চরিত্র --- ১) কলমিলতা ( কাজের লোক )
২) শাশুড়ি ( শান্তি ) বাঙাল ভাষার টান
৩) বউমা ( দিয়া )
শাশুড়ি ----- গুনগুনিয়ে রবীন্দ্রসংগীতের লাইন গেয়ে চলেছে আপন মনে,
"যখন বেলা -শেষের ছায়ায় পাখিরা যায় আপন কুলায় মাঝে,
সন্ধ্যাপুজার ঘন্টা যখন বাজে..... "
বউমা ----- উফ কী কু'ক্ষণে যে আপনার নাম "শান্তি" রাখা হয়েছিল? সাতসকালে সন্ধ্যাপুজার ঘন্টা বাজিয়ে চলেছেন!
কেন বাবা সকাল সকাল ঠাকুরের নাম করতে পারেন না ? ওই যে মাকালীর ওই... ওই গানটা করুন না ! মনে হয় তো জীবনের ইচ্ছা কিছুই পূরণ হয় নি ?
শাশুড়ি ----- করো বউমা তুমিও আমার সাথে করো।
" সকলি তোমারি ইচ্ছা - ইচ্ছাময়ী তারা তুমি, তোমার কর্ম তুমি করো মা লোকে বলে করি আমি " ( কষ্ট করে গলা মেলালো বউমা )
কলমিলতা ----- আরে ব্যাস !!! সকাল থেকে জি বাংলার সারেগামাপা !!! ( দ্রুত )
ধ্যাততেরিকি, যত ভাবি কথা কম বলবো...
শাশুড়ি ------ তুই চুপ কর দেখিনি! টিকটিকির মতো টিকটিকি করেই চলিস!
বউমা ও বউমা ( গলা উঁচিয়ে ) খোকা ঘুমাচ্ছে, তুমি সাতসকালে সন্ধ্যাপুজার ঘন্টা শুনে উঠে গেলে বুঝি ?
বউমা ----- একটু কাজ আছে, তাড়াতাড়ি বেরোতে হবে আজ।
শাশুড়ি ----- আজ কী বার বউমা? কতো সাধ করে ঘরে তুললাম, সুখে ঘরসংসার করবে।
কলমিলতা ----- একি ! ভুলে গেলে গিন্নী মা ? বউমনি তো নিজেই দাদার হাত ধরে ঘরে উঠেছে ? এই দেখো ঠাকুর ঘর থেকে বাংলা-ইংরেজি ক্যালেন্ডার নিয়ে এলাম, রবিবার দেখাচ্ছে গো আজ।
শাশুড়ি ------ সে তো আমিও জানি, কিন্তু বউমা... কী বলি বলো তো তোমাকে ?
বউমা ------ আ-রে বা-বা, রোববার কোনো কাজ থাকতে পারে না বুঝি ?
শাশুড়ি ----- সারা সপ্তাহ অফিসের পর ছুটি থাকবে না? খোকা আমার, ঘরে আজ...
কলমিলতা ----- রোববারেই তো দাদাবাবুর সাথে একটু এদিক-সেদিক ---- একটু- আধটু ঠাট্টা-তামাশা করার দিন ( হিহিহিহি হাসি ) কি গো বৌদি মনি ????
শাশুড়ি ----- লতা, যা দেখি, খাসা করে চা কর সকলের জন্য ! বড্ড কথা হয়েছে তোর ( বিরক্তি কন্ঠ)।
কলমিলতা ----- গিন্নী মা, নাম ঠিক করে বলো কিন্তু ! তোমাদের কলমি পাতেও খায় আবার গাছেও বায়, লতা বলে নরম ভেবো না আমাকে !
শাশুড়ি ---- সাতসকালে মাথা খারাপ করিস না, যা দেখি নি চা নিয়ে আয় কড়া করে।
বউমা ----- বসে বসে চা খাওয়ার সময় নেই, আমি একদম ব্রেকফাস্ট করে নেবো, এত্তো ভনিতা আমার পোষায় না বাবা !
শাশুড়ি ------ বলছিলাম কী বউমা... সারা সপ্তাহ তো অফিস... আবার বেশ রাত করেও বাড়ি ফেরো.... তাছাড়া বউমা... তোমার অমন পোশাক- আশাক নিয়ে... আসলে... কী বলি... বউমা... মানে....
বউমা ----- ঝেড়ে কাশুন (২) তো দয়া করে ? আসল কারণ কোনটা ? রাত করে ফেরা - আপনার ছেলে, নাকি পোশাক আশাক?????
