বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

দেশে লবণের উৎপাদন,দেড় লাখ টন অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতিতে বিপাকে প্রান্তিক চাষিরা

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৯-২৪ ১৬:০৯:৩৭

মহেশখালী(কক্সবাজার)
দেশের উপকূলীয় অঞ্চলের মাঠে মাঠে লবণ উৎপাদন, গুদামে মজুদ এবং নতুন মৌসুম শুরুর প্রস্তুতির মধ্যেই বিদেশ  থেকে   দেড়   লাখ   টন  অপরিশোধিত  লবণ আমদানির  অনুমতি   দিয়েছে   সরকার। এতে দেশের 
প্রান্তিক  লবণচাষিদের  মধ্যে  দেখা  দিয়েছে  উদ্বেগ ও ক্ষোভ। চাষিদের আশঙ্কা বিদেশি  লবণ বাজারে প্রবেশ করলে  স্থানীয়ভাবে  উৎপাদিত  লবণের  দাম   আরও কমে যেতে পারে,ফলে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খাবেন তারা।
সাম্প্রতিক প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী,বাণিজ্য মন্ত্রণালয় মোট  ১ লাখ  ৫০  হাজার   টন   অপরিশোধিত লবণ আমদানির অনুমতি  দিয়েছে। এর মধ্যে ২৪৪টি লবণ মিলকে  ৫৪৩ টন  করে  মোট ১ লাখ ৩২ হাজার ৫০০ টন এবং সাতটি ভ্যাকুয়াম মিলকে ২ হাজার ৫০০ টন করে  মোট  ১৭ হাজার  ৫০০ টন  আমদানির  সুযোগ দেওয়া হয়েছে। দেশে বর্তমানে আটটি এলাকায় মোট ২৫১টি লবণ মিল রয়েছে।
প্রান্তিক  লবণ  চাষির  প্রশ্ন দেশীয় লবণ থাকা সত্ত্বেও আমদানি   কেন? লবণচাষিদের  মূল প্রশ্ন,যখন নতুন মৌসুম  সামনে এবং দেশীয় উৎপাদিত লবণ বাজারে রয়েছে,  তখন কেন  অপরিশোধিত  লবণ আমদানির প্রয়োজন হলো?  প্রকাশিত  প্রতিবেদনে  বলা  হয়েছে, লবণ আমদানির সুপারিশ করেছিল বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির  শিল্প  করপোরেশন (বিসিক)। সম্ভাব্য  সরবরাহ ঘাটতির আশঙ্কাকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।  তবে  চাষিদের  দাবি, বাজারে  বর্তমানে লবণের সংকট নেই।  বরং কয়েক মাসের লোকসানের পর তারাযখন সামান্য ভালো দাম পেতে শুরু করেছেন, ঠিক তখনই আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে লবণ  প্রতি মণ  প্রায় ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে  এবং  চাষিরা  কিছুটা  লাভের মুখ দেখতে শুরু  করেছেন।  তাদের  আশঙ্কা, আমদানি করা লবণ বাজারে এলে স্থানীয় লবণের দাম আবারও কমে যেতে পারে।  উৎপাদনের  সঙ্গে  জড়িত  ৪০  হাজারের বেশি চাষি,  সরকারি  তথ্য   অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কক্সবাজারের ৩২  হাজার ৪১০ জন এবং চট্টগ্রামের ৭ হাজার   ৭৪০  জনসহ   মোট  ৪০   হাজার   ১৫০ জন লবণচাষি   ৬৭ হাজার  ৭৫৭  একর জমিতে লবণ চাষ করেছেন।  ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৪৫ হাজার  মেট্রিক  টন  লবণ। অর্থাৎ  লবণ উৎপাদন শুধু একটি  কৃষিপণ্য  উৎপাদনের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে   রয়েছে   উপকূলীয়   অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক কৃষক,    শ্রমিক,  জমির    মালিক,   পরিবহন   শ্রমিক, মিলশ্রমিক ও ব্যবসায়ীর জীবিকা।
বিশেষ করে কক্সবাজারের মহেশখালী,কুতুবদিয়া, পেকুয়া,  চকরিয়া  এবং  চট্টগ্রামের  বাঁশখালীসহ উপকূলীয় এলাকাগুলো দেশের লবণ উৎপাদনের অন্যতম প্রধান অঞ্চল।লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি এই যুক্তিই আমদানির পক্ষে এখানে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ আরেকটি বাস্তবতা। 
বিসিকের  তথ্য  অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ মৌসুমে  দেশের লবণের চাহিদা ছিল প্রায় ২৭ লাখ ১৫ হাজার মেট্রিক টন।   এর বিপরীতে   উৎপাদন  হয়েছে  ১৯  লাখ ৪৪ হাজার ৯২৬ মেট্রিক টন। অর্থাৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭ লাখ ৭০ হাজার টন কম ছিল।সরকারের পক্ষ থেকে  সরবরাহ  ঘাটতির  আশঙ্কাকে আমদানির সুপারিশের কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে।ফলে পুরো বিষয়টিকে   কেবল   ‘আমদানি  বনাম   দেশীয় লবণ’ হিসেবে   দেখলে   চিত্রটি   অসম্পূর্ণ   হবে। একদিকে রয়েছে  উৎপাদন ঘাটতির সরকারি হিসাব, অন্যদিকে রয়েছে   মৌসুম   শেষে   চাষিদের  হাতে  থাকা মজুদ, বাজারের  প্রকৃত  চাহিদা  এবং আমদানির সময় নিয়ে প্রশ্ন।
তাহলে মূল প্রশ্ন কোথায়?
