কতদিন আকাশের দিকে তাকাইনি-
ভেবেছিলাম,
মেঘেরও বুঝি নিজস্ব কোনো ঠিকানা নেই,
যেখানে গিয়ে
সে তার সমস্ত কান্না রেখে আসতে পারে।
তবু সেদিন
বিকেলের শেষ প্রহরে
হঠাৎ একটি মেঘ ভেঙে গেল,
আর তার ফাঁক দিয়ে
যে নীল নেমে এলো,
আমি বিস্ময়ে দেখলাম-
সেখানে তোমার কোনো মুখ নেই,
আছে শুধু
তোমাকে ভালোবেসে
বদলে যাওয়া একজন মানুষ।
তখন বুঝলাম,
ভালোবাসা আসলে কাউকে পাওয়া নয়,
কাউকে হারিয়েও
নিজের ভেতর থেকে
তার জন্য রাখা দরজাটি
বন্ধ না করতে পারা।
তুমি চলে গেছ-
এ সত্যের সঙ্গে
আমার কোনো বিরোধ নেই;
সময় তার নিয়মে
মানুষকে দূরে সরিয়ে নেয়,
যেমন নদী
একদিন চেনা ঘাট থেকে
তার জল সরিয়ে নেয়।
কিন্তু নদী কি
ঘাটকে ভুলে যায়?
নাকি তার গভীরে
অদৃশ্য কোনো স্রোত
সারাজীবন বয়ে চলে
সেই পুরোনো স্পর্শের দিকে?
তোমার কথা এখন
আমি খুব কমই ভাবি,
তবু কিছু সন্ধ্যা
অকারণে দীর্ঘ হয়ে যায়,
কিছু বৃষ্টি
জানালায় এসে
পুরোনো কোনো শব্দের মতো
আমাকে থামিয়ে দেয়।
আমি তখন
তোমাকে খুঁজি না,
খুঁজি সেই মানুষটিকে
যে তোমার চোখের দিকে তাকিয়ে
প্রথমবার বুঝেছিল-
ভালোবাসা মানে
নিজেকে অন্য কারও হাতে
সমর্পণ করা নয়,
বরং নিজের ভেতরের
অন্ধকারটুকু
কারও সামনে লুকিয়ে না রাখা।
আমাদের মধ্যে
যে দূরত্ব জন্মেছিল,
তার কোনো মানচিত্র নেই;
কোনো সীমানা প্রহরী নেই,
কোনো কাঁটাতারও নেই।
শুধু কিছু না-বলা কথা
দুজনের মাঝখানে
ধীরে ধীরে
একটি ঋতু হয়ে উঠেছিল।
আমরা কেউ
সেই ঋতুর নাম রাখিনি।
তবু বসন্ত চলে গেছে,
বর্ষা এসেছে,
শরৎ তার সাদা মেঘ মেলেছে,
শীত জানালার কাচে
কুয়াশার অক্ষরে
কত নাম লিখে মুছে দিয়েছে-
শুধু তোমার নামটি
কোনো কাগজে না থেকেও
আমার ভেতর থেকে মুছে যায়নি।
হয়তো এটাই ভালোবাসার
সবচেয়ে নিঃশব্দ সত্য-
যাকে ভালোবাসি
সে সবসময় পাশে থাকে না,
কিন্তু তার চলে যাওয়ার পর
আমরা আর আগের মানুষটি থাকি না।
তুমি আমাকে
একটি শূন্যতা দিয়ে গেছ,
আমি সেই শূন্যতার ভেতর
নিজেকে চিনেছি।
তুমি আমাকে
একটি নীরবতা দিয়ে গেছ,
আমি সেই নীরবতায়
আমার অপ্রকাশিত কথাগুলো শুনেছি।
তুমি আমাকে
একটি অসমাপ্ত গল্প দিয়ে গেছ,
আমি তার শেষ পৃষ্ঠা
লিখিনি কখনো।
কারণ কিছু গল্পের
শেষ থাকা জরুরি নয়;
শেষ হয়ে গেলে
তারা শুধু স্মৃতি হয়,
অসমাপ্ত থাকলে
কখনো কখনো
জীবনেরই অংশ হয়ে থাকে।
আজ তাই
তোমার কাছে ফিরে যাওয়ার
কোনো ইচ্ছা নেই আমার,
তোমাকে ভুলে যাওয়ার
কোনো আয়োজনও নেই।
শুধু চাই,
আমাদের মাঝখানে যে ভালোবাসা
একদিন জন্ম নিয়েছিল,
সে যেন
অভিযোগে নষ্ট না হয়।
সে থাকুক
বৃষ্টির পরের মাটির গন্ধে,
শীতের সকালের নরম রোদে,
নিঃসঙ্গ মানুষের
চুপ করে জানালার পাশে বসে থাকার মধ্যে।
থাকুক
কোনো বৃদ্ধের চোখে
হারিয়ে যাওয়া সঙ্গীর স্মৃতির মতো,
কোনো মায়ের অপেক্ষায়,
কোনো সন্তানের ফিরে আসার প্রার্থনায়,
কোনো মানুষের
আরেক মানুষের জন্য
নিঃশব্দে ভালো কিছু চাওয়ার মধ্যে।
তখন বুঝি,
ভালোবাসা শুধু
দুটি হৃদয়ের ব্যক্তিগত গল্প নয়-
সে মানুষের ভেতর
মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার
একটি অদৃশ্য আলো।
আর আজ
যখন আমার আকাশে
পুরোনো মেঘ নেই,
তখনও তোমার কথা মনে পড়ে।
কিন্তু সেই মনে পড়ায়
আর কোনো ব্যথা নেই।
আছে শুধু
একটি গভীর নীল শান্তি-
যেন বহুদিনের বৃষ্টির শেষে
আকাশ নিজেই
তার সমস্ত কান্না ভুলে গিয়ে
নিতল হয়ে বলছে,
কিছু মানুষ
আমাদের জীবনে আসে
থাকার জন্য নয়,
আমাদের ভেতরের
অন্ধকার ভেঙে
একবার নীল আকাশ দেখিয়ে যাওয়ার জন্য।
তুমিও এসেছিলে।
চলে গেছ।
আর তোমার চলে যাওয়ার পরই
আমি প্রথম দেখেছি-
আমার নিজের ভেতরেও
একটি আকাশ ছিল।
সেই আকাশে আজ
কোনো মেঘ নেই,
শুধু তোমাকে হারিয়েও
তোমার প্রতি অমলিন থাকা
একটি নীল,
একটি নীরব আলো,
একটি নামহীন অনুভব-
মেঘভাঙা
নিতল
ভালোবাসা।