শহরটা খুব ব্যস্ত-
মানুষ ছুটছে,
গাড়ি ছুটছে,
সময়েরও যেন দম ফেলার অবকাশ নেই।
শুধু একটা গাছ
রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে
চুপচাপ হিসাব রাখছে
আমাদের ফেলে যাওয়া দিনগুলোর।
কে তার ছায়ায় দাঁড়িয়েছিল,
কে পেরেক ঠুকেছিল শরীরে,
কে বলেছিল-
‘গাছটা কেটে ফেললে জায়গাটা একটু খোলামেলা হবে।’
গাছ কিছু বলেনি।
গাছেরা সাধারণত
অভিযোগ করতে শেখে না।
তারা শুধু
মানুষের নিঃশ্বাসের ঋণ
পাতায় পাতায় শোধ করে যায়।
আমরা উন্নয়নের কথা বলি,
নতুন রাস্তার কথা বলি,
বড় বড় ভবনের কথা বলি-
কিন্তু বাড়ির দরজার সামনে
এক মুঠো ময়লা পড়ে থাকলে
সেটা তোলার জন্য
আমাদের উন্নয়ন থেমে যায়।
একটি প্লাস্টিকের বোতল
নালার মুখ বন্ধ করে দেয়,
একটু জমে থাকা পানি
অদৃশ্য এক বিপদের ঘর হয়ে ওঠে।
তারপর আমরা
রোগের কাছে প্রশ্ন করি-
এলে কেন?
প্রকৃতি তখন
নীরবে আমাদের দিকে তাকায়।
সে তো আগেই বলেছিল।
কিন্তু আমরা শুনিনি।
আমরা ভাবি,
দেশ বদলাবে কোনো একদিন-
কেউ একজন এসে
সব রাস্তা পরিষ্কার করবে,
সব গাছ লাগাবে,
সব নদী বাঁচাবে,
সব দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেবে।
অথচ দেশটা
কোনো দূরের মানচিত্র নয়;
দেশ মানে
আমার ঘরের উঠান,
তোমার বারান্দা,
আমাদের স্কুলের মাঠ,
রাস্তার ধারে পড়ে থাকা
একটি কাগজও।
পরিবর্তন তাই
মিছিল থেকে নয়,
শুরু হতে পারে
একটি ডাস্টবিন থেকে।
একটি গাছের চারা থেকে।
জমে থাকা এক বালতি পানি
ফেলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে।
বন্ধুকে বলা-
‘এখানে ময়লা ফেলো না।’
শিশুর হাতে
একটি চারা তুলে দিয়ে বলা-
‘এটাকে বড় হতে দিও।’
জন্মদিনে
আরেকটি উপহারের বদলে
একটি গাছ দেওয়া যায়।
ছবির ফ্রেমে
নিজেকে রাখার বদলে
একটি সবুজ ভবিষ্যৎ রাখা যায়।
আমরা যদি
প্রতিদিন পৃথিবীর কাছে
একটি ছোট ভালো কাজ জমা রাখি,
একদিন দেখব-
পৃথিবীও আমাদের কাছে
একটু ঋণী হয়ে গেছে।
কারণ পরিবেশ রক্ষা
শুধু গাছের জন্য নয়,
শুধু নদীর জন্য নয়,
শুধু পাখির জন্যও নয়-
এটা শেষ পর্যন্ত
মানুষকে বাঁচানোরই
অন্য নাম।
আজ যে শিশুটি
পরিষ্কার রাস্তায় হাঁটবে,
আগামীকাল সে-ই
শহরকে পরিষ্কার রাখবে।
আজ যে কিশোরটি
একটি গাছ লাগাবে,
কাল সে বুঝবে-
ছায়া কোনো বাজারে কেনা যায় না।
আজ যে পরিবার
নিজের বাড়ির চারপাশ পরিষ্কার রাখবে,
কাল সেই পরিচ্ছন্নতা
পাড়া পেরিয়ে শহরে যাবে।
তাই পৃথিবী বদলানোর আগে
আয়নায় একবার তাকাই।
তারপর
নিজের দরজাটা খুলি।
এক মুঠো ময়লা সরাই,
একটি চারা মাটিতে বসাই,
একটু পানি জমতে না দেই,
আর পাশের মানুষটিকে বলি-
‘চলুন,
আজ থেকে অন্তত
আমাদেরটুকু আমরা করি।’
হয়তো এভাবেই
একদিন কোনো ভোরে
শহরের বাতাস একটু হালকা হবে।
কোনো শিশু
নির্ভয়ে গাছের নিচে দাঁড়াবে।
কোনো পাখি
ফিরে আসবে পুরোনো ডালে।
আর পৃথিবী
খুব আস্তে,
খুব নীরবে
আমাদের দিকে তাকিয়ে বলবে-
'তোমরা অবশেষে বুঝেছ,
আমাকে বাঁচানো মানে
নিজেদেরই বাঁচানো।'