রবিবার, মে ১০, ২০২৬

পুলিশকে জনগণের আস্থার প্রতীক হতে হবে

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৫-১০ ১৫:৩৮:৩৭
ছবি: সংগৃহীত।

পুলিশ শুধু একটি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নয়,রাষ্ট্র ও নাগরিকের মধ্যকার সবচেয়ে দৃশ্যমান সেতুবন্ধনও বটে। একজন সাধারণ মানুষ যখন বিপদে পড়ে,যখন অন্যায়ের শিকার হয় কিংবা যখন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে-তখন তার প্রথম আশ্রয়স্থল হয় পুলিশ। তাই একটি দেশের গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক নিরাপত্তার মানদণ্ড অনেকাংশেই নির্ধারিত হয় পুলিশ বাহিনীর আচরণ, পেশাদারিত্ব ও জবাবদিহিতার মাধ্যমে।

পুলিশ সপ্তাহ-২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দেওয়া বক্তব্যে সেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোরই প্রতিফলন দেখা গেছে। বিশেষ করে তিনি যখন বলেন, 'রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও জনগণের বিরুদ্ধে যেন আর কোনো স্বৈরাচার পুলিশকে ব্যবহার করতে না পারে'-তখন সেটি কেবল একটি রাজনৈতিক বক্তব্য নয়,বরং বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের গভীর বাস্তবতা থেকে উঠে আসা এক সতর্ক উচ্চারণ।আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে।
বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশ বাহিনীর গৌরব যেমন আছে,তেমনি বিতর্কও কম নয়। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাজারবাগে পুলিশ সদস্যদের আত্মত্যাগ স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধগুলোর একটি। সেই আত্মদান প্রমাণ করে,পুলিশ শুধু প্রশাসনিক বাহিনী নয়; প্রয়োজনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গকারী শক্তিও। কিন্তু স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক প্রভাব,দলীয় ব্যবহারের অভিযোগ এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় পুলিশের ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে পড়েছে। ফলে জনগণের আস্থা অর্জনের বিষয়টি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো-তিনি পুলিশের প্রতি শুধু কঠোর আইন প্রয়োগের আহ্বান জানাননি,বরং মানবিক আচরণের ওপরও জোর দিয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, সাধারণ মানুষ থানায় গেলে প্রায়ই হয়রানি,দালালচক্র,দীর্ঘসূত্রতা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ করেন। এতে শুধু ব্যক্তি পুলিশ সদস্য নয়,পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি মানুষের নেতিবাচক ধারণা তৈরি হয়। তাই পুলিশের আচরণে পরিবর্তন এখন সময়ের দাবি।
বর্তমান বিশ্বে আধুনিক পুলিশিংয়ের মূল ভিত্তি হলো 'জনবান্ধব পুলিশ ব্যবস্থা'। অর্থাৎ পুলিশ হবে জনগণের বন্ধু,ভয়ের প্রতীক নয়। প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত, দ্রুত সেবা, দুর্নীতিমুক্ত কার্যক্রম এবং মানবিক ব্যবহার-এই চারটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে উঠতে পারে একটি আধুনিক পুলিশ ব্যবস্থা। বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশ পুলিশের সাফল্যের কথাও উল্লেখ করেছেন। এটি নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। বিশ্বের বিভিন্ন সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে বাংলাদেশের পুলিশ সদস্যরা দক্ষতা ও মানবিকতার পরিচয় দিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে,আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যে পেশাদারিত্বের পরিচয় তারা দেন, দেশের ভেতরেও কি সেই মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে? জনগণ এখন সেই উত্তরই খুঁজছে।
একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পুলিশ কখনোই কোনো ব্যক্তি,দল বা সরকারের হাতিয়ার হতে পারে না। তাদের প্রধান পরিচয় হতে হবে-সংবিধান ও আইনের রক্ষক হিসেবে। রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে যদি পুলিশের ভূমিকা নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়,তাহলে রাষ্ট্রের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। তাই পুলিশ বাহিনীকে দলীয় প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে একটি নিরপেক্ষ,দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলা জরুরি।
আজকের বাংলাদেশে সামাজিক অপরাধ,মাদক,সাইবার অপরাধ,নারী ও শিশু নির্যাতন,কিশোর গ্যাং এবং উগ্রবাদ-সব মিলিয়ে আইনশৃঙ্খলার চ্যালেঞ্জ বহুমাত্রিক। এসব মোকাবিলায় শুধু অস্ত্র বা ক্ষমতা নয়, প্রয়োজন জনগণের আস্থা ও সহযোগিতা। আর সেই আস্থা অর্জনের একমাত্র পথ হলো সততা, পেশাদারিত্ব ও মানবিকতা।
পুলিশ সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণ তাই কেবল আনুষ্ঠানিক বক্তব্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা। এখন প্রয়োজন সেই বার্তাকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। কারণ জনগণের আস্থাহীন পুলিশ কখনো শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে পারে না; বরং জনআস্থাসম্পন্ন পুলিশই হতে পারে একটি নিরাপদ, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশের অন্যতম ভিত্তি।

লেখকঃ কলামিস্ট,সোস্যাল এক্টিভিস্ট,মানবাধিকার কর্মী। 


এ জাতীয় আরো খবর