সম্প্রতি ইসরাইলের চালানো ভয়াবহ বিমান হামলায় ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো অক্ষত থাকলেও প্রাণ হারিয়েছেন দেশটির শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী এবং সামরিক বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তারা। জাতিসংঘের পরমাণু পর্যবেক্ষক সংস্থা আন্তর্জাতিক আণবিক শক্তি সংস্থা (IAEA) নিশ্চিত করেছে, ইস্পাহান, ফোরদো, নাতানজ ও বুশেহরের গুরুত্বপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনাগুলো গুরুতর কোনো ক্ষতির শিকার হয়নি।
IAEA এক বিবৃতিতে জানায়, ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তারা নিশ্চিত হয়েছে যে—
ইস্পাহান শহরের ইউরেনিয়াম রূপান্তর কেন্দ্র অক্ষত রয়েছে।
ফোরদোর গোপন সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্টে কোনো তেজস্ক্রিয়তা বৃদ্ধি হয়নি।
নাতানজ পারমাণবিক স্থাপনায় বোমা হামলার খবর থাকলেও পরিকাঠামোতে গুরুতর ক্ষতি হয়নি।
বুশেহরের বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চলছে।
IAEA এই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে এবং আশ্বস্ত করেছে যে এখন পর্যন্ত কোনো ধরনের পারমাণবিক বিকিরণ ঝুঁকি তৈরি হয়নি।
তবে সামগ্রিক পরিস্থিতি থেকে অনেক দূরেই সরে এসেছে আশ্বস্তির চিত্র। ইরানি সংবাদমাধ্যম তাসনিম নিউজ জানিয়েছে, হামলায় ৬ জন শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী ও ৩ জন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা নিহত হয়েছেন।
নিহত বিজ্ঞানীরা হলেন:
আব্দুলহামিদ মিনুচেহর
আহমদ রেজা জোলফাকারি
সৈয়দ আমির হোসেন ফেকহি – শহীদ বেহেশতি বিশ্ববিদ্যালয়ের পারমাণবিক প্রকৌশল অনুষদের সদস্য ও ইরানের পারমাণবিক শক্তি সংস্থার উপ-প্রধান
মাতলাবিজাদেহ
মোহাম্মদ মাহদি তেহরানচি
ফেরেইদুন আব্বাসি – ইরানের পরমাণু গবেষণার পুরোধা ব্যাক্তিত্বদের অন্যতম
এছাড়া হামলায় নিহত হয়েছেন তিন শীর্ষ সেনা কর্মকর্তা:
মেজর জেনারেল মোহাম্মদ হোসেন বাকেরি – ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান
মেজর জেনারেল হোসেন সালামি – ইসলামিক রেভোলিউশন গার্ড কর্পসের (IRGC) প্রধান
মেজর জেনারেল গোলাম আলী রশিদ – খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় কমান্ডের সর্বোচ্চ কর্মকর্তা
ঘটনার পরপরই টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ী ইসরাইলের বিরুদ্ধে কঠিন হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি বলেন:
“এই কাপুরুষোচিত ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের জন্য ইহুদিবাদী সরকার তিক্ত ও বেদনাদায়ক এক পরিণতির মুখোমুখি হবে। ইরানের প্রতিশোধ হবে নিষ্ঠুর এবং চূড়ান্ত।”
তিনি আরও জানান, এই হামলা শুধু ইরানের বিরুদ্ধে নয়, বরং আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও সরাসরি আঘাত।
এই ঘটনার জেরে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে নতুন করে উত্তেজনার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং রাশিয়া—তিন পক্ষই তৎক্ষণাৎ উত্তেজনা প্রশমনের আহ্বান জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি না দিলেও হোয়াইট হাউস সূত্রে জানা গেছে, তারা ‘ঘটনার গভীর বিশ্লেষণ’ চালাচ্ছে।
ইরানের জন্য এই হামলা পূর্ব পরিকল্পিত ও কৌশলগত ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। যদিও স্থাপনাগুলো অক্ষত রয়েছে, তবুও শীর্ষ পরমাণু বিজ্ঞানী এবং জেনারেলদের প্রাণহানি দেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক নেতৃত্বের এক বড় অংশকে একঝটকায় শেষ করে দিলো।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি ছিল ইসরাইলের একটি ‘ডেকাপিটেশন স্ট্র্যাটেজি’, যার লক্ষ্য ছিল নেতৃত্ব ধ্বংস করা, অবকাঠামো নয়। এবং সেটি তারা বহুলাংশে বাস্তবায়ন করতেও সক্ষম হয়েছে।
সারসংক্ষেপে, ইসরাইলের হামলা পারমাণবিক অবকাঠামোতে তাৎক্ষণিক ক্ষতি না করলেও, ইরানের ভবিষ্যৎ পরমাণু কর্মসূচি ও সামরিক নেতৃত্বের ওপর এক গভীর আঘাত হেনেছে। আর এর জবাবে ইরান কী পদক্ষেপ নেয়—তা মধ্যপ্রাচ্য তথা বিশ্ব রাজনীতির আগামী দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।