মঙ্গলবার, জুলাই ২৮, ২০২৬

রাফাহতে ত্রাণ কেন্দ্রে ক্ষুধার্ত জনতা,ইসরায়েলি গুলিতে আহত বহু: সহানুভূতির বদলে গুলি!

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
  • ২০২৫-০৫-২৮ ১৬:১১:৩১
ছবি সংগৃহিত

গাজার দক্ষিণাঞ্চলীয় রাফাহ শহরে মার্কিন-সমর্থিত এক ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রে মঙ্গলবার এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ক্ষুধার্ত হাজারো ফিলিস্তিনি সাহায্যের আশায় সেখানে ছুটে এলে ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর গুলিতে আহত হন বহু মানুষ। স্থানীয় সূত্র ও গাজা মিডিয়া অফিস এমন চিত্রই তুলে ধরেছে।
বিতর্কিত ‘বাফার জোনে’ স্থাপিত এই ত্রাণ বিতরণ কেন্দ্রটিকে কেন্দ্র করে শুরুতেই বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। ‘গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন’ (জিএইচএফ) নামের একটি মার্কিন সমর্থিত প্রতিষ্ঠান মঙ্গলবার বিকেলে তাল আল-সুলতান ও মোরাগ করিডোর এলাকায় এই বিতরণ কেন্দ্র চালু করে। তবে মানবিক সাহায্যের নামে এই আয়োজন যেন পরিণত হয় এক দুঃসহ বিভীষিকায়।
গাজা মিডিয়া অফিস জানিয়েছে, “এই উদ্যোগ স্পষ্টভাবে ব্যর্থ হয়েছে। অনাহার ও অবরোধের নামে তৈরি করা সংকটকে ব্যবহার করে ফিলিস্তিনিদের মধ্যে আরেক দফা বিভ্রান্তি ও সহিংসতা তৈরি করা হয়েছে।”
বিবৃতিতে বলা হয়, হাজার হাজার মানুষ যখন খাবারের জন্য ছুটে আসে, তখন ইসরায়েলি সেনারা গুলি চালায়। আহতদের অনেকেই নারী ও শিশু। মিডিয়া অফিসের ভাষ্য অনুযায়ী, “এই ঘটনা প্রমাণ করে, ইসরায়েল দখলদার বাহিনী প্রকৃত অর্থে সংকট সমাধানে নয়, বরং ক্ষুধাকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে।”
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঘটনার সময় অসংখ্য মানুষ নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে কেন্দ্রের ভিতরে প্রবেশ করে। একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “মানুষ নিজের জীবন বাজি রেখে খাবার নিতে আসে। ক্ষুধার্ত জনতার চাপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এরপরেই শুরু হয় গুলি।”
এক নারী বলেন, “ক্ষুধা আর দারিদ্র্য সবাইকে গ্রাস করেছে। মানুষ এতটাই অসহায় যে খাবারের জন্য মৃত্যুর মুখেও যেতে প্রস্তুত।”
জিএইচএফ-এর বিতরণ নীতিতেও রয়েছে কড়াকড়ি। শুধুমাত্র নির্দিষ্ট পরিচয় যাচাই ও হামাস সংশ্লিষ্টতা স্ক্রিনিং পার হলেই মিলছে খাবার। জাতিসংঘ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই ব্যবস্থাকে ‘মানবিক নীতির পরিপন্থী’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
জাতিসংঘের মুখপাত্র স্তেফান দুজারিক জানান, “এই ঘটনাগুলোর ভিডিও আমাদের হৃদয় ভেঙে দিয়েছে। আমাদের একটি সংগঠিত পরিকল্পনা আছে যার মাধ্যমে নিরাপদে ত্রাণ পৌঁছানো সম্ভব।”
জিএইচএফ জানিয়েছে, তারা এই সপ্তাহে দক্ষিণ ও মধ্য গাজায় চারটি কেন্দ্র স্থাপন করতে চায় এবং প্রায় ১০ লাখ মানুষকে খাওয়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে এই বিতরণ ব্যবস্থায় সেনাবাহিনীর উপস্থিতি, অস্ত্রধারী নিরাপত্তা বাহিনী এবং স্ক্রিনিং প্রক্রিয়া মানবাধিকার প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
গাজা মিডিয়া অফিস ইসরায়েলের বিরুদ্ধে মানবিক ত্রাণকে রাজনৈতিক ব্ল্যাকমেইলের অস্ত্রে পরিণত করার অভিযোগ এনেছে। তাদের মতে, “এই কেন্দ্রগুলো অনাহার দীর্ঘায়িত করার মাধ্যমে ফিলিস্তিনি সমাজকে ভাঙার একটি সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।”
সংস্থাটি জাতিসংঘ ও নিরাপত্তা পরিষদকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেছে, “ত্রাণ কেন্দ্রের নামে এই মানবিক অপরাধ বন্ধ করতে হবে, সীমান্ত খুলে দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোকে নিরপেক্ষভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।”
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমগুলোর বরাতে জানা যায়, বিশৃঙ্খলার পরপরই ‘জিএইচএফ’-এর মার্কিন কর্মীদের সরিয়ে নেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ওই এলাকায় ইসরায়েলি সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। ঘটনাটি কতটা ‘মানবিক’ উদ্যোগ ছিল তা নিয়েই প্রশ্ন উঠেছে আন্তর্জাতিক মহলে।
ইসরায়েলের লাগাতার হামলায় ইতোমধ্যেই নিহত হয়েছে ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি, যাদের অধিকাংশই নারী ও শিশু। গাজা এখন এক মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে। ২ মার্চ থেকে ক্রসিং বন্ধ থাকায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।
জাতিসংঘের সব অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে ইসরায়েল এখনো হামলা অব্যাহত রেখেছে। আর সেই হামলার মধ্যেই চালু হওয়া তথাকথিত ত্রাণ কেন্দ্র আজ হয়ে উঠেছে নতুন এক লজ্জাজনক অধ্যায়।

 


এ জাতীয় আরো খবর