তুমি হয়তো ভালোবাসার শিকড় গড়তে গিয়ে কোথাও নিজের সেই প্রবল ‘আমিত্ববোধ’-এর কাছে হেরে গিয়েছিলে।
ও হ্যাঁ, কেমন আছো তুমি?
সম্পর্ক শেষ হওয়ার আগে কি একবারও বুঝতে পেরেছিলে—ভালোবাসা কেবল শরীরে বাস করে না; তার আসল বিচরণ মস্তিষ্ক পেরিয়ে সেই অদৃশ্য মনে, যেখানে স্পর্শ ছাড়াই মানুষ একজন আরেকজনের গভীরে পৌঁছে যায়?
হয়তো কবুল বলেও তুমি থেকে যেতে চেয়েছিলে বাঁধনহীন। অথচ বুঝতে পারোনি, সম্পর্ক শেষ হওয়ার আগেই সেই বাঁধনহীনতাই তোমাকে ভেতর থেকে শেষ করে দিচ্ছিল।
আচ্ছা হেমন্ত, তুমি কি জানতে না—মানুষের জীবনের অনেক সফলতার হিসাব মেলে উপসংহারে? তাই তো মানুষ চাতকের মতো একদিন সেই উপসংহারের অপেক্ষায় থাকে। অথচ তুমি তোমার কাব্য, তোমার অতীত, তোমার ভবিষ্যৎ—সবকিছুর উত্তর খুঁজতে খুঁজতে ঢুকে পড়েছিলে নারীর গহীন অরণ্যে; আর সেই অরণ্যের ভেতরেই কোথাও হারিয়ে ফেলেছিলে নিজের অস্তিত্ব।
শোনো হেমন্ত—
আকাশের আকাশী রং দেখা যায়,
গোলাপের গোলাপী রং দেখা যায়,
কিন্তু বাতাসের বাতাসী রং কখনো দেখা যায় না।
তেমনি তোমার ভেতরেও ছিল এক অদৃশ্য ‘আমিত্বের রং’—যে রং কোনো প্রেমিকা মেহেদির মতো তোমার জীবনে স্থায়ী করে আঁকতে পারেনি। অবশ্য কোনো রমণীর পক্ষে হয়তো বোঝাও সম্ভব নয় একজন রক্তে বহমান কবির সেই গভীর আমিত্ববোধ।
রমণীরা ভালোবাসা দিয়ে মানুষকে আটকে রাখতে চায়। কিন্তু তোমার আচরণে ছিল এক বেপরোয়া স্বাধীনতা। বাইরে থেকে মনে হতো তুমি ভালোবাসার মানুষ, অথচ ভেতরের গভীরে ভালোবাসার যে কোমলতা, তার কতটুকুই বা ছিল?
থাকলে কি করে ভালোবাসাহীন কামনার তুলিতে যার-তার শরীরে এঁকে যেতে প্রেমের আলপনা?
তবু আমি তোমাকে ভালোবাসি—তোমার মানুষটিকে যতটা না, তার চেয়েও বেশি তোমার শিল্পসত্তাকে। আমি কবির প্রেমে পড়িনি, আমি বারবার, হাজারবার তোমার কবিতার প্রেমে পড়েছি। তোমার লেখায় যে বিশুদ্ধতা ছিল, যে অনুভবের গভীরতা ছিল—আজকালকার অনেক লেখকের কলমেও তার ছায়াটুকু খুঁজে পাওয়া কঠিন।
আমার এই সাধারণ মগজে যে কথাটি ধরা পড়েছিল, তোমার সেই অসাধারণ মগজে হয়তো তা ধরা পড়েনি—
অতিরিক্ত ভালোবাসার একজন মানুষের সঙ্গে সবসময় সংসার বাঁধতে নেই।
কারণ সংসার আর প্রেম কোনোদিন একই সরলরেখায় এসে দাঁড়ায় না।
প্রেম উদারতা,
ভালোবাসা ক্ষমা ও ত্যাগ,
আর সংসার—দায়বদ্ধতার আরেক নাম।
সংসারে কখনো কখনো ভালোবাসার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় মানিয়ে নেওয়ার, নীরব থাকার, দায়িত্ব পালন করার। সেখানে আবেগকে দেখানোর সুযোগ কম, অভিনয়ের প্রয়োজন বেশি। হয়তো এ কারণেই প্রেম আর সংসার পাশাপাশি থেকেও একে অপরের পরিপূর্ণ প্রতিচ্ছবি হতে পারে না।
আফসোস, তুমি হয়তো সেটা বুঝতে পারোনি।
তাই আবেগকে লেখার পাতায় অমর করে রাখলে, অথচ জীবনের পাতায় তাকে দেখিয়ে যেতে পারলে না। আর আজ আমি শুধু দেখি—তোমার লেখা, তোমার কবিতা, তোমার শব্দের ভেতর লুকিয়ে থাকা সেই মানুষটাকে; যে মানুষটাকে হয়তো বাস্তবে কোনোদিন সম্পূর্ণভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তুমি ভালো থেকো, হেমন্ত।
আর কোনো এক নির্জন রাতে, নিজের অজান্তে আমাকে একটি চিঠি লিখো।
জানি না তুমি শরৎচন্দ্রের ‘দেবদাস’ পড়েছো কি না। যদি পড়ে থাকো, তবে নিশ্চয়ই বুঝেছো—ভালোবাসার জন্য সবসময় একই ঘরের প্রয়োজন হয় না; কখনো কখনো একই আকাশের নিচে থেকেও দুজন মানুষ সারাজীবন একে অপরের হয়ে থাকে।
হয়তো আমাদের গল্পটাও তেমনই—
এক ঘরে নয়, এক আকাশের নিচে;
এক জীবনে নয়, এক অনুভূতির ভেতরে।