শুক্রবার (২৮ আগস্ট) জাতীয় প্রেসক্লাবে জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সকাল ১০ ঘটিকায় বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি)'র চতুর্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী এবং তাত্ত্বিক ও প্রধান উপদেষ্টা, বাংলা একাডেমি সভাপতি, প্রখ্যাত লেখক, গবেষক, রাষ্ট্রচিন্তক, সর্বজনীন গণতন্ত্রের প্রবর্তক, জ্ঞানতাপস আবুল কাসেম ফজলুল হক- স্মরণে “ তাঁর জীবনদর্শন ও সাম্প্রতিক রাজনীতি” বিষয়ে আলোচনা সভা এম এ আলীম সরকার এর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়।
সভাপতির বক্তব্যে এম এ আলীম বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন কৃষক-শ্রমিক, মজলুম এবং মেহনতি মানুষের মুক্তির কণ্ঠস্বর ও আলোকবর্তিকা। তিনি অত্যন্ত সহজ-সরল সাদাসিধে জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন। একইসাথে তিনি সভ্যভদ্র, বিনয়ী এবং মানবপ্রেমী একজন মানুষ ছিলেন। তাঁর মতো মহৎ হৃদয়ের মানুষ বর্তমান বিশ্বে বিরল।
শৈশব থেকেই তিনি দেশ ও দেশের মানুষকে নিয়ে ভাবতেন। চতুর্থ শ্রেণিতে থাকাকালীন ভাষা আন্দোলনের সময় অন্যদের সাথে তিনিও "রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই , নুরুল আমিনের কল্লা চাই" এই স্লোগান দেন। তখন থেকেই তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা। ছাত্রজীবনে ছাত্র ইউনিয়ন করতেন এবং পরবর্তীতে মাও সেতুঙের আদর্শে অনুপ্রাণিত হন।
আবুল কাসেম ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে দীর্ঘ চার দশক শিক্ষকতা করেছেন।আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁর লেখা ও কথায় কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতির মানুষের মুক্তির কথা লিখেছেন । তিনি মানুষের মধ্যে শুভবোধের জাগরণ কামনা করেছেন। তাঁর স্বপ্ন ছিল ২৮ দফার পর ওপর একটি নতুন রাজনৈতিক দল গড়ে উঠবে এবং নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি হবে। তাঁর আটাশ দফার ওপর ভিত্তি করেই বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টি (বিজিপি) নামে একটি রাজনৈতিক দল আত্মপ্রকাশ করে ২০২৩ সালের ২৫ আগস্ট। তিনি নিজেই এ পার্টি ঘোষণা করেন এবং তাত্ত্বিক ও প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে ছিলেন। ২০২৩ সালের ৬ অক্টোবর জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ গণমুক্তি পার্টির এক আলোচনা সভায় ২৮ দফার রূপরেখাকে সর্বজনীন গণতন্ত্র হিসেবে রূপদান করা হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে বাংলা একাডেমির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ প্রদান করে।
অধ্যাপক ফজলুল হক শিক্ষা ক্ষেত্রেও ছিলেন একজন অনন্য ব্যক্তিত্ব। তিনি শুধু পাঠ্যবইয়ের জ্ঞান বিতরণ করেননি, বরং শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিকতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে সচেষ্ট ছিলেন। তার শ্রেণিকক্ষ ও বাসা ছিল জ্ঞানচর্চার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল পাঠশালা।
তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে বাংলাদেশে জনগণের কল্যাণে একটিও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গড়ে ওঠেনি। রাজনৈতিক নেতৃত্ব নেই। প্রয়োজন নতুন রাজনীতি ও নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব। তিনি প্রতিহিংসামুক্ত সম্প্রীতিময় রাজনীতির কথা বলেছেন। বাম ও ডানপন্থী সবাই ভুল পথে চলছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সহ বিশ্বে যে গণতন্ত্র চলছে, সে গণতন্ত্রে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি মনে করতেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদীদের উদার গণতন্ত্র পাঁচ শতাংশ লোকের জন্য প্রযোজ্য, আর এই পাঁচ শতাংশ লোক সমাজের, রাষ্ট্রের ৯৫ শতাংশ লোকের রক্ত শোষণ করছে গোটা বিশ্বে। তিনি জাতিসংঘকে অকার্যকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে আখ্যায়িত করে জাতিসংঘকে পুনর্গঠন করে রাষ্ট্রসংঘ করার কথা বলেছেন এবং কোনো দেশের অধীনে সেনাবাহিনী না রাখারও প্রস্তাব দিয়েছেন। সেনাবাহিনী থাকবে শুধু রাষ্ট্রসংঘের অধীনে। তিনি যুদ্ধমুক্ত পৃথিবী দেখতে চেয়েছেন। সম্প্রীতিময় বিশ্বশান্তির কথা বলেছেন। তাঁর চিন্তা-চেতনাই ছিল মানুষের সর্বজনীন কল্যাণ। তিনি শুধু বাংলাদেশের জনগণের কথা ভাবেননি, বিশ্ব মানব