আমি তখন অনেক ছোট, দশ বছরের
আমার দেশে যুদ্ধ এলো, যুদ্ধ এলো একাত্তরের
যুদ্ধ এলো স্বাধীনতার
আমি তখন বেজায় অবুঝ
মনটা তখন নতুন কুঁড়ি
হালকা সবুজ
বুঝতে পারি কিচ্ছুটি না।
আমি তখন ছোটও যদি
দৌড়গুলো পা'র ঢেউয়ের নদী
মা হেঁটে যান সামনে আমার বাবা হাঁটেন পেছন পেছন
ছোট্ট ভাইটি নেংটো হয়ে বোনের কোলে বুকের বাঁধন।
হাঁটতে হাঁটতে আমরা তখন শহর ছেড়ে অচিন পুরে
গুলির শব্দ স্তিমিত পেটগুলো সব ক্ষুধায় পুড়ে
তৃষ্ণা নিয়ে জীবন তখন জল বিহীন ওই মরুর ধরায়
খুঁজছে বাড়ি পাড়ায় পাড়ায়।
কয়টি বাড়ি একটু দূরে দেখাও গেল
যেমন করে চাঁদ দেখা যায়, যায় না ধরা
সেই বাড়িও তেমনি ভাবেই দূরের তারা ধুধু করা।
এমনি করেই অনেকটা দিন পথের সাথি
অনাহারে আমরা থাকি
ছোট্ট শিশু ভাইটি আমার কাতর প্রাণে-
এই তো পাবো, এই তো পাবো
পাইনি তবু আহার-বিহার, শূন্য থাকে দুধের বাটি।
ভাই অচেতন, বোনের বুকে নেতিয়ে আছে
জীবনটা কি বাতাস টানে, বাতাস ছাড়ে
কেবল খোঁজে আশ্রয় এক আশ্রয় নেই
এমনি করে বেশ ক'টি দিন পথে-ঘাটে
ভাইটি আমার মাটির কোলে শরীর পাতে-
কান্না বুকে, সকল চোখে
ঝারা হাতে আমরা কেবল ক'জন মিলে
সেদ্ধ আলুর ধারাপাতে মাঠেঘাটে।
যুদ্ধ কেবল গোলাবারুদ, পাকিস্তানি সৈন্য সেনা
কে বলেছে?
যুদ্ধ ছিলো দুধের-ভাতের
নিদ্রাবিহীন কালো রাতের
যুদ্ধ ছিলো ঝরা ফুলের পাণ্ডুবর্ণ জীবন পাতের
যুদ্ধ ছিলো স্বাধীন দেশের, একটি নিশান ও পাসপোর্টের
যুদ্ধ ছিলো বোনের হায়ার, মায়ের দেয়া বাংলা ভাষার
অনেক আশার মোটা ভাত আর বুকের আঁচল লজ্জা ঢাকার।
এখন আমি অনেক বড়, যুদ্ধ যে কি বুঝতে পারি
আমার ভাইয়ের মতই তো সব ভাই মরেছে হাজার কুড়ি
তবুও যদি দেশটা আমার স্বাধীন হতো
মৃত্যুপণে বেঁচে যেত
সকল জীবন মরন ফাঁদের অমর হতো!
কোথায় গেলো অমরত্ব মুক্তি সেনার
কোথায় গেল যুদ্ধ করার অর্থগুলো
সেই তো আজও ভাতের হাড়ির সব কটি ভাত
ভরায় না পেট
সেইতো আজও বোনের কোলে লালা ঝরায়
ভাইগুলো সব-
ক্ষুধায় কাতর ফুটপাতে আর বস্তি পাড়ায়।
সেই তো আজও এই স্বদেশে আমরা কেবল পরাভুত
চোরাই টাকা, মিথ্যে ভুয়া সনদ পেয়ে অভিভূত
মুষ্টিমেয়'র ঝলমলে দাঁত, হিংস্র হাসে
আম জনতা অপাংতেয়, বুকের পাঁজর যাচ্ছে খসে।