বুধবার, সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬

জ্বলন্ত বন আর নিঃশব্দ হাহাকার: ইসরাইলে দাবানলের ধ্বংসলীলা এক দশকের ভয়াবহতম সংকেত

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ২০২৫-০৫-০৩ ০১:৩০:১৬
ছবি সংগৃহিত

ইসরাইলের জেরুজালেমে শুরু হওয়া দাবানল যেন শুধু কয়েক হাজার একর বনভূমি পুড়িয়ে দেয়নি, ছারখার করে দিয়েছে একটি দেশের প্রাকৃতিক ভারসাম্য, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং জলবায়ু সচেতনতা নিয়ে আত্মতৃপ্তিকে।
এই দাবানলকে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ’ - কিন্তু এটি শুধুই একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, এটি একটি সতর্কবার্তা, যা গর্জন করে বলছে: আমরা প্রস্তুত নই।

দাবানলের সূচনা: যেখানে আকাশ ধোঁয়ায় ঢেকে যায়
২ মে, বুধবার। জেরুজালেমের উপকণ্ঠে অবস্থিত এশতাওল বনে হঠাৎ করেই ছড়িয়ে পড়ে আগুন। কেউ জানে না কীভাবে শুরু হলো। হয়তো একটি জ্বলন্ত সিগারেট, হয়তো বিদ্যুতের স্ফুলিঙ্গ-তবে নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কিছুই।
গরম, শুষ্ক বাতাস ও অনাবৃষ্টির করুণ বাস্তবতায় আগুনের ক্ষুধা লাগামছাড়া হয়ে যায়। মুহূর্তেই পুড়ে ছাই হয়ে যায় ৫ হাজার একর বনভূমি-যার মানে ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকা। জেরুজালেমের আকাশ তখন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, আর বনভূমির প্রাণীসমাজ তখন প্রাণভয়ে ছুটে বেড়ায়, কেউ আর ফেরে না।

'অলৌকিক' নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু প্রাকৃতিক ক্ষতি অনুপম
ইসরায়েলের ফায়ার অ্যান্ড রেসকিউ বিভাগের মুখপাত্র তাল ভোলভোভিচ বলেছেন, “এই আগুনকে অলৌকিকভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা গেছে।”
কিন্তু কোনো অলৌকিকতা আগুনের ক্ষতি ফিরিয়ে দিতে পারে না। গাছ নেই, ছায়া নেই, নেই প্রাণ।
বসতবাড়ি রক্ষা পেলেও বন্যপ্রাণীর আবাস, বিরল গুল্ম, পাখির বাসা, কৃষিজমি-সব পুড়ে ছাই। আর পরিবেশ? তার ক্ষতি অদৃশ্য, কিন্তু স্থায়ী।

জলবায়ুর প্রতিশোধ? নাকি আমাদের অবহেলার ফল?
বন ব্যবস্থাপনা সংস্থা এবং পরিবেশ বিজ্ঞানীরা এই দাবানলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে নয়, বরং জলবায়ু সংকটের চরম প্রকাশ হিসেবে দেখছেন।
গত শীত মৌসুমে বৃষ্টিপাত ছিল নজিরবিহীনভাবে কম। গ্রীষ্মকাল অতিরিক্ত দীর্ঘ এবং উত্তপ্ত। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শুষ্ক বাতাস এবং মানবসৃষ্ট আবর্জনার জটিলতা।
জুয়িশ ন্যাশনাল ফান্ডের কর্মকর্তা আনাত গোল্ড স্পষ্ট করে বলেছেন, “জলবায়ু পরিবর্তন আমাদের বনাঞ্চলকে আগুনের খাদ্যে পরিণত করেছে।” তার ভাষায়, “আমরা আর প্রাকৃতিক ছায়ায় আছি না। আমরা এখন নিজের দোষে নিজেই ঝুঁকিতে।”

আটকে দেওয়া হয়েছে আগুন, কিন্তু কি আটকানো গেছে সংকেত?
এই দাবানল হয়তো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ঠেকানো গেছে ১২০টি ইউনিট ও কয়েকটি বিমান ব্যবহারের মাধ্যমে।
সেনাবাহিনী, উদ্ধার ইউনিট এবং স্থানীয় প্রশাসন রাত-দিন কাজ করেছে পরিস্থিতি সামাল দিতে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, “এই আগুন কেবল একটি দাবানল নয়-এটা ভবিষ্যতের চিত্র, যেখানে এমন আগুন আরও ঘন ঘন, আরও ভয়াবহ হয়ে দেখা দেবে।”

এক দশকের মধ্যে দ্বিতীয় বিপর্যয়: ইতিহাস কি পুনরাবৃত্ত হচ্ছে?
২০১০ সালে মাউন্ট কারমেল এলাকায় চার দিন ধরে চলা দাবানলে প্রাণ হারিয়েছিল ৪৪ জন, ১২ হাজার একর বন উধাও হয়ে গিয়েছিল মানচিত্র থেকে।
এবার তেমন প্রাণহানি না হলেও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মাত্রা তার চেয়ে কম নয়। ভবিষ্যতের জন্য এই দাবানল একটি বার্তা—যা উপেক্ষা করা মানেই আরও বড় ক্ষতির দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে যাওয়া।

বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা: এখনই সময় প্রস্তুতির
পরিবেশ গবেষক ড. লিয়র বেন আভি বলেন, “জলবায়ু পরিবর্তনের জেরে ইসরাইলের বনাঞ্চলগুলো এখন আগুনের খেলায় পরিণত হয়েছে।
ছোট কোনো স্ফুলিঙ্গ থেকে মুহূর্তেই দাবানল তৈরি হচ্ছে। আমাদের অবকাঠামো, বন ব্যবস্থাপনা এবং সতর্কতা-সবকিছু এখন পুনর্মূল্যায়নের সময় এসেছে।”

শেষকথা: ছাই শুধু গাছ পুড়িয়ে দেয় না, পুড়িয়ে দেয় আত্মতৃপ্তি
ইসরাইলের এই দাবানল এক দেশ বা এক সময়ের বিপর্যয় নয়। এটি গোটা বিশ্ববাসীর জন্য জলবায়ু সংকটের জ্বলন্ত বার্তা।
পৃথিবী আমাদের আর সময় দিচ্ছে না-আমাদের প্রস্তুতি চাই, আগাম পদক্ষেপ চাই, নইলে আগুন শুধু বন নয়, সভ্যতাও একদিন গ্রাস করবে।


এ জাতীয় আরো খবর