শনিবার, সেপ্টেম্বর ৫, ২০২৬

গাজী মাজহারুল আনোয়ার: বাংলা গানের আকাশে যে নক্ষত্রের আলো নিভবে না

  • এ কে আজাদ
  • ২০২৬-০৯-০৪ ১৫:১৫:৫৬
ফাইল ছবি

আজ কিংবদন্তি গীতিকবির চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী
বাংলা গানের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল গীতিকার হিসেবে উচ্চারিত হয় না, তাঁরা হয়ে ওঠেন একটি সময়ের কণ্ঠস্বর। গাজী মাজহারুল আনোয়ার তেমনই এক অনন্য স্রষ্টা। গান, চলচ্চিত্র, দেশপ্রেম, মুক্তিযুদ্ধ, প্রেম, বিরহ, জীবনবোধ, মানবতা ও সমাজবাস্তবতার অসংখ্য অনুভূতিকে যিনি শব্দ ও সুরের মায়ায় ধারণ করেছেন। বাংলাদেশের সর্বাধিক গান, জনপ্রিয় গান, দেশাত্মবোধক গান ও চলচ্চিত্রের গানের অন্যতম স্রষ্টা হিসেবে তিনি বাংলা সংস্কৃতিতে নিজের জন্য তৈরি করে গেছেন এক অনন্য আসন।
আজ ৪ সেপ্টেম্বর কিংবদন্তি এই গীতিকবি, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপ রচয়িতা ও সুরকার গাজী মাজহারুল আনোয়ারের চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকী। ২০২২ সালের এই দিনে ঢাকায় ৭৯ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। তাঁর প্রয়াণে বাংলা গান ও চলচ্চিত্রের অঙ্গনে নেমে এসেছিল গভীর শোক। চার বছর পরও তাঁর লেখা গান মানুষের মুখে মুখে ফিরছে, নতুন প্রজন্মের কাছেও তাঁর সৃষ্টি হয়ে আছে সমান জনপ্রিয়।
১৯৪৩ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি কুমিল্লার দাউদকান্দি থানার তালেশ্বর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তাঁর বাবা মোজাম্মেল হোসেন এবং মা খাদেজা বেগম। কুমিল্লা জেলা স্কুল থেকে এসএসসি, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে এইচএসসি এবং নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজ থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন তিনি।
১৯৬৪ সালে তৎকালীন রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা কেন্দ্রের জন্য গান লেখার মধ্য দিয়ে তাঁর পেশাগত সংগীতজীবনের সূচনা। দেশের টেলিভিশনের যাত্রার শুরুর সময় থেকেই তিনি নিয়মিত গান ও নাটক লিখেছেন। ১৯৬৭ সালে চলচ্চিত্রকার সুভাষ দত্ত পরিচালিত ‘আয়না ও অবশিষ্ট’ চলচ্চিত্রে গান লেখার মধ্য দিয়ে চলচ্চিত্রের গানের জগতে তাঁর প্রবেশ। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।
ছয় দশকের কাছাকাছি সৃষ্টিশীল জীবনে তিনি অসংখ্য চলচ্চিত্রে গান লিখেছেন। ‘আবির্ভাব’, ‘নীল আকাশের নিচে’, ‘পীচঢালা পথ’, ‘জয় বাংলা’, ‘স্বরলিপি’, ‘ওরা ১১ জন’, ‘রংবাজ’, ‘বেঈমান’, ‘নয়নতারা’, ‘অনন্ত প্রেম’, ‘গোলাপী এখন ট্রেনে’, ‘অশিক্ষিত’, ‘মহানগর’, ‘নতুন বউ’, ‘মা ও ছেলে’, ‘রাজলক্ষ্মী শ্রীকান্ত’, ‘আশা ভালোবাসা’, ‘স্বপ্নের পৃথিবী’, ‘হৃদয়ের কথা’, ‘তুমি কত সুন্দর’, ‘তুমি আমার স্বামী’, ‘লালচর’, ‘মাটির পরী’সহ বহু চলচ্চিত্র তাঁর গানের সৃষ্টিতে সমৃদ্ধ হয়েছে।