মুক্তির কথা ভেবেছেন। তিনি সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কার এবং কৃষক-শ্রমিক, মজলুম ও মেহনতি মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য প্রায় দীর্ঘ ৭০ বছর সংগ্রাম করেছেন তাঁর লেখার মাধ্যমে। তিনি বলেছেন দেশ স্বাধীন হয়েছে, কিন্তু কৃষক-শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তি হয়নি। মুক্তি হয়েছে কিছু রাজনীতিক, আমলা ও অসাধু ব্যবসায়ীর এবং এদের ভাগ্য পরিবর্তন হয়েছে। তিনি সব দলের সর্বজনীন অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন কেবল নির্বাচনই গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে সুশাসন নিশ্চিত করা।
এম এ আলীম বলেন, শেখ হাসিনা পরিচালিত সরকার জনগণের দীর্ঘদিনের পুঞ্জিভূত রাস্ট্রব্যবস্থা, ভোটারবিহীন নির্বাচন ও তাঁর আত্ম-অহংকারী একগুয়েমি মনোভাবের কারণে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মনোনীত এনজিও সিভিল সোসাইটি সরকার। তারা দেশকে অগ্নিগর্ভে রেখে গেছে। বাংলার জনগণ ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে বিএনপিকে ভোট দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করেছে।
এম এ আলীম সরকার আরও বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজনীতির যে চিত্র আমরা দেখতে পাচ্ছি, তাতে মনে হয় প্রতিক্রিয়াশীল অশুভ শক্তি দেশকে আরও নৈরাজ্যকর অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়ার আশংকা দেখা যাচ্ছে। একটি রাষ্ট্রের ভিতরে আরেকটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছে, তা হলো রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। প্রশাসনের নাকের ডগায় রাকসু জিএস এবং ছাত্রশিবিরের ক্যাডাররা যা ইচ্ছে তাই করছে মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে। তারই ধারাবাহিকতায় ৯০ দশকের ছাত্রশিবিরের ইতিহাস পুনরাবৃত্তি করে আলিয়া মাদ্রাসা, ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একযোগে মব সন্ত্রাস সৃষ্টির মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে। সরকারকে চোখ-কান খোলা রাখতে হবে এবং সজাগ থাকতে
হবে। মব সন্ত্রাসকে প্রশ্রয় না দিয়ে কঠোরহস্তে দমন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিক্রিয়াশীল অশুভ শক্তি উত্থানের যেভাবে সুযোগ করে দিয়েছে এটা প্রতিহত করতে না পারলে আগামীতে দেশ আফগানিস্তানি তালেবান রাষ্ট্রে পরিণত হবে। আগামীতে দেশকে রক্ষা করতে হলে প্রগতিশীল, জাতীয়তাবাদী ও মুক্তিযুদ্ধের সকল শক্তিকে এককাতারে দাঁড়ানোর সময় এসেছে। আমরা প্রতিহিংসামুক্ত রাজনীতি ও সম্প্রীতিময় বাংলাদেশ চাই।
এম এ আলীম সরকার আরও বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সার্বিকভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় আছে বলে আমরা মনে করি। মানুষের জীবনজীবিকা, আইনশৃঙ্খলা, বিদ্যমান বিচারব্যবস্থা এবং দেশের বেকার সমস্যা অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছে। দেশে জ্বালানী তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎতের যে সংকট দেখা দিয়েছে, তাতে জনজীবন নাভিশ্বাস হয়ে পড়েছে। চাল, ডাল তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের জীবনযাপন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষের জীবনজীবিকা কঠিন হয়ে পড়েছে। এমন অবস্থায় দেশের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে।
আমরা সরকারের কাছে সদর্থক আহ্বান করছি যে অনতিবিলম্বে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুৎ সংকট নিরসনে এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
আজকের সমাজে যখন মানবিক মূল্যবোধ নানা সংকটের মুখোমুখি, তখন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের জীবনাদর্শ আমাদের জন্য এক অনুপ্রেরণার উৎস। তাঁর কর্ম, চিন্তা ও ত্যাগ নতুন প্রজন্মকে মানবসেবায় উদ্বুদ্ধ করবে।
আরও বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাসদ স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক ডাকসু জিএস ডা. মুস্তাক হোসেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, সোনার বাংলা পার্টির সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ ও অন্যান্য নেতৃবৃন্দ প্রমুখ।
অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন পার্টির সাধারণ সম্পাদক লেখক অমূল্য কুমার বৈদ্য।