সশস্ত্র বাহিনী পরিচালিত দেশের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি)-তে শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে চলমান বিতর্ক যেন কেবল একটি নামকে ঘিরে সীমাবদ্ধ নেই—এটি প্রশ্ন তুলেছে গোটা নিয়োগ কাঠামো, নিরাপত্তা যাচাই এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার দাবিকৃত আদর্শ নিয়ে।
ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে আইন বিভাগের সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত প্রভাষক মৌমিতা রহমান ঈপ্সিতা, যার ছাত্রজীবনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও পারিবারিক প্রভাব এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর করা এই শিক্ষার্থী অতীতে বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যদিও ছাত্রলীগ একটি অনুমোদিত রাজনৈতিক সংগঠন, তবে সশস্ত্র বাহিনীর অধীনে পরিচালিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা’র অভিযোগের ছায়া একে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দাবি করছে-নিয়োগের পূর্বে এমন কোনো তথ্য তাদের হাতে ছিল না, এবং বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পরই একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে প্রশ্ন উঠেছে, যে নিয়োগে “পুলিশ ভেরিফিকেশন” একটি বাধ্যতামূলক ধাপ-সেখানে কীভাবে এই তথ্য অধরা রয়ে গেল?
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ঘটনায় দুইটি সম্ভাবনা স্পষ্ট: হয় প্রশাসনিক গাফিলতির কারণে নিরাপত্তা যাচাই পর্যাপ্ত হয়নি, নয়তো এটি ছিল একটি প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের ছায়াতলে গড়ে ওঠা প্রক্রিয়া, যেখানে মেধার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় মুখ্য হয়ে উঠেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাখ্যামূলক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, নিয়োগ ছিল "স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার" ভিত্তিতে। তবে এই বিবৃতি সামাজিক মাধ্যমে উপহাসের খোরাক হয়েছে। কারণ, প্রশ্ন উঠেছে—যদি নিয়োগে সত্যিকার অর্থেই নিরপেক্ষতা বজায় থাকত, তবে কেন একজন বিতর্কিত রাজনৈতিক অতীতসম্পন্ন ব্যক্তিকে কোনো ধরনের আগাম যাচাই ছাড়াই অনুমোদন দেওয়া হলো?
বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, "বিইউপি বরাবরই পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলার মানদণ্ডে অনড় থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক নিয়োগঘটনা সেই অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।"
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি প্রভাবশালী মহলের “সুনির্দিষ্ট এজেন্ডা” নিয়ে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর অভিযোগও তুলেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। তবে এই অভিযোগ ঘিরে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে-বিশ্ববিদ্যালয় কি সাংবাদিকতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করতে চাচ্ছে, নাকি এ অভিযোগের পেছনেও রয়েছে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য?
বিশ্লেষকেরা বলছেন, শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক অতীত, পারিবারিক পরিচয় কিংবা গোষ্ঠীগত প্রভাবকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে শুধুমাত্র মেধা ও নৈতিক অবস্থানকেই বিবেচনায় আনা উচিত। বিশেষ করে যখন সেটি হয় একটি সামরিক-অধিভুক্ত প্রতিষ্ঠান।
তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ফলাফল এখন সবাই অপেক্ষা করছে। তবে এই ঘটনা একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরেছে-সামরিক বা বেসামরিক, যেকোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগপ্রক্রিয়া কি সত্যিকার অর্থেই স্বচ্ছ ও প্রভাবমুক্ত?
ফলোআপ সম্ভাবনা:
তদন্ত কমিটির রিপোর্টের ভিত্তিতে প্রশাসনের সিদ্ধান্ত।
ভবিষ্যতে বিইউপির নিয়োগ নীতিতে পরিবর্তন আসবে কি না।
দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব-একটি তুলনামূলক বিশ্লেষণ।