মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬

হিমালয়ের বন্যায় মৃত্যুর মিছিল,নেপালে শুরু মরদেহ দাফন

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৬-০৮-৩১ ১১:১৮:১২
ছবি: সংগৃহীত।

হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে বিপুল প্রাণহানির পর নেপালে উদ্ধার হওয়া মরদেহের দাফন শুরু হয়েছে। সোমবার থেকে দেশটির বিভিন্ন স্থানে মরদেহ দাফনের প্রক্রিয়া শুরু হয়। ভয়াবহ পানির স্রোতে গ্রাম ও জনপদ নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি এখনো হাজার হাজার মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন।
নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে পরিবারের সদস্যরা উদ্ধারকেন্দ্র ও হাসপাতালগুলোতে ছুটছেন। একই সময়ে উদ্ধার হওয়া মরদেহ শনাক্ত করতে উপচে পড়া মর্গে যেতে হচ্ছে অনেক পরিবারকে। স্বজনদের জন্য এ পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত বুধবার বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের বিশাল স্রোত নেমে এসে নেপালের বিভিন্ন গ্রাম ও শহর প্লাবিত করে। সীমান্তের ওপারে চীনের তিব্বতেও এর ব্যাপক প্রভাব পড়ে। দুই অঞ্চলে এ পর্যন্ত অন্তত ৭৯৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্রোতে ভেসে কিছু মরদেহ ভারতের ভূখণ্ডে চলে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দুই দেশে এখনো অন্তত ৩ হাজার ৪৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে তিব্বতের পবিত্র কৈলাস পর্বতে যাওয়া পর্যটক ও তীর্থযাত্রী রয়েছেন। নেপালে নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন জলবিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত ৯৩৩ জন শ্রমিকও রয়েছেন।
নিখোঁজ শ্রমিকদের উদ্ধারে রোববার ত্রিশূলী-৩ এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের একটি টানেলে নেপালি সেনাবাহিনী ও প্রকৌশলীরা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে খননকাজ চালান। সেখানে শ্রমিকরা আটকা পড়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর আগে উদ্ধারকারীরা টানেলের ভেতরে একটি পাইপ প্রবেশ করাতে সক্ষম হন।
দুর্যোগ থেকে বেঁচে যাওয়া শ্রমিকেরা জানিয়েছেন ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশের ৩৩ বছর বয়সী সুরেন্দ্র দৌলুরি আপার ত্রিশূলী-১ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কাজ করছিলেন। কাঠমান্ডুতে উদ্ধারের চার দিন পর তিনি এএফপিকে জানান, হঠাৎ প্রচণ্ড শব্দ শোনার পর তাঁরা দেখতে পান টারবাইন রাখার তলা কাদা ও পানিতে তলিয়ে গেছে। সেখানে ছয়জন শ্রমিক আটকা পড়েছিলেন। তাঁদের পাঁচজনকে উদ্ধার করা গেলেও একজন মারা যান।
কিছু শ্রমিক উঁচু জায়গা কিংবা নির্মাণস্থলের এমন অংশে আশ্রয় নিতে সক্ষম হন, যেখানে পানির প্রবল স্রোত পৌঁছাতে পারেনি।
নেপালি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, রোববার রাতভর বৃষ্টি এবং নদীর পানি বেড়ে যাওয়ায় উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হয়। খনন করা অংশে পানি ঢুকে পড়ায় কিছু সময় কাজ বন্ধ রাখতে হয়। পরে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হলে আবার উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, হিমবাহ ধসের ফলে পানি, বরফ ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নদীপথে নেমে আসার কারণেই এই ভয়াবহ দুর্যোগের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রবল স্রোতে কয়েকটি বিশাল জলাধারসদৃশ হ্রদ তৈরি হয়েছে। এসব জলাধার নতুন কোনো বিপদ তৈরি করতে পারে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন জরুরি উদ্ধারকর্মীরা। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, তিব্বত সীমান্তের একটি বন্দর এলাকায় ভূমিধসের পর নতুন একটি হ্রদ তৈরি হওয়ায় সেখানকার চীনা উদ্ধারকারীদের রোববার নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চীনের হিসাবে তিব্বতে এখন পর্যন্ত ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। অন্যদিকে নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা জানিয়েছে, দেশটিতে নিখোঁজের সংখ্যা বেড়ে ২ হাজার ৫০২ জনে দাঁড়িয়েছে। দেশটির অংশে নিশ্চিতভাবে ৭৮১ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে।
এত বিপুলসংখ্যক মরদেহ উদ্ধারের পরও পর্যাপ্ত হিমায়িত সংরক্ষণব্যবস্থা না থাকায় নেপালি কর্তৃপক্ষ পরিচয় শনাক্তের পুরো প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার আগেই দাফন শুরু করতে বাধ্য হয়েছে। তবে মরদেহগুলো থেকে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরবর্তী সময়ে এসব নমুনার মাধ্যমে পরিচয় নিশ্চিত করে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে, যাতে পরিবারগুলো নিজেদের প্রচলিত রীতি অনুযায়ী শেষকৃত্য সম্পন্ন করতে পারে।
নিখোঁজ স্বজনদের সন্ধানে প্রতিদিনই বিভিন্ন শনাক্তকেন্দ্রে ভিড় করছেন পরিবারের সদস্যরা। উদ্ধার হওয়া মরদেহের ছবি বড় পর্দায় দেখানো হচ্ছে সেখানে। প্রিয়জনকে খুঁজতে গিয়ে অনেকেই এমন ভয়াবহ দৃশ্যের মুখোমুখি হচ্ছেন, যা তাদের জন্য হয়ে উঠছে আরেক নির্মম অভিজ্ঞতা।
উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দুর্গম এলাকা থেকে মরদেহ ও নিখোঁজদের সন্ধান পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্যোগের প্রকৃত চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।

হিমালয়, বন্যা, উদ্ধার


এ জাতীয় আরো খবর