ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন সম্প্রতি বলেছেন,নগরবাসীর নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে তাঁর লাশের ওপর দিয়েও ফুটপাত দখলমুক্ত করার অভিযান চলবে। মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযান পরিদর্শনের সময় দেওয়া তাঁর এই বক্তব্য ফুটপাতের মালিকানা নিয়ে নয়,বরং একটি মৌলিক নগর-অধিকার নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে-শহরের ফুটপাত আসলে কার জন্য? উত্তরটি খুব সহজ: পথচারীর জন্য।আমি তার এই উদ্যোগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাই।
একটি আধুনিক শহরের পরিবহনব্যবস্থা শুধু বাস,রেল,ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা মোটরসাইকেলের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। মানুষের যাত্রার শুরু ও শেষের সবচেয়ে স্বাভাবিক মাধ্যম হলো হাঁটা। কিন্তু ঢাকায় ফুটপাত দখল,অনিয়মিত নকশা,ভাঙাচোরা পৃষ্ঠ,অব্যবস্থাপনা,নির্মাণসামগ্রী,অপর্যাপ্ত আলো ও নিরাপদ পারাপারের সংকট পথচারীকে প্রায়ই সড়কে নামতে বাধ্য করে। এতে হাঁটা যেমন ঝুঁকিপূর্ণ হয়,তেমনি সড়কে যানবাহনের সঙ্গে পথচারীর সংঘাতও বাড়ে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে,রোড ক্র্যাশ বা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ পথচারী; নিরাপদ ফুটপাত ও পারাপারব্যবস্থা তাই সড়ক নিরাপত্তার মৌলিক অবকাঠামো।
ঢাকার জন্য আরও বড় সম্ভাবনা রয়েছে হাঁটাকে দৈনন্দিন পরিবহনের অংশ করার মধ্যে। একজন মানুষ যদি নিরাপদ,ছায়াযুক্ত,পরিচ্ছন্ন ও নিরবচ্ছিন্ন ফুটপাত পান,তাহলে দুই-তিন কিলোমিটারের অনেক যাত্রায় স্বল্প দূরত্বের বাহনের পরিবর্তে হাঁটাকে বেছে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এর ফলে ব্যক্তিগত গাড়ি কিংবা স্বল্প দূরত্বের মোটরচালিত বাহনের ওপর চাপ কিছুটা কমতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও হাঁটা ও গণপরিবহনকে পরস্পর সম্পূরক হিসেবে দেখে; গণপরিবহনে যাতায়াতের একটি বড় অংশ হাঁটায় সম্পন্ন হওয়ায় উন্নত পথচারী অবকাঠামো গণপরিবহনের ব্যবহারকেও উৎসাহিত করে।
এর স্বাস্থ্যগত সুফলও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত হাঁটা শারীরিক সক্রিয়তা বাড়ায় এবং হৃদ্রোগ,উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-২ ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে,প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক সক্রিয়তা করার সুপারিশ রয়েছে; কর্মস্থল,বাজার,শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা গণপরিবহনের সঙ্গে হাঁটার সুযোগ যুক্ত হলে দৈনন্দিন জীবনেই এর একটি অংশ পূরণ করা সম্ভব।
তাই ঢাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করার কাজকে শুধু উচ্ছেদ অভিযান হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন 'নিরবচ্ছিন্ন,প্রতিবন্ধীবান্ধব,নিরাপদ ও ছায়াযুক্ত পথচারী নেটওয়ার্ক'। যেখানে সম্ভব সেখানে পরিকল্পিত ছাউনি বা সেড,গাছের ছায়া,পর্যাপ্ত আলো,বসার ব্যবস্থা,পানি নিষ্কাশন,নিরাপদ পারাপার এবং গণপরিবহনের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ রাখতে হবে। তবে ছাউনি এমনভাবে নির্মাণ করতে হবে যাতে পথের কার্যকর প্রস্থ কমে না যায় এবং বৃষ্টি,অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি চলাচলে বাধা সৃষ্টি না হয়।
বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক নগর উন্নয়ন কর্মসূচিতেও বাংলাদেশে শত শত কিলোমিটার নতুন ফুটপাত নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে-যা দেখায়,হাঁটার অবকাঠামো এখন আর সৌন্দর্যবর্ধনের বিষয় নয়;এটি নগর উন্নয়ন ও জলবায়ু সহনশীলতার অংশ।
ঢাকার যানজট,বায়ুদূষণ,জ্বালানি ব্যয় ও সড়ক নিরাপত্তার সংকট একে অন্যের সঙ্গে যুক্ত। তাই সমাধানও হতে হবে সমন্বিত। 'ফুটপাত দখলমুক্ত করা প্রথম পদক্ষেপ; তার পরের পদক্ষেপ হলো ফুটপাতকে এতটাই নিরাপদ,আরামদায়ক ও আকর্ষণীয় করে তোলা,যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় হাঁটতে চান।'
ঢাকাকে পুরোপুরি হাঁটার শহর বানানোর কথা নয়। লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন একটি শহর,যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী মানুষ হাঁটতে পারবেন,হাঁটতে নিরাপদ বোধ করবেন এবং দুই-তিন কিলোমিটারের যাত্রায় হাঁটা হবে বাস্তবসম্মত একটি পরিবহন বিকল্প। এতে শুধু ফুটপাত পথচারীর কাছে ফিরে আসবে না; ধীরে ধীরে ঢাকা ফিরে পেতে পারে কিছুটা স্বস্তি, স্বাস্থ্যকর জীবন,কম দূষণ এবং আরও মানবিক নগরজীবন।
লেখকঃ কলামিস্ট,রোড সেফটি ও মানবাধিকার কর্মী,সাবেক মহাসচিব-নিরাপদ সড়ক চাই ।