রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন জানিয়েছেন, ইউক্রেনের সঙ্গে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির খসড়া নিয়ে আলোচনায় বসতে প্রস্তুত মস্কো। এই চুক্তিতে যুদ্ধবিরতি এবং সংঘাত নিষ্পত্তির মৌলিক নীতিমালা অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে বলে জানান তিনি। এমন এক সময় এ ঘোষণা এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টার টেলিফোন আলাপ শেষ করেছেন পুতিন।
সোমবার রাতে রুশ সংবাদমাধ্যমে দেওয়া এক ব্রিফিংয়ে পুতিন বলেন, “আমরা একটি কার্যকর ও সময়সীমানির্ধারিত শান্তিচুক্তির খসড়া তৈরিতে প্রস্তুত। এতে দ্বন্দ্ব সমাধানের রূপরেখা এবং প্রয়োজনে যুদ্ধবিরতির বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।”
পুতিন-ট্রাম্প ফোনালাপের পর ট্রাম্প নিজের সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যালে’ লিখেছেন, আলোচনাটি অত্যন্ত গঠনমূলক হয়েছে এবং রাশিয়া ও ইউক্রেন খুব শিগগিরই যুদ্ধবিরতির জন্য আলোচনায় বসতে পারে। তিনি বলেন, “সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যুদ্ধের অবসান ঘটানো। সেটাই এখন প্রধান লক্ষ্য।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পুতিনের এই নমনীয় অবস্থান একদিকে আন্তর্জাতিক চাপের ফল, অন্যদিকে ট্রাম্পের সঙ্গে নিয়মিত কূটনৈতিক সংলাপের একটি কৌশলগত অগ্রগতি।
তিন দিন আগে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি বৈঠকে ১ হাজার বন্দি বিনিময়ের বিষয়ে চুক্তি হয়। একইসঙ্গে দুই পক্ষ একটি সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতির কাঠামো নিয়ে কাজ করতে সম্মত হয়। এই আলোচনা পটভূমিতে ট্রাম্প-পুতিন ফোনালাপটিকে গুরুত্বপূর্ণ বলছে ক্রেমলিন।
রাশিয়ার প্রেস সচিব দিমিত্রি পেসকভ বলেন, “আমরা ইতোমধ্যেই কিছু অগ্রগতি দেখছি। এই যোগাযোগগুলোই একটি সম্ভাব্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ভিত্তি হতে পারে।”
এ বছরের ১৮ মার্চে পুতিন ও ট্রাম্পের আগের ফোনালাপে ট্রাম্প ৩০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন, যা রাশিয়া মেনে নেয়। তবে ইউক্রেন সেই সময় প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং হামলা অব্যাহত রাখে। এমনকি রাশিয়ার পক্ষ থেকে ইস্টার সানডে ও বিজয় দিবসে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলেও বাস্তবে তা কোনো ফল দেয়নি।
আরও আগে, ১২ ফেব্রুয়ারির আরেক ফোনালাপে দুই নেতা রাশিয়া-মার্কিন সম্পর্কের বিভিন্ন দিক ও ইউক্রেন সংকট নিয়ে আলোচনা করেছিলেন। সেসময় ভবিষ্যতে সরাসরি বৈঠকের সম্ভাবনাও আলোচিত হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, অর্থনৈতিক চাপ এবং যুদ্ধের দীর্ঘায়িত প্রকৃতি রাশিয়াকে একধরনের কৌশলগত নমনীয়তায় বাধ্য করছে। যদিও মস্কোর অবস্থান এখনও স্পষ্টভাবে নির্ভর করছে ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর আন্তরিকতা ও সংযমের ওপর।
ইউরোপীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক আন্দ্রেয়াস হফম্যান বলেন, “পুতিন এখনো পুরনো ধাঁচেই কথা বলছেন, তবে এখন তাঁর কথার ভেতরে সমঝোতার জায়গা খোঁজা যাচ্ছে, যা আগে ছিল অনুপস্থিত। এটি ইতিবাচক হলেও বাস্তবতা নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ের বাস্তবায়নের ওপর।”
যদিও রাশিয়ার ঘোষণাটি শান্তির সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দিয়েছে, তবে এখনো অনেক প্রশ্ন রয়েছে। ইউক্রেনের প্রতিক্রিয়া কী হবে? পশ্চিমা দেশগুলো এই আলোচনাকে কীভাবে নেবে? এবং ভবিষ্যতের আলোচনায় আদৌ কোনো বাস্তব সমঝোতা সম্ভব হবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
তবে এটুকু স্পষ্ট-দীর্ঘ যুদ্ধের ক্লান্তি এবং আন্তর্জাতিক চাপের কারণে রাশিয়া কিছুটা হলেও নমনীয় পথে হাঁটছে।
উৎস: তাস, ক্রেমলিন প্রেস সার্ভিস, ট্রুথ সোশ্যাল