শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২৫, ২০২৬

রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা ভেঙে পদক্ষেপের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

  • আন্তর্জাতিক ডেস্ক
  • ২০২৬-০৯-২৩ ২২:৫৭:৫৮
ছবি: সংগৃহীত।

দীর্ঘস্থায়ী রোহিঙ্গা সংকটের সমাধানে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তা থেকে বেরিয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, অনির্দিষ্টকাল ধরে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গার মানবিক দায়িত্ব একা বাংলাদেশের পক্ষে বহন করা সম্ভব নয়। সংকটের মূল কারণ মিয়ানমারে এবং এর স্থায়ী সমাধানও সেখানেই নিহিত।
বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬) নিউইয়র্ক স্থানীয় সময় সকাল প্রায় ১১টা ২০ মিনিটে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আয়োজিত উচ্চপর্যায়ের এক পার্শ্ববৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। বাংলাদেশ ও গাম্বিয়া যৌথভাবে আয়োজিত ওই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে রোহিঙ্গারা বৈষম্য, নিপীড়ন ও বঞ্চনার শিকার হয়ে আসছে। ১৯৭৮ সালসহ পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে রোহিঙ্গাদের বড় আকারের আগমন ঘটেছে বাংলাদেশে। বিভিন্ন সময়ে তাদের প্রত্যাবাসনও হয়েছে। তবে ২০১৭ সালের সহিংসতার পর সংকট আরও গভীর হয়ে ওঠে।
বর্তমানে ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়ে আছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, মানবিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে তাদের আশ্রয় দিয়েছে। শরণার্থী শিবিরে খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। প্রায় ছয় হাজার শিক্ষাকেন্দ্রে রোহিঙ্গা শিশুদের মিয়ানমারের পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির কারণে কক্সবাজারের স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপরও সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাজনিত চাপ বাড়ছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। মানবপাচার, মাদকপাচার, অবৈধ অভিবাসন ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধের ঝুঁকিও এর সঙ্গে বাড়ছে বলে তিনি সতর্ক করেন।
মানবিক সহায়তার প্রয়োজন বাড়লেও অর্থায়নের পরিমাণ কমে আসার বিষয়টি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ২০২৫ সালের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনায় ৯৩৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল। ২০২৬ সালের জন্য সেই প্রয়োজন কমিয়ে প্রায় ৭১০ মিলিয়ন ডলারে নামিয়ে আনা হয়েছে। তাঁর মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকা সম্ভব নয়।
মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি হলেও তা রাজনৈতিক নিষ্ক্রিয়তার বিকল্প হতে পারে না বলে মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। একইভাবে, এই সংকটের বোঝা অনির্দিষ্টকাল বাংলাদেশ একাই বহন করবে—এমন প্রত্যাশাও করা যায় না।
রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে জোরপূর্বক নিয়োগ, নির্বিচারে আটক, চলাচলে বিধিনিষেধ, জোরপূর্বক শ্রমসহ বিভিন্ন গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের উপযোগী পরিস্থিতি এখনো তৈরি হয়নি। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী ও আরাকান আর্মি—উভয়ের বিরুদ্ধেই গুরুতর লঙ্ঘনের অভিযোগের তথ্য পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন সহমর্মিতা থেকে সংকটের মূল কারণ ও সমাধান খোঁজার পথে যাওয়ার সময় এসেছে। প্রতিশ্রুতি থেকে কার্যকর পদক্ষেপ এবং বাস্তুচ্যুতি ব্যবস্থাপনা থেকে এই বাস্তুচ্যুতির অবসানের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
সংকট সমাধানে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি উল্লেখ করে সংকট উত্তরণে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পাঁচ দফা প্রস্তাব তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
প্রথমত, রোহিঙ্গাদের দ্রুত, নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক অংশীজনদের একটি সুস্পষ্ট ও বিশ্বাসযোগ্য কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। মিয়ানমারের অভ্যন্তরে প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে আন্তর্জাতিক প্রভাব কাজে লাগানোর আহ্বান জানান তিনি।
দ্বিতীয়ত, রোহিঙ্গাসহ মিয়ানমারের বেসামরিক জনগণের ওপর সহিংসতা বন্ধ করতে হবে। নিজভূমিতে রোহিঙ্গাদের মৌলিক অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে তারা ফিরে যাওয়ার বিষয়ে আস্থা অর্জন করতে পারেন।
তৃতীয়ত, রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দাতা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জন্য পর্যাপ্ত ও পূর্বানুমেয় মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। দীর্ঘদিন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার কারণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর উন্নয়ন যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়ার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
চতুর্থত, টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক বিচারিক ও তদন্তব্যবস্থাগুলোর কার্যক্রমে অব্যাহত সহায়তা এবং গুরুতর অপরাধে জড়িতদের জবাবদিহির আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পঞ্চমত, মাদকভিত্তিক অর্থনীতি, মানবপাচার, ডিজিটাল প্রতারণা, অবৈধ অস্ত্র ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ চায় না রোহিঙ্গারা চিরকাল বাস্তুচ্যুত অবস্থায় থাকুক। তারা যেন নিরাপদে, স্বেচ্ছায় ও মর্যাদার সঙ্গে অধিকার সুরক্ষিত রেখে নিজভূমিতে ফিরতে পারে, সেই পরিবেশ তৈরিই হতে হবে আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বাংলাদেশ প্রত্যাবাসনে সহায়তা করতে প্রস্তুত।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ যেন নিপীড়ন, বিতাড়ন ও বাস্তুচ্যুতির ধারাবাহিকতায় আটকে না থাকে। ন্যায়বিচার, মর্যাদা ও আশার ভিত্তিতে তাদের প্রত্যাবাসনের পথ তৈরির জন্য এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

রোহিঙ্গা সংকট, প্রত্যাবাসন, তারেক রহমান


এ জাতীয় আরো খবর