শাশুড়ি ----- থামো বউমা, থামো, থামো... বহ্নি নাম বদলে আমি দিয়া নাম রাখলাম, যাতে তুমি আমার সংসারের প্রদীপ হয়ে জ্বলজ্বল করো।
কলমিলতা ----- এ-এ-তো দিনে বুঝলাম বহ্নি বৌদিমনি রাতারাতি কেন দি...য়া হয়ে উঠলো ? কেন বাবা আমার নামটা পাল্টাতে পারো না ? জলাপুকুরে আমার জন্ম, সে-ই কবে থেকে এক-ই নাম ? রাতের বেলায় জ্বর আসে জলে থেকে থেকে।
শাশুড়ি ----- চুপ কর দেখি লতা? আর ক..থা বাড়াস নি!
দেখো বউমা ( গলা নামিয়ে ) নতুন জায়গা, লোকজনের উঁকিঝুঁকি বুঝতে পারি, মুখে বলে না,কতো প্রশ্ন ওদের মনে মনে...
বউমা ------ আপনিও তো হাতা কাটা ব্লাউজ পরে আছেন মা ?
শাশুড়ি ------ আমার বয়স আর তোমার বয়স বউমা?
বউমা ----- আপনি তো কতোদিন গায়ে জামা না দিয়ে বার্থরুম থেকে....
শাশুড়ি ----- আমি বোধহয় তোমাকে বোঝাতে পারছি না বউমা? আসলে বউমা,খোকা এতো বড় অফিসার... একটা প্রেস্টিজ তো আছে ?
বউমা ------ হ্যাঁ হ্যাঁ এইজন্যই তো অতোবড় অফিসার প্রতিদিন সুধাকর হয়ে লিফটে না উঠে সিঁড়ি দিয়ে টলতে টলতে আসে????
শাশুড়ি ----- চুপ করো বউমা, আস্তে বলো ( গলা নামিয়ে ), আমিই খোকাকে না করেছি, লিফটে আটকে গেলে তো বিপদ !!!!
বউমা ----- এই আপনাদের জন্য মা, ঠিক আপনাদের জন্য ( গলা উঁচিয়ে ) মেয়েরা অল্প পোশাকে বেশ্যা আর ছেলেদের অল্প পোশাকে সাধু সাধু !!!
শাশুড়ি ----- অমন বড় পোস্টে কাজ করলে একটু - আধটু....
বউমা----- আমিও কম বড় পোস্টে কাজ করি না মা ? তবে কথা দিলাম আমিও সিঁড়ি দিয়ে আসবো ও-ই টলতে টলতে...
শাশুড়ি ----- মুখের লাগাম দাও বউমা, এমন কাজটি ভুলেও করো না,
বউমা ----- মা আপনার জন্যও নিয়ে আসবো, ঘরে বসেই ঢুক ঢুক ! খাবেন মা, নিয়ে আসবো? ছেলে সুধাকর আর মা সুধাময়ী..... এবার জমবে মজা !!!
শাশুড়ি ------ ও - হ ! তোমার বাবা সারাজীবনে যা পারলেন না !!!
বউমা ------ বাবাও কী সুধাকর ছিলেন মা ? বাবা খেতেন মা ?
শাশুড়ি ----- ওই প্রতি মাসে মাইনের দিন একটু - আধটু... খোকা কে বলো না কিন্তু!
বউমা ----- আমিও এক-আধদিন খেলে খোকাকে বলবেন না কিন্তু !
কলমিলতা ------ আমি একটা কথা বলতে পারি ? যত ভাবি চুপ থাকবো ! তোমাদের বাজার করে ফেরার সময় হাতে টাকা ছিলনা, তাই কাঁচা লঙ্কা কেনার সময় সব টাকা দিয়ে চলে এসেছি, ক'টা খুচরো রেখে আর কী হবে ?
বলে দিলুম বাজারের পুরো হিসেব কিছু দিতে পারবো না গিন্নী মা।
শাশুড়ি ------ চাই না হিসেব, তুই মুখ বন্ধ রাখ দেখিনি।
কলমিলতা ----- ধ্যাততেরিকি ( জোরে সাথে ) ! আমাকে শুধু চুপ করিয়ে রাখে ! কলমিরও কথা থাকতে পারে গো ( গলা উঁচিয়ে )
দেখো, আজ বিশ্ব কাজের লোক দিবস, আজ আমার কথায় কোনো ট্যাক্স বসবে না। এদিকে সকাল সকাল জ্যামে আটকে ছিলাম..... সেটা কী বলেছি?
শাশুড়ি ----- বউমা ও বউমা কাছে এসো মা, এবার একটু সংসারে মন দাও মা ।
কলমিলতা ----- ওই যে তোমরা কী সব কারণ সুধার কথা বলছিলে না ? আমার স্বামী তো বলে ভগবানের চরণামৃত, দাঁড়াও দাঁড়াও বলছি... ধ্যাততেরিকি, ঠিক সময় কিছু মনে আসে না বাবা !!! পড়েছে পড়েছে মনে... অমৃত গো অমৃত !
