আত্রাই নদীর ভারতীয় অংশে নতুন নির্মিত বাঁধ ভেঙে পড়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গ রাজনীতিতে নতুন উত্তাপ ছড়িয়েছে। বাঁধ ভাঙার দায় রাজ্যের বাইরে ঠেলে দিয়ে সরাসরি না বললেও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশ এবং রাজ্য সিকিমকে ইঙ্গিত করে কড়া বক্তব্য দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
বুধবার (২১ মে) জলপাইগুড়ির উত্তরকন্যা প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠিত এক প্রশাসনিক সভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “আমাদের একটি সীমান্তবর্তী দেশ রয়েছে, তার নাম বলছি না। তারা চীনের সঙ্গে মিলে একটি বাঁধ নির্মাণ করেছে, যার ফলে দক্ষিণ দিনাজপুর, বিশেষ করে বালুরঘাট অঞ্চলে আত্রাই নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।”
মমতার মন্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, তিনি বাংলাদেশ-চীন যৌথভাবে নির্মিত রাবার ড্যামকে দায়ী করছেন আত্রাই নদীর ভারতীয় অংশে পানির ঘাটতির জন্য। তিনি বলেন, “আমরা বহুবার কেন্দ্রীয় সরকারকে জানিয়েছি এই বাঁধ সম্পর্কে, কিন্তু তখন কিছু বলা হয়নি। এখন যখন আমাদের বাঁধ ভেঙেছে, তখন আমাদেরই কাঠগড়ায় তোলা হচ্ছে।”
আত্রাই নদী বাংলাদেশ থেকে উৎপত্তি হয়ে ভারতের দক্ষিণ দিনাজপুর হয়ে আবার বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ২০২২ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার বালুরঘাটের চকভৃগু এলাকায় বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করে। প্রায় ৩০ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত এ বাঁধ চলতি বছরের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়।
কিন্তু ফেব্রুয়ারিতেই বাঁধটির গার্ডওয়ালে প্রথমবারের মতো ধস দেখা দেয়। অস্থায়ীভাবে মেরামতের পর চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার ভোররাতে আবারও নদীর প্রবল স্রোতে বাঁধের প্রায় ৪০ ফুট অংশ ধসে পড়ে। রাজনৈতিক বিরোধী পক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে রাজ্য সরকারের প্রকৌশল ত্রুটিকেই দায়ী করে।
বাঁধ ধসের ঘটনায় কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের মধ্যে দোষারোপ শুরু হয়। বালুরঘাটের বিজেপি সংসদ সদস্য এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ঘটনাস্থলে গিয়ে রাজ্য সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেন। এর পরদিনই মুখ্যমন্ত্রী প্রশাসনিক সভায় আক্রমণাত্মক ভঙ্গিতে এ বিষয়ে নিজের বক্তব্য তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, “যখন আত্রাই নদীর পানি পুরোপুরি আটকে দেওয়া হলো, তখন তো কেন্দ্রীয় সরকার কিছু বলল না। এখন আমরা সমস্যার মধ্যে পড়লে সবাই সমালোচনা করছে।”
আত্রাই প্রসঙ্গ টানতে গিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে তিস্তা নদীর বিষয়টিও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “সিকিমে ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প চালু হয়েছে, যার ফলে তিস্তার স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে বাংলার উত্তরাঞ্চলে বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে।”
সিকিম এবং কেন্দ্রকে উদ্দেশ্য করে মমতা আরও বলেন, “সবাই নিজের সুবিধা নিয়ে চলছে। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গকেও তো দেখতে হবে। অন্য কেউ যদি বাংলার উপর নিঃশ্বাস ফেলে, তাহলে আমরা কিন্তু চুপ করে থাকব না। আমাদের সহনশীলতা যেন কেউ দুর্বলতা ভাবে না।”
বিশ্লেষকরা বলছেন, নদীর বাঁধ নিয়ে এমন হঠাৎ উত্তেজনা শুধু প্রকৌশল ব্যর্থতা নয়, এর গভীরে রয়েছে আঞ্চলিক পানি-রাজনীতির একটি বড় সংকেত। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে নদী ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই স্পর্শকাতরতা কাজ করছে।
তিস্তা চুক্তি এখনো আলোর মুখ না দেখায় বাংলাদেশও দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে। অন্যদিকে,পশ্চিমবঙ্গ বারবার প্রতিবেশী দেশের বাঁধ প্রকল্প নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে আসছে।
এই অবস্থায় আত্রাই বাঁধ ধসের ঘটনা শুধু এক প্রান্তিক এলাকার সমস্যা নয়-এটি এখন এক বহুমাত্রিক রাজনৈতিক বিতর্কে পরিণত হয়েছে, যার প্রভাব পড়তে পারে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও।