সড়ক আমাদের চলাচলের পথ,অর্থনীতির প্রাণধারা এবং মানুষের জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রতিদিন কোটি মানুষ কর্মস্থল,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,ব্যবসা-বাণিজ্য কিংবা আপনজনের কাছে পৌঁছাতে সড়ক ব্যবহার করেন। কিন্তু সেই সড়কই কখনো কখনো পরিণত হচ্ছে মৃত্যু ও পঙ্গুত্বের নির্মম মঞ্চে। একটি দুর্ঘটনা শুধু একজন মানুষের জীবন কেড়ে নেয় না; একটি পরিবারকে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ বদলে দেয় এবং সমাজের ওপর দীর্ঘমেয়াদি বোঝা তৈরি করে।
সড়ক দুর্ঘটনা (রোড ক্র্যাশ) তাই নিছক একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি একটি সামাজিক,অর্থনৈতিক,প্রশাসনিক ও জনস্বাস্থ্যগত সমস্যা। প্রতিদিন দুর্ঘটনার খবর প্রকাশিত হচ্ছে,কিছুদিন আলোচনা হচ্ছে,তদন্তের আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু তারপর আবার একই চিত্র ফিরে আসছে। এই চক্র ভাঙতে হলে দুর্ঘটনার পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর পরিবর্তে দুর্ঘটনা যাতে না ঘটে,সেই ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
রোড ক্র্যাশ বা দুর্ঘটনার প্রধান কারণ
সড়ক দুর্ঘটনার (রোড ক্র্যাশ) পেছনে সাধারণত একটি নয়,একাধিক কারণ একসঙ্গে কাজ করে। অতিরিক্ত গতি,বেপরোয়া ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং,বিপরীতমুখী লেনে প্রবেশ,চালকের ক্লান্তি,অসুস্থতা বা মনোযোগের ঘাটতি,মোবাইল ফোন ব্যবহার,ট্রাফিক আইন অমান্য এবং পথচারীর অনিয়মিত চলাচল দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ায়। একই সঙ্গে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন,অনিরাপদ সড়ক নকশা,অপর্যাপ্ত ফুটপাত ও পারাপারের ব্যবস্থা, সড়কে অবৈধ দখল,যত্রতত্র গাড়ি থামানো এবং দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাও দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে,বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১১ লাখ ৯০ হাজার মানুষ সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান এবং ২ থেকে ৫ কোটি মানুষ আহত হন। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সীদের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণও সড়ক দুর্ঘটনা।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সঠিক ও নির্ভরযোগ্য দুর্ঘটনা-তথ্য ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সংস্থার হিসাবের মধ্যে পার্থক্য থাকায় প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝা কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ পুলিশ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সড়ক দুর্ঘটনার বার্ষিক প্রতিবেদন তৈরি করে।
শুধু চালককে দায়ী করলেই সমাধান হবে না
দুর্ঘটনা ঘটলেই চালককে একমাত্র দায়ী করার প্রবণতা রয়েছে। চালকের ভুল অবশ্যই দুর্ঘটনার বড় কারণ হতে পারে। অতিরিক্ত গতি,প্রতিযোগিতা করে গাড়ি চালানো,বিশ্রামহীন অবস্থায় দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো কিংবা যাত্রী ওঠানামার জন্য যেখানে-সেখানে গাড়ি থামানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো,একজন চালক কেন দিনের পর দিন দীর্ঘ সময় গাড়ি চালাতে বাধ্য হচ্ছেন? কেন মালিক বা পরিবহন ব্যবস্থাপনা সময়সূচি ও ট্রিপের চাপ এমনভাবে নির্ধারণ করছে, যাতে চালক বিশ্রামের সুযোগ না পান? কেন লাইসেন্সধারী চালকের দক্ষতা, শারীরিক সক্ষমতা ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়মিতভাবে যাচাই হবে না?
চালকের ভুলের দায় চালককে নিতে হবে,কিন্তু পরিবহন ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার দায়ও সংশ্লিষ্টদের নিতে হবে।
সড়ক ব্যবহারকারীর অসচেতনতাও বড় সমস্যা
নিরাপদ সড়ক শুধু চালকের দায়িত্ব নয়। পথচারী,মোটরসাইকেল চালক,যাত্রী,সাইকেল আরোহী-প্রত্যেকের আচরণ সড়কের নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। ফুটপাত থাকা সত্ত্বেও সড়কে হাঁটা,চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হওয়া,নির্ধারিত স্থান ছাড়া পারাপার,মোটরসাইকেলে মানসম্মত হেলমেট ব্যবহার না করা কিংবা চলন্ত অবস্থায় মোবাইল ফোন ব্যবহার-এসব আচরণ ঝুঁকি বাড়ায়।
তবে সচেতনতার কথা বলার পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত করতে হবে যে মানুষকে নিরাপদ আচরণের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না। ফুটপাত নেই,নিরাপদ পারাপারের ব্যবস্থা নেই,সংকেত অকার্যকর কিংবা গণপরিবহন নির্ধারিত স্থানে থামে না-এমন পরিস্থিতিতে শুধু জনগণকে অসচেতন বলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
ফিটনেসবিহীন গাড়ি কেন চলবে?
সড়কে ফিটনেসবিহীন,জরাজীর্ণ কিংবা যান্ত্রিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন চলাচল নিরাপত্তার জন্য সরাসরি হুমকি। ব্রেক,টায়ার,স্টিয়ারিং,বাতি বা অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশের ত্রুটি একটি গাড়িকে মুহূর্তেই প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে।
তাই গাড়ির ফিটনেস সনদ প্রদানের প্রক্রিয়ায় কঠোরতা,স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। কাগজপত্রে ফিটনেস থাকলেই হবে না,বাস্তবে গাড়িটি সড়কে চলাচলের উপযোগী কি না সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন পর্যায়ক্রমে অপসারণ এবং আধুনিক, নিরাপদ গণপরিবহন চালুর কার্যকর পরিকল্পনা প্রয়োজন।
নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতিই হতে পারে পথ
বিশ্বজুড়ে সড়ক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখন শুধু মানুষের ভুল কমানোর ওপর নির্ভর না করে ‘সেইফ সিস্টেম এপ্রোচ’ বা নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মূল ধারণা হলো-মানুষ ভুল করতেই পারে; তাই একটি ভুল যেন মানুষের মৃত্যু ডেকে না আনে,সেভাবেই সড়ক ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে।
এই পদ্ধতিতে নিরাপদ সড়ক,নিরাপদ যানবাহন,নিরাপদ গতি,নিরাপদ সড়ক ব্যবহারকারী এবং দুর্ঘটনার পর দ্রুত ও কার্যকর চিকিৎসা ও উদ্ধারব্যবস্থাকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন প্রণয়নের উদ্যোগেও এই নিরাপদ ব্যবস্থা পদ্ধতির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন দরকার
রাজধানী ঢাকার সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গেলে গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। একই সড়কে বাস,মিনিবাস,ব্যক্তিগত গাড়ি,মোটরসাইকেল,রিকশা,পথচারী ও পণ্যবাহী যান চলাচলের বর্তমান বিশৃঙ্খলা কমাতে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে রুট র্যাশনালাইজেশন বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ। একই পথে অসংখ্য বাসের প্রতিযোগিতা,যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা,রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এবং যাত্রী পাওয়ার জন্য চালকদের মধ্যে প্রতিযোগিতা বন্ধ করতে হবে। নির্ধারিত রুট,নির্দিষ্ট স্টপেজ,সময়ভিত্তিক পরিচালনা,আধুনিক বাস,ইলেকট্রনিক টিকিটিং এবং একটি সমন্বিত পরিবহন ব্যবস্থাপনা ঢাকার সড়ককে অনেক বেশি নিরাপদ করতে পারে।
ঢাকার গণপরিবহনকে শুধু যানজট কমানোর প্রকল্প হিসেবে দেখলে চলবে না; এটিকে নাগরিকের নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্ন হিসেবেও দেখতে হবে।
নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন সময়ের দাবি
সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ গুরুত্বপূর্ণ একটি পদক্ষেপ হলেও বর্তমান বাস্তবতায় আরও সমন্বিত সড়ক নিরাপত্তা কাঠামোর প্রয়োজন রয়েছে। বিদ্যমান আইন,বিধি ও বিভিন্ন সংস্থার দায়িত্বের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন হলে সেখানে চালক ও মালিকের দায়ের পাশাপাশি সড়ক নকশা,যানবাহনের নিরাপত্তা,গতি নিয়ন্ত্রণ,ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক চিহ্নিতকরণ,পথচারী ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীর নিরাপত্তা এবং দুর্ঘটনার পর জরুরি সেবার বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে থাকতে হবে।
বিআরটিএর বর্তমান ব্যবস্থায় ফিটনেস,লাইসেন্স ও রুট পারমিটসহ বিভিন্ন সেবা রয়েছে; এগুলোর সঙ্গে সড়ক নিরাপত্তা তদারকি আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করা প্রয়োজন।এসব প্রশ্নের উত্তর বিচ্ছিন্ন বিধানের ওপর ছেড়ে না দিয়ে একটি সমন্বিত কাঠামোয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আইন প্রণয়নের আগে বিদ্যমান বিধিবিধানের পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে দেখতে হবে,কোথায় নতুন বিধান প্রয়োজন,কোথায় সংশোধন যথেষ্ট এবং কোথায় বাস্তবায়নের দুর্বলতাই মূল বাধা।এখানে উল্লেখ্য যে, গত ২০ জুলাই ২০২৬ জাতিসংঘের সদর দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈশ্বিক সড়ক নিরাপত্তা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী 'সড়ক নিরাপত্তা আইন' চূড়ান্ত, অনুমোদন ও প্রণয়নের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
দুর্ঘটনার পর নয়,দুর্ঘটনার আগেই ব্যবস্থা
সড়ক নিরাপত্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি হতে হবে মানসিকতায়। দুর্ঘটনা ঘটার পর মামলা,তদন্ত, ক্ষতিপূরণ কিংবা শাস্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন; কিন্তু তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধ।
কোন সড়কে বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে, কেন ঘটছে, সেখানে গতি কত, পথচারী পারাপারের ব্যবস্থা আছে কি না, সড়কের বাঁক বা নকশায় ত্রুটি আছে কি না-এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো দ্রুত নিরাপদ করতে হবে। দুর্ঘটনার তথ্যকে শুধু পরিসংখ্যান হিসেবে নয়, ভবিষ্যৎ দুর্ঘটনা প্রতিরোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে হবে।
সড়ক নিরাপত্তা কোনো একক মন্ত্রণালয় বা সংস্থার কাজ নয়। সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়, বিআরটিএ,সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর,ট্রাফিক পুলিশ,স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান,পরিবহন মালিক-শ্রমিক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান,স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজ-সব পক্ষের সমন্বিত দায়িত্ব রয়েছে।
শেষ পর্যন্ত সড়কের নিরাপত্তা মানে শুধু দুর্ঘটনার সংখ্যা কমানো নয়; এর অর্থ হলো একজন শ্রমিক যেন কর্মস্থল থেকে নিরাপদে বাড়ি ফিরতে পারেন,একজন শিক্ষার্থী যেন স্কুলে গিয়ে জীবিত ফিরে আসতে পারেন,একজন মা যেন সন্তানের ফেরার অপেক্ষায় আতঙ্কে না থাকেন। উন্নয়নের সড়ক তখনই মানুষের জন্য কল্যাণকর হবে,যখন সেই সড়কে মানুষের জীবনের মূল্য সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাবে।
আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি সড়কব্যবস্থা,যেখানে দুর্ঘটনাকে ভাগ্যের লিখন বলে মেনে নেওয়া হবে না। পরিকল্পনা,আইন,প্রযুক্তি,প্রশিক্ষণ,প্রয়োগ এবং মানুষের সচেতনতার সমন্বয়ে একটি নিরাপদ সড়কব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব। প্রয়োজন শুধু রাজনৈতিক সদিচ্ছা,প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং ধারাবাহিক বাস্তবায়ন।
সড়ক আমাদের চলার পথ-মৃত্যুর পথ নয়। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা তাই কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর দাবি নয়; এটি প্রতিটি নাগরিকের বেঁচে থাকার অধিকার।
লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,ভাইস চেয়ারম্যান-নিরাপদ সড়ক চাই।