরোপীয় সরকার।
এদিকে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের অক্টোবর থেকে চলমান ইসরায়েলি হামলায় এ পর্যন্ত ৫৪ হাজার ৯২৭ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘের তথ্য বলছে, নিহতদের মধ্যে অন্তত এক-চতুর্থাংশ শিশু।

মাইক হাকাবির বিতর্কিত মন্তব্য ও অবস্থান দুই রাষ্ট্রভিত্তিক শান্তিপ্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তুলছে বলেই মনে করছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিকরা। তার বক্তব্য ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায্য রাষ্ট্রীয় অধিকার বাস্তবায়নের বদলে সংকট আরও ঘনীভূত করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকেই।

সূত্র: বিবিসি, ব্লুমবার্গ, আল-জাজিরা

 


এ জাতীয় আরো খবর