তাঁর কলমে প্রেম যেমন পেয়েছে গভীর আবেগ, তেমনি দেশাত্মবোধক গান পেয়েছে দুর্দমনীয় শক্তি। মুক্তিযুদ্ধ ও দেশপ্রেমের চেতনায় রচিত তাঁর গান বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’, ‘একতারা তুই দেশের কথা বল রে এবার বল’ এবং ‘একবার যেতে দে না আমার ছোট্ট সোনার গাঁয়’-এই তিনটি গান বিবিসির জরিপে সর্বকালের সেরা ২০ বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
তাঁর জনপ্রিয় গানের তালিকা এত দীর্ঘ যে তা দিয়ে একাধিক প্রজন্মের সংগীতস্মৃতি আঁকা যায়। ‘নীল আকাশের নিচে আমি রাস্তা চলেছি একা’, ‘আছেন আমার মোক্তার আছেন আমার ব্যারিস্টার’, ‘ইশারায় শিষ দিয়ে’, ‘চোখের নজর এমনি কইরা’, ‘চিঠি দিও প্রতিদিন চিঠি দিও’, ‘পিচঢালা এ পথটারে ভালোবেসেছি’, ‘গানের খাতায় স্বরলিপি লিখে কী হবে’, ‘আকাশের হাতে আছে একরাশ নীল’, ‘বিদেশ গিয়া বন্ধু তুমি আমায় ভুইলো না’, ‘মাগো তোর চরণতলে বেহেশত আমার’, ‘গীতিময় এই দিন চিরদিন রবে কি’, ‘লোকে বলে রাগ নাকি অনুরাগের আয়না’, ‘সবাই বলে বয়স বাড়ে আমি বলি কমেরে’, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায় কেউ পায় কেউবা হারায়’-এমন অসংখ্য গান আজও শ্রোতাদের স্মৃতিতে অমলিন।
গাজী মাজহারুল আনোয়ারের বিশেষত্ব ছিল তাঁর স্বতঃস্ফূর্ত সৃষ্টিশক্তি। খুব অল্প সময়ের মধ্যে গান রচনার অসাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। তিনি ছিলেন স্বভাবকবি। তাঁর লেখায় একদিকে যেমন সহজ-সরল ভাষায় মানুষের আবেগ ফুটে উঠেছে, অন্যদিকে তেমনি ছিল গভীর জীবনদর্শন ও সময়ের প্রতি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
চলচ্চিত্রে শুধু গীতিকার হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি। কাহিনী, চিত্রনাট্য ও সংলাপ রচনাতেও রেখেছেন শক্তিশালী স্বাক্ষর। ‘মানুষের মন’, ‘কাঁচের স্বর্গ’, ‘অপরাধ’, ‘গড়মিল’, ‘বেলা শেষের গান’, ‘সমাধি’, ‘বন্ধু’, ‘অবাক পৃথিবী’, ‘প্রতিনিধি’, ‘আসামী’, ‘জিঞ্জির’, ‘অন্তরালে’, ‘আনারকলি’, ‘বানজারান’, ‘স্বাধীন’, ‘তপস্যা’ ও ‘ক্ষুধা’সহ বহু চলচ্চিত্রের গল্প, চিত্রনাট্য ও সংলাপ তাঁর সৃষ্টিশীলতার পরিচয় বহন করে।
পরবর্তী সময়ে চলচ্চিত্র পরিচালনা ও প্রযোজনাতেও যুক্ত হন তিনি। ১৯৮২ সালে মুক্তি পায় তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘নান্টু ঘটক’। এরপর ‘শাস্তি’, ‘চোর’, ‘বিচারপতি’, ‘সন্ধি’, ‘স্বাক্ষর’, ‘শর্ত’, ‘স্বাধীন’, ‘সমর’, ‘শ্রদ্ধা’, ‘স্নেহ’, ‘আম্মা’, ‘পরাধীন’, ‘তপস্যা’, ‘উল্কা’, ‘ক্ষুধা’, ‘রাগী’, ‘আর্তনাদ’, ‘জীবনের গল্প’, ‘এই যে দুনিয়া’, ‘পাষাণের প্রেম’ ও ‘হৃদয় ভাঙ্গা ঢেউ’সহ বেশ কিছু চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন তিনি।
