সোমবার, আগস্ট ৩১, ২০২৬

মহেশখালীতে চেকপোস্টে সিএনজি থেকে ৮ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার,গ্রেপ্তার ২

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৮-৩০ ২৩:৩৮:৩৩

মহেশখালী (কক্সবাজার) 
মহেশখালীতে  পুলিশের  চেকপোস্টে  তল্লাশি  চালিয়ে একটি   সিএনজিচালিত  অটোরিকশা   থেকে  আটটি দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় অস্ত্র  বহনের   অভিযোগে   দুজনকে  গ্রেপ্তার  করেছে পুলিশ।  পুলিশের   উপস্থিতি  টের  পেয়ে সিএনজিতে থাকা আরও দুই ব্যক্তি পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে।
শনিবার   (২৯  আগস্ট)   রাত   সোয়া   ৯ টার   দিকে উপজেলার  ছোট মহেশখালী  ইউনিয়নের  ঠাকুরতলা চৌরাস্তা মোড়ে এ অভিযান চালানো হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে দুটি দেশীয় তৈরি রাইফেল, পাঁচটি একনলা বন্দুক ও একটি  এলজি। এ সময় অস্ত্র বহনে ব্যবহৃত   একটি   কালো   রঙের   ট্র্যাভেল  ব্যাগ এবং গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের  ব্যবহৃত দুটি মোবাইল ফোনও জব্দ করা হয়েছে।  চেকপোস্টে   থামতেই  পালানোর  চেষ্টা
পুলিশের   দেওয়া   তথ্য  অনুযায়ী, মহেশখালী থানার ভারপ্রাপ্ত   কর্মকর্তা   (ওসি)   মো. আব্দুস  সুলতানের দিকনির্দেশনায় পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) প্রতুল কুমার শীলের   নেতৃত্বে   একটি  দল  ওই   এলাকায়  অবৈধ মাদকদ্রব্য    ও   আগ্নেয়াস্ত্র  উদ্ধারে  বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছিল।  রাত   ৯টা ১৫   মিনিটের  দিকে আদিনাথ  জেটিঘাট   এলাকা  থেকে   বদরখালীগামী একটি    সিএনজিচালিত     অটোরিকশা   ঠাকুরতলা চৌরাস্তা মোড়ের চেকপোস্টে পৌঁছালে পুলিশ সেটিকে থামার  সংকেত  দেয়।   সিএনজি  থামার পর ভেতরে থাকা কয়েকজন ব্যক্তি দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। পুলিশ   ধাওয়া   করে  দুজনকে  আটক করতে সক্ষম হলেও অপর দুজন পালিয়ে যায়।
পরে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে সিএনজিরভেতরে তাদের  পায়ের  কাছে   থাকা  একটি  কালো  ট্র্যাভেল ব্যাগে আগ্নেয়াস্ত্র থাকার কথা তারা স্বীকার করেন বলে পুলিশ   জানিয়েছে।  কালো   ব্যাগে  মিলল  আট অস্ত্র পুলিশের   ভাষ্য  অনুযায়ী,  উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে আটক  ব্যক্তিদের  দেখানো   মতে   সিএনজির  ভেতর থেকে  কালো  রঙের   ট্র্যাভেল  ব্যাগটি  বের করা হয়। ব্যাগের   ভেতরে   সাদা  ও কালো পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় পাওয়া  যায়  আটটি দেশীয় তৈরি আগ্নেয়াস্ত্র।
উদ্ধার  হওয়া  অস্ত্রের  তালিকায়  রয়েছে, দুটি দেশীয় তৈরি রাইফেল;  পাঁচটি  দেশীয়  তৈরি একনলা বন্দুক;
একটি দেশীয় তৈরি এলজি। পুলিশ জানিয়েছে, উদ্ধার করা  অস্ত্রগুলোর  প্রতিটিতে  ট্রিগার  ও ফায়ারিং পিন সংযুক্ত ছিল এবং সেগুলো সচল অবস্থায় পাওয়া যায়।
অস্ত্রের   পাশাপাশি  একটি  কালো  ট্র্যাভেল ব্যাগ, দুটি পলিথিন   এবং   গ্রেপ্তার   ব্যক্তিদের    ব্যবহৃত      দুটি অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন জব্দ করা হয়। একটি ফোন Infinix X6855   এবং   অন্যটি   Vivo Y17s মডেলের বলে পুলিশ জানিয়েছে।
গ্রেপ্তার দুজন কারা?পুলিশ  ও  স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী,গ্রেপ্তার দুজন হলেন চট্টগ্রামের পটিয়া  উপজেলার  কুসুমপুর  ইউনিয়নের  হরিনখাইন এলাকার   মো. রুবেল   মিয়া (৩৪)  এবং মহেশখালীর ছোট   মহেশখালী   ইউনিয়নের   ঠাকুরতলা  এলাকার মানিক দে (৩৮)।  তবে তারা  নিজেরা  অস্ত্রের  মালিক, বহনকারী   নাকি  বৃহত্তর কোনো সরবরাহচক্রের অংশ তা তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
আট দিনের  ব্যবধানে দ্বিতীয় অস্ত্র-সংশ্লিষ্ট ঘটনা ঠাকুর তলার এই অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাটি ঘটেছে এর মাত্র আট দিনের    মাথায়,    যখন     মহেশখালীর     শাপলাপুর ইউনিয়নের   মিঠাছড়ি   এলাকার   পাহাড়ে   পুলিশের অভিযানে   অস্ত্র   তৈরির  বিভিন্ন  সরঞ্জাম  ও  যন্ত্রাংশ উদ্ধারের কথা জানিয়েছিল  পুলিশ। ২১ আগস্টের ওই অভিযানে   অস্ত্র    তৈরির     সরঞ্জামসহ   একজনকে গ্রেপ্তারের তথ্যও  প্রকাশিত  হয়েছে। পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র    তৈরির    সরঞ্জাম   উদ্ধারের   পরপরই  একটি
