আজ অতীন সেন একজন বিখ্যাত সাহিত্যিক,
এই বিখ্যাত হবার জায়গাটায় তিনি এসেছেন জীবনের অনেক সিঁড়ির ধাপ টপকে।
আজ তাঁর বাড়ীটা খুব শূণ্য, একা বসে আছেন নিজের তৈরী বাড়ীর একটি ছোট্ট বারন্দায়।
এই বারন্দাটা তাঁর স্ত্রী উর্মিমালার বড় প্রিয় ছিল, তার লাগান তুলসী গাছটা এখনও বারন্দার এক কোণে রয়েছে, পরিচারিকা মন্জুকে দিয়ে নিয়ম করে গাছটায় জল দেওয়া করান, মৃত্যুর পর মানুষ বোধহয় এমনি অমূল্য হয়ে যায়।
গাছটার দিকে তাকালেই চোখের সামনে যেন উর্মি এসে দাঁড়ায়, গলায় আঁচল দিয়ে মূর্তিমতি গৃহলক্ষ্মী তুলসীতলায় প্রদীপ জ্বালছেন, সকালে একটা ছোট্ট তামার ঘটি করে গাছটায় জল ঢালছেন।
আজ আকাশটা খুব সুন্দর, পূর্ণিমার চাঁদে আকাশটা আলো, তিনি ঘরটা অন্ধাকার করে বারন্দায় চুপচাপ বসে আছেন, একটি আগে মন্জু চা আর চিঁড়েভাজা দিয়ে গেছে, চিঁড়েভাজাটা পড়েই আছে, কিছুই মুখে ভালো লাগেনা, উর্মি খুব সুন্দর চিঁড়ে ভাজত, ছোট ছোট করে আলু আর পেঁয়াজ কেটে ভেজে ওপরে ছরিয়ে দিত, কি অপূর্ব তার স্বাদ, একটা শুকনো লঙ্কা লাল করে ভেজে চিঁড়েভাজার ওপরে সাজিয়ে দিত।
যৌবনের শুরুতে বেহালায় তার ছোট্ট বাসা বাড়ীতে মাটিতে শতরন্চি বিছিয়ে যখন সাহিত্য সভা বসত, উর্মি এরকম সুন্দর করে চিঁড়েভাজা করে দিত, সুন্দর কাঁসার রেকাবে একথোকা সাদাফুল মাঝঘানে রাখত, কত স্বল্প আয়োজন কিন্তু উর্মির আদর যত্নে হাসিমাখা মুখে সবটাই যেন এক অনিন্দ্য সুন্দর রূপ নিত।
তখন কতই বা মাইনে পেতেন, যদিও তিনি চিরকালই অফিসার হয়েই চাকরী করেছেন কোনদিন কেরানীগিরি করেননি, কিন্তু তখনকার দিনের অফিসার তো আর এখনকার মতন মোটা মাইনে পেতনা, তাছারা তিনি ছিলেন অত্যন্ত সৎ, ডানহাতের কারবারের সাথে কোনদিনই পরিচিত হতে পারেননি, চিরকাল সন্মানের সাথে মাথা উচু করে বেচেছেন, তা অবশ্যই সম্ভব হয়েছে উর্মিমালার জন্যেই। সামান্য জিনিসকে অসামান্য করে তোলার এক অদ্ভুত ক্ষমতা ছিল তার।
ছোট বাড়ী ঝকঝক করত সবসময়, জানলার পর্দা বিছানার চাদর টেবিলক্লথ সব কিছুর মধ্যেই এই পারিপট্য নিপুণতা থাকত।
তখনকার পত্রিকা তরুণের স্বপ্ন, পূর্বাসা, যষ্টিমধুতে তার নিয়মিত লেখা বার হত, কিন্ত নিজস্ব বই বার করতে পারেননি, কারণ তিনি কোন নামীদামী সংবাদপত্রের সাথে যুক্ত ছিলেননা, কাজ করতেন সরকারি সংস্থায়, অথচ উপন্যাস তৈরী হয়ে পড়ে আছে প্রকাশক ছাপছেনা। ভীষণ মানষিক অবসাদে ভুগছেন, তখন উর্মি এসে পাশে দাঁড়িয়েছিল, নিজের গলার হার খুলে দিয়েছিল হাতে বই ছাপানোর জন্য, তিনি নিতে পারেননি বলেছিলেন এই হারটা পরেই সবসময় তোমায় দেখি হারটা নিতে পারবোনা, উর্মি তখন হাতের চুড়ি খুলে দিয়েছিল, বলেছিল তোমার বই বার হবে এর চেয়ে বড় গয়না আর আছে না কি?
তিনি চুড়ি বিক্রি করে বই ছাপিয়ে ফেললেন, বিজ্ঞাপন দিলেন বই প্রচুর কাটতে লাগল, এরপর থেকেই ভাগ্যের দরজা খুলে যায়, আর পেছন ফিরে তাকাতে হয়নি।
এগিয়ে চলেছেন দুর্জয় গতিতে, চারিদিকে সভাসমিতি, প্রচুর ভক্তবৃন্দ, তাঁর লেখা গল্প নিয়ে সিনেমা পর্যন্ত তৈরী হল, বিখ্যাত অভিনেতা অভিনেত্রীরা অভিনয় করল, কালের স্রোতে ভেসে চললেন, ভুলে গেলেন জীবনে স্ত্রীর অবদান, এমন কি তার সেই উর্মিকে তিনি সবার সামনে অশিক্ষিত বলে অপমান করতেও পিছপা হলেননা।
বয়স হল যখন ঘরে ফিরলেন, তখন স্ত্রীর শরীর একেবারে ভেঙে গেছে, ছেলেমেয়েরা বাইরে।
অনেক চেষ্টা করেও স্ত্র্রীকে ধরে রাখতে পারলেননা, উর্মিমালা চলে গেল, তাকে এই সংসারে একা ফেলে। আজ যখন উর্মির ছবিটার দিকে চেয়ে থাকেন তখন মনে হয় সে যেন ব্যাঙ্গের হাসি হাসছে, মনে হয় তার দিকে চেয়ে বলছে, 'কেমন খুব তো অবহেলা করেছিলে আজ একা বসে কড়িকাঠ গোণ '।
আজ তার অনেক নাম ডাক, অর্থের অভাব নেই, কিন্তু সব যেন এক বিরাট শূণ্যতায় ঢাকা, তার চিরকালের সুখ দুঃখের সাথি উর্মমালা কাছে নেই, ছেলেমেয়েরা সব দূরে, মাঝে মাঝে খবর নেয় টেলিফোনে, বছরে একবার কদিনের জন্য এসে ঘুরে যায়, বাকি দিন একা, ওই বারন্দায় রাখা তুলসী গাছটার মতন একা, একদম একা।
রবিঠাকুরের একটা গান শুধু মাঝে মাঝে বাজিয়ে শোনেন, উর্মির গলায় গাওয়া, তার মেয়ে এসে টেপ করেছিল, ' কি পাইনি তার হিসাব মিলাতে মন মোর নহে রাজি'। আজ নিজে বসে হিসাব করছেন আর গুণগুণ করে গাইছেন, ' 'তোমায় নতুন করে পাব বলে হারাই
ক্ষণে ক্ষণ "।।