তাঁর প্রযোজনা-পরিবেশনা প্রতিষ্ঠানের নাম ছিল ‘দেশ চিত্রকথা’। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি ‘সমাধান’, ‘স্বীকৃতি’, ‘গড়মিল’, ‘অগ্নিশিখা’, ‘সমাধি’, ‘অপরাধ’, ‘অনুরোধ’, ‘বন্ধু’, ‘জিঞ্জির’, ‘আনারকলি’, ‘নান্টু ঘটক’, ‘শাস্তি’, ‘বিচারপতি’, ‘স্বাক্ষর’, ‘সন্ধি’, ‘স্বাধীন’, ‘শর্ত’, ‘সমর’, ‘শ্রদ্ধা’, ‘ক্ষুধা’, ‘স্নেহ’, ‘তপস্যা’, ‘উল্কা’, ‘আম্মা’, ‘পরাধীন’, ‘আর্তনাদ’, ‘পাষাণের প্রেম’ ও ‘এই যে দুনিয়া’সহ বিভিন্ন চলচ্চিত্র প্রযোজনা করেন।
সৃষ্টিশীল অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছয়বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৯২, ১৯৯৬, ২০০১, ২০০২, ২০০৩ ও ২০১৭ সালে তিনি এই সম্মান অর্জন করেন। ২০০২ সালে একুশে পদক এবং ২০২১ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পান তিনি। এ ছাড়া বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কার, বিজেএমই অ্যাওয়ার্ড, ডেইলি স্টারের জীবনব্যাপী সম্মাননাসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন। মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদানের জন্য পেয়েছেন বাংলাদেশ প্রেসিডেন্ট গোল্ড মেডেল অ্যাওয়ার্ড।
তাঁর জনপ্রিয় গান ও গান রচনার পেছনের গল্প নিয়ে ‘অল্প কথার গল্প গান’ নামে তিন খণ্ডের বইও প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি খণ্ডে রয়েছে দুই শতাধিক গানের কথা এবং সেসব কালজয়ী গান সৃষ্টির নেপথ্যকাহিনি। ভাষাচিত্র প্রকাশনী থেকে খন্দকার মনিরুল ইসলাম সোহেল বইগুলো প্রকাশ করেন।
শিল্প-সংস্কৃতির পাশাপাশি রাজনীতিতেও সক্রিয় ছিলেন গাজী মাজহারুল আনোয়ার। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাবেক সভাপতি এবং বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
ব্যক্তিজীবনে তিনি এক পুত্র ও এক কন্যাসন্তানের জনক ছিলেন। তাঁর সন্তানরাও শিল্প-সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত।
গাজী মাজহারুল আনোয়ার ছিলেন বাংলা গানের এক বিশাল অধ্যায়ের নাম। তাঁর গানের বিষয় ছিল বিস্তৃত—দেশ ও মানুষ, প্রেম ও বিরহ, প্রকৃতি ও জীবন, বিদ্রোহ ও মানবতা, আনন্দ ও বেদনা। মানুষের হৃদয়ের অনুভূতিকে সহজ অথচ গভীর ভাষায় প্রকাশ করার যে অসাধারণ ক্ষমতা তাঁর ছিল, সেটিই তাঁকে সময়ের সীমানা পেরিয়ে অমর করে দিয়েছে।
শারীরিকভাবে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন চার বছর আগে। কিন্তু তাঁর সৃষ্টি চলে যায়নি। রেডিও, টেলিভিশন, চলচ্চিত্র কিংবা মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতিতে তাঁর গান এখনো বেঁচে আছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম তাঁর লেখা গাইবে, শুনবে এবং নতুন করে আবিষ্কার করবে। বাংলা গানের এই কিংবদন্তি গীতিকবি তাই মৃত্যুর মধ্য দিয়েও সৃষ্টির অমরত্বে বেঁচে থাকবেন।
চতুর্থ মৃত্যুবার্ষিকীতে কিংবদন্তি এই শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা। তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি।

গাজী মাজহারুল, গীতিকবি, বাংলা গান


এ জাতীয় আরো খবর