শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

অবস্থান, আওয়াজ আর অনড় সংকল্প: জগন্নাথ শিক্ষার্থীদের সড়কদখল দ্বিতীয় দিনে

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-১৫ ১২:৪২:৪৬
ছবি সংগৃহিত

দাবি পূরণের আশ্বাস নয়, বাস্তব পদক্ষেপ চান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তিন দফা দাবিতে টানা দ্বিতীয় দিনের মতো কাকরাইল মোড় দখলে রেখে সড়কে দিন-রাত কাটাচ্ছেন তারা। দাবির পক্ষে শিক্ষকদেরও দেখা গেছে এই অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিতে।
বৃহস্পতিবার (১৫ মে) সকাল সাড়ে ১০টায় কাকরাইল মসজিদের সামনের সড়কে গিয়ে দেখা যায়, এখনও জমে থাকা বিক্ষোভে অটল শিক্ষার্থীরা। রাতের বৃষ্টি উপেক্ষা করেও তারা রাস্তাতেই অবস্থান করছেন। সঙ্গে রয়েছেন শিক্ষক ও ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
এই অবস্থানকে ঘিরে পুরো কাকরাইল মোড় কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। বন্ধ রয়েছে যান চলাচল, তৈরি হয়েছে তীব্র যানজট। পুলিশ রয়েছে কড়া সতর্ক অবস্থানে।
শিক্ষার্থীদের তিন দফা দাবির মধ্যে প্রধান হলো-
১. আবাসন সমস্যা সমাধানে ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থীর জন্য আবাসন বৃত্তি চালুর দাবি,
২. পূর্ণাঙ্গ বাজেটের কোনো কাটছাঁট ছাড়া অনুমোদন,
৩. দ্বিতীয় ক্যাম্পাস প্রকল্পের একনেক সভায় অনুমোদন ও বাস্তবায়ন।
শিক্ষার্থীদের ভাষ্যে, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজার হাজার শিক্ষার্থী বর্তমানে বস্তিতে, মেসে কিংবা রুম শেয়ারে বসবাস করছে। অথচ এই বাস্তবতা বাজেটে প্রতিফলিত হচ্ছে না। এমনকি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের কাজও বারবার পিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে।”

বুধবার (১৪ মে) ‘লং মার্চ টু যমুনা’ কর্মসূচির সময় গুলিস্তান পেরিয়ে কাকরাইলে পৌঁছালে পুলিশ লাঠিচার্জ, টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এতে আহত হন অনেক শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। এর পর থেকেই কাকরাইলে স্থায়ী অবস্থান নেন তারা।
রাত ১০টার দিকে ঘটনাস্থলে আসেন প্রধান তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলম। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলার সময় বিক্ষোভকারীদের একাংশ “ভুয়া ভুয়া” স্লোগান দেয় এবং একজন উপদেষ্টার দিকে পানির বোতল ছুড়ে মারেন। এরপর উপদেষ্টা এলাকা ত্যাগ করেন।
রাত ১২টার দিকে ঘটনার ব্যাখ্যায় সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্যসচিব সামসুল আরেফিন।
তিনি বলেন, “উপদেষ্টা মহোদয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ব্যক্তি নয়, বরং সরকারের প্রতিশ্রুতিহীনতার বিরুদ্ধে। বোতল নিক্ষেপ অনাকাঙ্ক্ষিত, কিন্তু আমাদের দাবি উপেক্ষা না করলে এমন কিছু হতো না।”
তিনি আরও বলেন, “উপদেষ্টা ব্যক্তি আক্রমণে ক্ষুব্ধ হয়ে চলে গেছেন-এই মানসিকতা দেখিয়ে তিনি প্রমাণ করেছেন, ব্যক্তিগত সম্মান যেন রাষ্ট্রের চেয়েও বড়। আমরা তার এই মানসিকতা প্রত্যাখ্যান করি।”
এই আন্দোলনের বিশেষ দিক হচ্ছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের যৌথ অংশগ্রহণ। সাধারণত ক্যাম্পাসভিত্তিক আন্দোলনগুলো শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক হয়ে থাকলেও, এখানে অনেক শিক্ষকও অবস্থান কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। তারা মনে করেন, “ছাত্রদের দাবির যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন নেই। সরকার দৃষ্টি না দিলে জবি শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।”
আন্দোলনের দ্বিতীয় দিন পার হলেও এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বা সরকার। ফলে শিক্ষার্থীদের ভাষায়, “আমরা এখানেই থাকবো-যতদিন না পর্যন্ত তিন দফা দাবি বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি না পাই।”
জগন্নাথ শিক্ষার্থীদের এ প্রতিবাদ এখন আর শুধুই ‘ক্যাম্পাসকেন্দ্রিক’ নয়-এটি ছড়িয়ে পড়ছে সামাজিক মাধ্যমে, সংহতি জানাচ্ছে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ছাত্র সংগঠনগুলো।
রাষ্ট্র যদি শিক্ষার্থীদের বসবাস, শিক্ষা ও উন্নয়নের ন্যূনতম কাঠামো নিশ্চিত না করতে পারে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই-এই উন্নয়ন কার জন্য? জবির ছাত্রছাত্রীদের আন্দোলন হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক নীতিনির্ধারকদের অস্বস্তিতে ফেলেছে, কিন্তু তাদের দাবি অস্বীকার করার মতো নয়। এখন দেখার বিষয়, সরকার এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাদের দিকে কেবল নিরাপত্তার চোখে তাকাবে, নাকি দাবি বাস্তবায়নের পথেও এগোবে?

 


এ জাতীয় আরো খবর