মূল  প্রশ্নটি  হলো  দেশে  প্রকৃতপক্ষে কত লবণ মজুদ আছে, বাজারে  মাসিক   চাহিদা  কত, নতুন  মৌসুমে সম্ভাব্য  উৎপাদন  কত এবং আমদানি করা দেড় লাখ টন লবণ  কখন বাজারে   প্রবেশ   করবে? এসব তথ্য প্রকাশ্যে  এনে  আমদানির প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করা হলে বিতর্ক  অনেকটাই  পরিষ্কার  হতে   পারে। কারণ আমদানির   সময়টি   অত্যন্ত   গুরুত্বপূর্ণ। নতুন লবণ মৌসুম শুরুর ঠিক আগে বিদেশি লবণ বাজারে প্রবেশ করলে   দেশীয়   চাষিরা   তাদের   উৎপাদিত লবণের কাঙ্ক্ষিত  দাম  পাবেন  কি না  সেটিই  এখন বড় প্রশ্ন।
বাজারের  বড় অংশ মিলমালিকদের নিয়ন্ত্রণে, দেশের লবণ    শিল্পের    আরেকটি    গুরুত্বপূর্ণ   দিক  হলো
পরিশোধন  ও   বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা। তথ্যে দেখা গেছে,  ঢাকা,  নারায়ণগঞ্জ, চাঁদপুর,   চট্টগ্রাম, পটিয়া, কক্সবাজার, খুলনা ও ঝালকাঠিতে মোট ২৫১টি লবণ মিল   রয়েছে। এর  মধ্যে  সাতটি  আধুনিক ভ্যাকুয়াম মিল।   এসব   সাতটি  প্রতিষ্ঠান  মিলে ভোজ্য ও শিল্প লবণের বাজারের প্রায় ৭০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করে।ফলে লবণচাষির   মাঠের   উৎপাদন  থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত   মূল্য    নির্ধারণের    বিভিন্ন     স্তরে    চাষিদের দরকষাকষির  ক্ষমতা  তুলনামূলকভাবে সীমিত এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
আমদানির  অনুমতি  কার  স্বার্থে? প্রশ্ন চাষিদের লবণ চাষিদের   অভিযোগ,  তারা   উৎপাদন   খরচ,  জমির খাজনা/ভাড়া, শ্রমিকের   মজুরি, পলিথিন, বাঁধ নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণসহ নানা ব্যয় বহন করে লবণ উৎপাদন করেন।   উৎপাদনের   পর  বাজারদর কমে গেলে সেই ক্ষতির বড়  অংশ  তাদেরই বহন করতে হয়। অন্যদিকে আমদানিকারক   ও   মিলমালিকরা   তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক   অবস্থানে   থাকেন   এমন   অভিযোগও রয়েছে।   সরকারি   নীতিতেও   দেশীয়  লবণ  শিল্পের  আধুনি কায়নের   কথা,  একই   সময়ে  সরকার  লবণ শিল্প   আধুনিকায়নের    উদ্যোগও    নিয়েছে।  বিসিক কুতুবদিয়ায়   ১১৩.৫৬   একর   খাসজমিতে আধুনিক লবণ প্রক্রিয়াজাতকরণ,সংরক্ষণ, প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ  নিয়েছে।  বিসিকের উদ্যোগটি জাতীয় লবণ  নীতি ২০২২  এবং  আয়োডিনযুক্ত লবণ আইন   ২০২১-এর  সঙ্গে  সামঞ্জস্য রেখে নেওয়া হচ্ছে বলে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে।
একদিকে  আধুনিকায়নের  উদ্যোগ, অন্যদিকে দেশীয় উৎপাদনের সময় আমদানির অনুমতিদুটি নীতির মধ্যে সমন্বয়   কতটা   রয়েছে,   সেটিও   এখন    গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
আমদানির পথ পুরোপুরি বন্ধ,নাকি  প্রয়োজনভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ?  লবণ  আমদানি  বাংলাদেশে  সম্পূর্ণ অবাধ নয়।   বাংলাদেশ   কাস্টমসের   তথ্য  অনুযায়ী, লবণ আমদানির ক্ষেত্রে বিসিকের আমদানি লাইসেন্স এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের আমদানি অনুমতির মতো নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে।  তাই  প্রশ্নটি কেবল ‘আমদানি হবে কি হবে না’  এমন সরল প্রশ্ন নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত   দেশীয়   উৎপাদন  ও  মজুদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমদানির পরিমাণ ও সময় নির্ধারণ করা হচ্ছে কি না?  যদি সত্যিই   সরবরাহ   ঘাটতি থাকে,তাহলে ঘাটতির   পরিমাণের   সঙ্গে   সামঞ্জস্যপূর্ণ  আমদানি প্রয়োজন   হতে   পারে।  কিন্তু দেশীয় বাজারে পর্যাপ্ত মজুদ  থাকার   সময়  অতিরিক্ত  আমদানি হলে তার প্রভাব চাষির ওপর পড়বে কি না তা আগেই মূল্যায়ন করা জরুরি।