শাশুড়ি ----- রাখ তো তোর কারণ - অকারণ সুধা।
বউমা ----- আপনি না হয় মা এবার থেকে অকারণে সুধা পান করুন, আমি সাপ্লাই দেবো, না না কাকপক্ষী জানতে পারবে না !
শাশুড়ি ------ বউমা এবার একটু হামাগুড়ি দেখতে চাই মা, ঘরগৃ্হস্থ সুখের হবে !
বউমা ------ হামাগুড়ি? বেশ তো মা, ভালো ব্যায়াম হবে, হামাগুড়ি, দাপাদাপি সব করুন। ঘরগৃহস্থালী চঞ্চল হবে,সুখের হবে মা।
শাশুড়ি ----- চার বছর পার হয়ে গেল, খিলখিল হাসি দেখলাম না
বউমা ----- কলমি ও কলমি তোর গিন্নী মা-কে খিলখিল হেসে দেখিয়ে দে তো।
কলমিলতা ----- ধ্যাততেরিকি !!!! সেই ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলো !
বউমা ----- আচ্ছা মা আপনার তো পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনে ওই একটাই খোকা, আমারও তাই হবে ...!
শাশুড়ি -----আমি বৃদ্ধাশ্রম চলে যাবো।
কলমিলতা ----- আমি বাবা বৃদ্ধাশ্রম গিয়ে তোমায় দেখাশোনা করতে পারবো না ! ধ্যাততেরিকি যতসব ঝামেলা। কলমি তুই মর রে মর, মর মর মর... আমি কিন্তু ম্যাসিন না ? এবার থেকে জিরিয়ে জিরিয়ে কাজ করবো।
বউমা ------ নিজের ছেলের দোষ দেখতে শিখুন মা। ছেলে বাড়ির কাজ করবে না, সব ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখবে, ছেলে বড় চাকরি করে,
খোকা আমার চিরকাল ছন্নছাড়া, তারবেলা মানিয়ে নিতে হবে আমাকে।
শাশুড়ি ------ আমিও তো ছেলে দোষ দেখি বউমা !
বউমা ----- হ্যাঁ, হ্যাঁ দেখেন মা দেখেন, যদি দেখেন খোকা আমার সাথে ফিসফিস করে কথা বলছে, আদর আহ্লাদ করছে চুপিচুপি...
"খোকা বউয়ের সাথে এতো আদিখ্যেতা করিস না, তুই না পুরুষ" !!!!
শাশুড়ি ----- কথাটা কী মিথ্যে বউমা? আমাদের সময় সে-ই রাতে গিয়ে দুটো কথা বলতে পারতাম।
বউমা ------ আপনাদের কথা ছাড়ুন তো? একগাদা দেওর - ভাসুর কতো ফস্টিনস্টি হতো আপনাদের সময়ে। একটা দেওর-ও নেই যে একটু মিষ্টি মিষ্টি কথা বলবে। একটা মাত্র শ্বশুর ছিল --- তাও অকালে চলে গেলেন।
শাশুড়ি ----- শ্বশুর একটা মাত্র ই হয় বউমা।
বউমা ------ আপনি কিন্তু লাইফটাকে ব্যাপক enjoy করেছেন মা, my dear শ্বশুর 65 years এ ও কী রোমান্টিক.... উফ কী...
শাশুড়ি ----- তাঁকে তো ছাড়ো বউমা, অকালে চলে গেলেন...
বউমা ----- বারে, আমি তো প্রশংসা করছি, আসলে আপনি খুব জেলাস, শ্বশুর মশাইয়ের সুখ্যাতি নিতে পারেন না ।
শাশুড়ি ----- সুখ্যাতি ? বুড়ো বয়সে ভীমরতি ! আমি চা দিলে বউরানী কোথায়? আমি খেতে দিলে বউরানীর খোঁজ, এমনকি স্নানের সময় গরম জলটা বউরানীকেই দিতে হবে ? কেন বাবা আমাকে কী চোখে দেখা যায় না ?
কলমিলতা ----- কলমি মুখ বন্ধ রাখতে পারে না, ধ্যাততেরিকি !!!!
বাবু কতো জিনিস আনতো লুকিয়ে লুকিয়ে চপ, ব্লাউজ,শাড়ি আমি সব দেখতাম গো গিন্নীমা, বড় ভালোবাসতো তোমাকে গিন্নী মা।
শাশুড়ি ---- নরম মনের মানুষ ছিল যে !
