সোমবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬

গাজায় নতুন মানবিক ত্রাণ কাঠামো: হামাসের বাইপাসে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের নতুন কৌশল?

  • বিশেষ প্রতিনিধি
  • ২০২৫-০৫-০৩ ১৩:১৪:৫৫
ছবি সংগৃহিত

অবরুদ্ধ গাজা যেন এক ভূখণ্ড নয়, রীতিমতো এক পরীক্ষাগার-যেখানে মানবিকতা, রাজনীতি ও সামরিক কৌশলের লড়াই একসঙ্গে চলছে। সাম্প্রতিক সময়ে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ উদ্যোগে গাজায় একটি নতুন ত্রাণ বিতরণ কাঠামো গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, যার লক্ষ্য মানবিক সাহায্য পৌঁছানো, তবে তা হামাসকে পাশ কাটিয়ে।

মানবিক মুখোশ, কৌশলগত নির্মাণ
২ মে প্রকাশিত অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়-যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল এবং একটি নতুন আন্তর্জাতিক ফাউন্ডেশনের মধ্যকার একটি চুক্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে এই উদ্যোগ, যার মাধ্যমে গাজার বেসামরিক জনগণের জন্য খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।
শুনতে মানবিক মনে হলেও বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি এক গভীর কৌশলগত পদক্ষেপ। নতুন এই ত্রাণ ব্যবস্থা সরাসরি হামাসের নিয়ন্ত্রণের বাইরে পরিচালিত হবে। গাজার অভ্যন্তরে তৈরি হবে বিশেষ কম্পাউন্ড, যেখানে প্রতি পরিবার সপ্তাহে একবার নির্ধারিত ত্রাণ নিতে পারবে। উদ্দেশ্য-জনগণের নির্ভরতা হামাস থেকে সরিয়ে একটি নিরপেক্ষ (বা কৌশলগতভাবে গ্রহণযোগ্য) ব্যবস্থার ওপর স্থাপন করা।

‘হামাসকে দুর্বল করাই লক্ষ্য’-স্পষ্ট বার্তা
ইসরাইলি কৌশলগত মন্ত্রী রন ডার্মার এই পরিকল্পনার নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ইসরাইলি এক কর্মকর্তা খোলাখুলি জানিয়েছেন, এই উদ্যোগ হামাসকে রাজস্ব হারাতে বাধ্য করবে এবং তাদের ওপর জনগণের নির্ভরতা কমিয়ে দেবে। যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিক পর্যন্ত একে ‘উদযাপনযোগ্য ব্যবস্থা’ বলে মন্তব্য করেছেন।

কৌশল নাকি মানবিকতা?
তবে প্রশ্ন উঠছে-এই উদ্যোগ কি সত্যিই মানবিক সহায়তা নাকি হামাসকে ঘিরে একটি দীর্ঘমেয়াদি ‘উইথআউট গাজা, উইথিন গাজা’ কৌশল? এতদিন পর্যন্ত গাজার সবকিছু-জীবনযাপন থেকে বিদ্যুৎ, ত্রাণ, নিরাপত্তা-হামাসের নিয়ন্ত্রণে ছিল। এখন তা ভেঙে ফেলার মাধ্যমে ইসরাইল কি এক ধরনের ‘ছায়া প্রশাসন’ তৈরি করতে চাইছে?

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও নেতানিয়াহু-ট্রাম্প সমীকরণ
এই উদ্যোগের পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের সক্রিয় অংশগ্রহণের সময়টি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও প্রেসিডেন্ট প্রার্থিতার লড়াইয়ে। আর ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুও নিজ দেশে চরম রাজনৈতিক চাপের মুখে। এমন সময়ে ‘মানবিক কৌশল’ দিয়ে তারা আন্তর্জাতিক সমালোচনার মুখে অবস্থান পরিবর্তনের চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

গাজার বাস্তবতা: ক্ষুধা, মৃত্যু ও অনিশ্চয়তা
এই কৌশল যখন রূপ নিচ্ছে, তখন গাজার বাস্তব চিত্র ভয়াবহ। ৭ অক্টোবরের হামলার পর থেকে চলমান ইসরাইলি অভিযান ও দ্বিতীয় দফার আগ্রাসনে ইতোমধ্যে প্রাণ হারিয়েছেন ৫৪ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি। আহত হয়েছেন এক লক্ষাধিক। নিহতদের বড় অংশই নারী ও শিশু। মার্চের শুরু থেকে বন্ধ থাকা ত্রাণ প্রবেশের কারণে প্রায় ২০ লাখ মানুষ অনাহারে, পানি ও ওষুধহীনতায় জীবনযাপন করছেন।

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া: সংশয় আর নীরবতা
জাতিসংঘ বা ওআইসি এখনো এই কাঠামো নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। বরং অনেক আন্তর্জাতিক সংস্থাই ভাবছে-এই ‘নিরপেক্ষ’ ফাউন্ডেশনের আসল নিয়ন্ত্রণ ঠিক কোথায়? মানবিক কর্মীদের নেতৃত্বে হলেও, বাস্তবে পরিচালনায় ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র কতটা প্রভাব রাখবে তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।

উপসংহার: মানবতা নাকি নিয়ন্ত্রণের নতুন রূপ?
গাজার নতুন ত্রাণ কাঠামো একদিকে বেসামরিক জনগণের জন্য আশার আলো হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে এটি হতে পারে এক গভীর রাজনৈতিক কৌশলের মুখোশ। যখন একটি জনগোষ্ঠী ক্ষুধার্ত, আতঙ্কিত এবং বাঁচার সংগ্রামে লিপ্ত-তখন সহায়তার নামে ‘নিয়ন্ত্রণ’ আর ‘অন্তঃস্থ রাজনীতি’ কতটা ন্যায্য তা নিয়েই উঠছে প্রশ্ন।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি-সাহায্য নয়, সম্মান; ত্রাণ নয়, স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান। আর এই সমাধান কেবল কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমেই সম্ভব, ‘ফাউন্ডেশন-কেন্দ্রিক মানবিকতা’র মাধ্যমে নয়।


এ জাতীয় আরো খবর