চাষিদের  ন্যায্যমূল্য  নিশ্চিত করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ
লবণ  শিল্প  রক্ষায়  শুধু আমদানি  বন্ধের দাবি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন  একটি  সমন্বিত বাজারব্যবস্থা। চাষির উৎপাদন খরচ  নির্ধারণ করে  তার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ন্যূনতম  ন্যায্যমূল্য   নিশ্চিত  করা, মৌসুমের শুরুতেই বাজার  পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ  করা, বড় মজুদদারদের তথ্য সংগ্রহ, আমদানি ও দেশীয় মজুদের তথ্য প্রকাশ এবং বাজারে অস্বাভাবিক মূল্যপতন হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।  একই  সঙ্গে  লবণ  সংরক্ষণের  জন্য আধুনিক গুদামব্যবস্থা গড়ে তোলা গেলে মৌসুমে কম দামে   লবণ   বিক্রি   করতে  চাষিদের  বাধ্য  হওয়ার প্রবণতা কমতে পারে।
তদন্ত ও স্বচ্ছতার দাবি,দেড় লাখ টন লবণ আমদানির অনুমতি   ঘিরে  যেসব  প্রশ্ন উঠেছে, তার উত্তর পেতে কয়েকটি তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করা জরুরি। 
১.বর্তমানে দেশে মোট লবণের মজুদ কত ২.২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রকৃত চাহিদা কত? ৩.সম্ভাব্য উৎপাদন কত ধরা হয়েছে?৪.ঘাটতির পরিমাণ কত? ৫.দেড় লাখ টন আমদানির   হিসাব   কীভাবে   নির্ধারণ   করা  হয়েছে ৬.কোন   কোন   প্রতিষ্ঠান   কত  পরিমাণ  আমদানির 
অনুমতি   পেয়েছে?   ৭.আমদানির   সময়সীমা  কত? ৮. আমদানিকৃত   লবণ  বাজারে এলে দেশীয় লবণের  
সম্ভাব্য   মূল্য  কী  হতে   পারে?  ৯.চাষিদের ন্যায্যমূল্য রক্ষায় সরকারের সুনির্দিষ্ট  পরিকল্পনা কী?
এই   প্রশ্নগুলোর   উত্তর   প্রকাশ করা হলে আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে তৈরি হওয়া সন্দেহ ও বিভ্রান্তি অনেকটাই দূর হতে পারে।  বাংলাদেশের   লবণ   শিল্পকে টেকসই করতে  হলে  একদিকে  যেমন  প্রয়োজন বাস্তব চাহিদা অনুযায়ী   সরবরাহ   নিশ্চিত  করা,  অন্যদিকে তেমনি প্রয়োজন   উৎপাদনকারী  চাষির  স্বার্থ  সুরক্ষা। কারণ একজন চাষি যদি উৎপাদন খরচের ন্যায্য মূল্য নাপান, তাহলে  আগামী  মৌসুমে তিনি লবণ উৎপাদনে আগ্রহ হারাতে   পারেন।  এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে দেশের  নিজস্ব  লবণ  উৎপাদন সক্ষমতার ওপর। তাই বিদেশ  থেকে   লবণ  আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়ে আবেগ নয়,   প্রয়োজন   স্বচ্ছ   তথ্য,  নিরপেক্ষ  মূল্যায়ন এবং চাষিবান্ধব বাজারনীতি।  দেশের   লবণচাষি, শ্রমিক ও সংশ্লিষ্ট   শিল্পকে   সুরক্ষা   দিয়ে   প্রয়োজনীয়   ক্ষেত্রে আমদানি   করা   এই  ভারসাম্যপূর্ণ  নীতিই  হতে পারে টেকসই   সমাধানের   পথ।  দেশীয়  লবণ শিল্প বাঁচলে বাঁচবে   উপকূলের   হাজারো   পরিবার।  আর  চাষির ন্যায্যমূল্য   নিশ্চিত   হলে শক্তিশালী হবে দেশের লবণ উৎপাদনের ভবিষ্যৎ।


এ জাতীয় আরো খবর