বুধবার, জুন ১০, ২০২৬

রবীন্দ্রবাড়ি ভাঙচুরে মমতার কণ্ঠে ক্ষোভ-নরেন্দ্র মোদিকে কড়া চিঠি,আন্তর্জাতিক প্রতিবাদের আহ্বান

  • নিজস্ব প্রতিবেদক,
  • ২০২৫-০৬-১৩ ০০:৫৬:৩৫
ছবি সংগৃহিত

বাংলাদেশের সিরাজগঞ্জে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ঐতিহাসিক কাছারিবাড়িতে হামলার ঘটনায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি গভীর উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তিনি বিষয়টি নিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কড়া ভাষায় চিঠি লিখে অবিলম্বে কূটনৈতিক স্তরে পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার লেখা চিঠিতে মমতা বলেন, “সিরাজগঞ্জে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পৈতৃক ভিটেমাটি, যেটি শুধু একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা নয় বরং সারা উপমহাদেশের সাহিত্য-সংস্কৃতির প্রাণভোমরা-সেখানে এমন নৃশংস হামলা মর্মন্তুদ, লজ্জাজনক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি চূড়ান্ত অবমাননার শামিল।”
তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, এই বাড়িতেই কবি বহুবার এসেছেন, থেকেছেন, সৃষ্টি করেছেন তাঁর অমর সাহিত্য। তাঁর লেখা অনেক গুরুত্বপূর্ণ কবিতা, গান ও গদ্য এই কাছারিবাড়িতেই রচিত হয়েছে, যা বিশ্বসাহিত্যের সম্পদ।
“এটা শুধু একটা বাড়ির উপর আক্রমণ নয়, এটা গোটা বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির আত্মার উপর আঘাত,” বলেন মুখ্যমন্ত্রী।
চিঠিতে মমতা ব্যানার্জি বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, “বাংলার মানুষ রবীন্দ্রনাথকে কেবল একজন কবি বা সাহিত্যিক হিসেবে দেখেন না, তিনি আমাদের জাতিসত্তা, আমাদের ইতিহাসের বিবেক। এই হামলা কবিগুরুর চেতনার বিরুদ্ধে এক নির্মম আগ্রাসন।”
তিনি আরো লেখেন, “এই জঘন্য ঘটনা আমাদের জাতীয় গর্ব এবং উপমহাদেশের সৃজনশীলতার চেতনার উপর অশোভন আঘাত। স্বদেশী আন্দোলনের সময় যিনি ভাষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদের অনন্য উচ্চতা তৈরি করেছিলেন, তাঁর স্মৃতিবিজড়িত স্থানে এমন বর্বরতা শুধু নিন্দনীয় নয়, উদ্বেগজনকও।”
ভারতের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশ্যে লেখা চিঠিতে মমতা ব্যানার্জি সরাসরি অনুরোধ করেন, “আপনি দয়া করে প্রতিবেশী দেশের সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে জরুরি কূটনৈতিক যোগাযোগ স্থাপন করুন, এবং এই ধ্বংসাত্মক হামলার দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে অনুরোধ জানান।”
তিনি বলেন, “যদিও ইতিমধ্যেই অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে গেছে, তবু ভবিষ্যতে এমন হামলা রোধে আন্তর্জাতিক মহলে কঠোর প্রতিবাদ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। কারণ, রবীন্দ্রনাথ শুধু বাংলা বা ভারতবর্ষের নন-তিনি বিশ্বমানবতার প্রতীক।”
সিরাজগঞ্জের এই ঘটনায় শুধু মমতা নন, পশ্চিমবঙ্গ ও ভারতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মহলেও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সাহিত্যিক, নাট্যকার ও শিক্ষাবিদেরা এরইমধ্যে এই হামলার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন। অনেকে কলকাতায় বাংলাদেশ উপদূতাবাসের সামনে প্রতীকী অবস্থান কর্মসূচির পরিকল্পনা করছেন বলেও জানা গেছে।
ভারতের লোকসভায় এই ইস্যু আগামী সপ্তাহে তোলা হতে পারে বলে সূত্র জানায়। পশ্চিমবঙ্গের তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদরা সংসদে এ বিষয়ে আলোচনার দাবি জানাবেন বলেও জানা গেছে।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সিরাজগঞ্জের কাছারিবাড়ি আক্রমণের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে। স্থানীয় প্রশাসন ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করেছে এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাটি পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, “এই ঘটনা আমাদের জাতীয় লজ্জা। অপরাধীদের খুঁজে বের করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
মমতার চিঠি শুধু প্রতিবাদের ভাষা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার সীমান্ত ছাড়িয়ে একটি বড় কূটনৈতিক বার্তাও-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় আন্তর্জাতিক সংহতির প্রয়োজনীয়তা। ভারত ও বাংলাদেশের অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, রবীন্দ্রনাথের মতো সর্বজনস্বীকৃত মানবতাবাদী কবির স্মৃতিরক্ষায় এখন কেবল নিন্দা নয়, প্রয়োজন দৃঢ় রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতির প্রতি এই হামলা যেন আরেকবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়-একটি জাতির সভ্যতা, তার সাহিত্য-সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে রক্ষা করা শুধু ঐতিহ্যের দায় নয়, বরং ভবিষ্যতের অধিকার।

 


এ জাতীয় আরো খবর