বউমা ------ নিজের বউ বুড়ি হলে ওরকম একটু-আধটু হয় --- এ-এ-তে দোষ নেই!
মা আপনি কোনোদিন প্রেম করেছেন?
শাশুড়ি ---- ইস ! কাকে কী বলতে হয় জানো না বউমা?
বউমা ----- না, আসলে আপনাদের তো অল্প বয়সে বিয়ে হয়েছে, এত্তো বড় লম্বা জীবন.... একটু এদিক-সেদিক, ঠাট্টা-তামাশা, ইন্টু-মিন্টু.....
শাশুড়ি ----- না না সে রকম কিছু না, তবে তোমার শ্বশুরের এক বন্ধু মনে হতো দুর্বল ছিল
বউমা ---- কী করে বুঝলেন মা ?
শাশুড়ি ----- সে-রকম কিছু না।
বউমা ---- বুঝেছি বুঝেছি ফাঁকা পেয়ে হাত ধরেছিল?
শাশুড়ি ---- না... পা....
বউমা ----- শেষ পর্যন্ত পা???? দূর কী ভাবলাম... আর কী হলো?
শাশুড়ি ----- পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করেছিলেন
কলমিলতা ---- ধ্যাততেরিকি ধ্যাৎ ( বেশ কায়দা করে ) যা কলমি যা, গিয়ে কাজ গুছিয়ে নে, এসব কথায় তো আর পেট ভরবে না ?
শাশুড়ি ---- আর আমি তো দৌড়ে পালাতে গিয়ে কাপড়ে আটকে ওনার ঘাড়ের ওপর পড়ে যাই ( হাসি ) উফ কী লজ্জা কী লজ্জা !
বউমা ----- ইস কী শিহরণ !!!
শাশুড়ি ---- বউমা? এর ভিতরে শিরহণের কী দেখলে মা ?
বউমা---- হয় মা হয়, এই দেখুন না কাল রাতে লিফটে লোডশেডিং হয়ে গেল, Mr. Romeo আর আমি, পুরুষ মানুষ ভয় পেয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলেন, তবে এক মিনিট। লাইট এসে গেল যে !
শাশুড়ি ----- এক মিনিট মানে ষাট সেকেন্ড ! রমিও কে বউমা?
বলেছো খোকা কে ?
বউমা ----- শেক্সপিয়রের নাটকের রোমান্টিক হিরো। আপনি না কী? বলা যায় এ কথা? আপনি বলেছিলেন কর্তার বন্ধুর ঘাড়ে পড়ার কথা?
শাশুড়ি ------ কোথায় থামতে হয় তোমরা জানো না বউমা?
বউমা ---- কোথায় শুরু করতে হয় আপনারা জানতেন না মা। মেয়েবেলা থেকে নিজেদের ইচ্ছে- অনিচ্ছের দাম দেন নি, বাপের বাড়িতে বাবা-কাকা, আর বিয়ের পর পুরুষ দেবতার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হতো আপনাদের ভালো লাগা মন্দলাগা।
আর এদিকে হাজার টাকার ঝাড়বাতিতে তাদের রাত কাটতো,বুঝেও না বোঝার ভান করতেন !
কলমিলতা ----- না বলেও যে পারি না ? চওড়া লালপেড়ে শাড়ি আর কপালে সিঁদুর ল্যাপা ঘরের মেয়ে মানুষ আমরা --- ধ্যাততেরিকি... ধিক্কার এই জীবনের !
বউমা ----- চললাম মা, আপনার খোকাকে বলে দেবেন over time আছে, ফিরতে লেট হবে।
শাশুড়ি ------ বেশ তো ছিলাম আমি বউমা, আমার মাথাটা চিবিয়ে না খেলেই কী হতো না???
বউমা----- এম টিভি দেখুন, ফ্যাসান প্যারেড দেখুন... ভুলে যান মা, বয়সটা। প্রতিটি মুহূর্তে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখুন, enjoy মা enjoy. দেখি যাওয়ার আগে ফাইনালি আপনাকে একটা হামি খেয়ে যাই।
শাশুড়ি ----- ছাড়ো বউমা ছাড়ো একটা পাগলি কোথাকার।
সত্যি কতো কি যে শেখার আছে মেয়েটার থেকে ( মনে মনে বলতে থাকে শান্তি দেবী।
গলা উঁচিয়ে বলে ---- না বউমা তুমি বহ্নি, দিয়া না....
কলমিলতা তুই আমাদের স্বর্ণ রে স্বর্ণলতা, লতার মতো জড়িয়ে রেখেছিস আমাদের সংসার কে।
বাইরে গাড়ির হর্ন মিলিয়ে যায় দূরে.............