সত্য ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে আব্দুস সালামের জীবন ও সংগ্রাম অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, বর্তমান বিশ্বে আব্দুস সালামের মতো স্বাধীনচেতা সাংবাদিকের প্রয়োজন আরও বেশি। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য স্পষ্ট করার পাশাপাশি নাগরিক স্বাধীনতা ও স্বাধীনচেতা মানুষের পক্ষে দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানোর জন্য তাঁর আদর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
রোববার প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ ও তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের যৌথ আয়োজনে পিআইবির মিলনায়তনে সাংবাদিক আব্দুস সালামের ১১৬তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সাংবাদিক আব্দুস সালাম স্মৃতি সংসদ অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করে।
চাকরি ছেড়ে সাংবাদিকতাকে ব্রত করেছিলেন
আব্দুস সালামের শিক্ষাজীবনের কথা তুলে ধরে রিজভী বলেন, মুসলমান বাঙালি হিসেবে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াশোনা করেন এবং ইংরেজি সাহিত্যে শিক্ষা সম্পন্ন করেন। পরে সরকারি চাকরিতে যোগ দিলেও একপর্যায়ে তা ছেড়ে সাংবাদিকতাকে নিজের কর্ম ও সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নেন।
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সঙ্গে আব্দুস সালামের জীবনসংগ্রামের কিছু মিল রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, নজরুল কবি হিসেবে বেশি পরিচিত হলেও সাংবাদিকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। আব্দুস সালামও ছিলেন সাংবাদিক। দুজনকেই কারাবরণ ও নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাঁদের লেখনীতে কর্তৃত্ববাদ ও কায়েমি স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রকাশ ঘটেছে।
ভাষা আন্দোলনেও রেখেছেন ভূমিকা
ভাষা আন্দোলনে আব্দুস সালামের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন রিজভী। তিনি বলেন, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ের এক সপ্তাহ আগে আব্দুস সালাম ভাষার পক্ষে একটি কলাম লিখেছিলেন। এর জেরে তাঁকে ধর্মবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করে গ্রেপ্তার করা হয়।
আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ড নট মাস্টার’ বইয়ের সমালোচনা করে আব্দুস সালাম তৎকালীন ‘অবজারভার’ পত্রিকায় একটি নিবন্ধ প্রকাশ করেন। এর পরদিন পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাঁকে আবারও কারাবরণ করতে হয়।
রিজভীর ভাষায়, সীমিত গণতন্ত্রের সময়, ফ্যাসিবাদী শাসন কিংবা সামরিক শাসন-প্রতিটি পর্যায়েই আব্দুস সালাম নিপীড়নের মুখে পড়েছেন। কিন্তু কোনো চাপই তাঁকে তাঁর অবস্থান থেকে সরাতে পারেনি।
তিনি আরও বলেন, আব্দুস সালাম কেবল সংবাদপত্রের দপ্তরে বসে লেখালেখি করা সাংবাদিক ছিলেন না। সমাজ ও রাষ্ট্র সংকটে পড়লে তিনি একজন সচেতন, বিবেকবান ও শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি তিনি সামাজিকভাবেও দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছেন।
বারবার নির্যাতন ও চাপের মুখোমুখি হয়েও তাঁর স্বাধীনচেতা অবস্থান অটুট ছিল উল্লেখ করে রিজভী বলেন, সাংবাদিকতার প্রতি নিষ্ঠা এবং বস্তুনিষ্ঠতার কারণে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানসহ দুই পাকিস্তানের সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।
আব্দুস সালাম সাংবাদিকতাকে পেশার চেয়ে ব্রত হিসেবে নিয়েছিলেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতাকে তিনি সাংবাদিকতার প্রধান লক্ষ্য করেছিলেন। অর্থ, ভয়ভীতি কিংবা ক্ষমতার প্রভাব কোনো কিছুই তাঁকে নীতির প্রশ্নে আপস করাতে পারেনি।
সমালোচনার সুযোগ দিতে হবে: জাহেদ উর রহমান
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেন, সরকারের সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রেও বর্তমান সরকার অত্যন্ত উদার।
তিনি বলেন, কোনো গণতান্ত্রিক সরকার ভবিষ্যতে জনগণের ভোটে আবার নির্বাচিত হতে চাইলে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত করে কোনো সুফল পাওয়া যাবে না। বরং সরকারের সমালোচনা গ্রহণ করতে হবে এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ দিতে হবে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম বলেন, প্রতিটি ক্ষেত্রে এমন কিছু মহৎ মানুষের আবির্ভাব ঘটে, যাঁরা আলোকবর্তিকার মতো সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রকে পথ দেখান। সাংবাদিক আব্দুস সালাম ছিলেন তেমনই একজন। তাঁর ভাষায়, পিআইবির প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তাঁর অবদান গভীরভাবে যুক্ত।
বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান সম্পাদক কাদের গনি চৌধুরী বলেন, গণমাধ্যম সঠিকভাবে পরিচালিত না হলে কোনো দেশই মর্যাদা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না। সাংবাদিকদের সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থেকে দেশপ্রেম, সাহস ও প্রজ্ঞার সমন্বয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
আব্দুস সালাম সাংবাদিকতায় সাহস, দেশপ্রেম ও প্রজ্ঞার যে সমন্বিত দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন, বর্তমান ও তরুণ সাংবাদিকদের তা অনুসরণ করা উচিত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সমন্বয়ক ফেলো অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান, দি ফিনান্সিয়াল এক্সপ্রেস পত্রিকার সম্পাদক শামসুল হক জাহিদ, টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের আহ্বায়ক ড. আবদুল হাই সিদ্দিক, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব ভূঁইয়া, টেলিভিশন এডিটরস কাউন্সিলের সদস্যসচিব সৈয়দ জুবায়ের আহমেদ বাবু এবং সাংবাদিক আব্দুস সালাম স্মৃতি সংসদের সভাপতি রেহানা সালাম।
অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলাদেশ প্রতিদিনের সম্পাদক লোটন একরাম।
আব্দুস সালাম,সাংবাদিকতা,গণমাধ্যম