সিএনজি   থেকে   আটটি   তৈরি  আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা  মহেশখালীতে  অস্ত্রের উৎস  ও  সরবরাহব্যবস্থা নিয়ে নতুন  করে  প্রশ্ন  তুলেছে।  তবে দুই ঘটনার মধ্যে সরাসরি  কোনো  যোগসূত্র  রয়েছে  এমন তথ্য এখনো পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।
কোথা থেকে এলো এত অস্ত্র?  একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় একসঙ্গে আটটি  আগ্নেয়াস্ত্র পরিবহনের ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন।  অস্ত্রগুলো  কোথায়  তৈরি হয়েছে? কোথা থেকে সংগ্রহ   করা   হয়েছে? কোথায়  নেওয়া হচ্ছিল? কার কাছে সরবরাহের কথা ছিল?  এই চালানের সঙ্গে আর কারা জড়িত? পালিয়ে যাওয়া দুই ব্যক্তির পরিচয় কী?
এবং কয়েক দিন আগে মিঠাছড়ি পাহাড়ে  অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম   উদ্ধারের  ঘটনার  সঙ্গে এর  কোনো সম্পর্ক রয়েছে কি না  এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্তের ওপর নির্ভর করছে।
পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে,পলাতক দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং অস্ত্রের চালানের সঙ্গে জড়িত অন্যদেরও আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
মহেশখালীর পাহাড়ি অঞ্চল  নিয়ে উদ্বেগ,মহেশখালীর বিস্তীর্ণ পাহাড়ি  ও  দুর্গম এলাকাকে  ঘিরে দেশীয় অস্ত্র তৈরি ও মজুতের অভিযোগ নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অল্প  ব্যবধানে  অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম এবং তৈরি অস্ত্র   উদ্ধারের ঘটনা  আইনশৃঙ্খলা  পরিস্থিতি   নিয়ে স্থানীয়দের   মধ্যে  নতুন   করে  উদ্বেগ  তৈরি করেছে।
স্থানীয়দের   মতে, শুধু  অস্ত্র   বহনকারী  বা সরবরাহে জড়িত   ব্যক্তিদের   গ্রেপ্তার   করলেই   সমস্যার স্থায়ী সমাধান   হবে না।   অস্ত্র    তৈরির    কারিগর, অর্থের জোগানদাতা,  সরবরাহকারী  এবং  সম্ভাব্য ক্রেতাদের শনাক্ত করে পুরো নেটওয়ার্ক ভেঙে  দেওয়া প্রয়োজন।
তদন্তে গুরুত্ব পাচ্ছে মোবাইল ফোন গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ   থেকে দুটি   অ্যান্ড্রয়েড   মোবাইল   ফোন জব্দ করেছে পুলিশ।   তদন্তের   স্বার্থে  এসব  ফোনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হলে অস্ত্রের উৎস ও  সম্ভাব্য যোগাযোগ সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। কার সঙ্গে যোগাযোগ  করা হয়েছে, কোথা  থেকে নির্দেশনা এসেছে,   অস্ত্র   পরিবহনের  আগে  ও পরে কার সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে এ ধরনের তথ্য তদন্তে সহায়ক হতে পারে।   তবে এসব বিষয়ে   তদন্ত  শেষ হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তিকে  জড়িত হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
মামলা, আদালতে সোপর্দ, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার দুজন ও পলাতক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মহেশখালী থানায় মামলা করা হয়েছে।  মামলাটি  ৩০ আগস্ট দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর ৩১ এবং জিআর নম্বর ২৬১/২৬। তাদের বিরুদ্ধে   The Arms Act,   1878-এর 19A  ধারায় মামলা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে।গ্রেপ্তার দুজনকে বিধি অনুযায়ী  আদালতে  সোপর্দ করা  হয়েছে। একই সঙ্গে পলাতক দুই  ব্যক্তিকে  গ্রেপ্তারে বিশেষ অভিযান অব্যাহত     রয়েছে।    পুলিশের   অভিযান   অব্যাহত
মহেশখালী থানা পুলিশ  জানিয়েছে, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধারে  বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে নজরদারি ও চেকপোস্ট  কার্যক্রম   জোরদার   করা হয়েছে। ৩০ আগস্ট   মহেশখালী   থানা  মাঠে   আয়োজিত   প্রেস ব্রিফিংয়েও   পুলিশ   অস্ত্রবিরোধী  অভিযান  অব্যাহত রাখার কথা  জানিয়েছে।  অস্ত্রের চালান আটকের এই অভিযানকে   আইনশৃঙ্খলা   রক্ষাকারী  বাহিনীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হিসেবে দেখা হলেও তদন্তের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর   করবে   এর   নেপথ্যে   থাকা উৎস ও সরবরাহচক্র   কতটা   শনাক্ত  করা যায়  তার  ওপর।
এখন সবচেয়ে   গুরুত্বপূর্ণ   প্রশ্ন  ঠাকুরতলার  কালো ব্যাগে থাকা  আটটি অস্ত্র কার জন্য যাচ্ছিল এবং এর নেপথ্যে   থাকা মূল   হোতাদের   কাছে  তদন্ত কতদূর পৌঁছাতে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর