মহেশখালী (কক্সবাজার)
মহেশখালীর দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় অস্ত্র তৈরির একটি আস্তানার সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে পুলিশ। শুক্রবার রাতে শাপলাপুর ইউনিয়নের মিঠাছড়ি পশ্চিম পাড়ার পাহাড়ের ভেতরে একটি ভাড়া করা ঘরে অভিযান চালিয়ে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও বিপুলসংখ্যক সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এ ঘটনায় রহমত উল্লাহ ওরফে বাশি (৩০) নামে এক জনকে গ্রেপ্তার করেছে মহেশখালী থানা পুলিশ।
পুলিশের দাবি, উদ্ধার করা সরঞ্জামের মধ্যে বন্দুকের কাঠের বাট, ট্রিগার মেকানিজম, ব্যারেলের অংশ, ট্রিগার,রিসিভার কভারের সদৃশ অংশ,স্প্রিংসহ অস্ত্রের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ রয়েছে। একই সঙ্গে লেদ, ড্রিল মেশিন, গ্রাইন্ডার, হ্যাকসো,কাঠ কাটার ও লোহা কাটার বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে।
যেভাবে মিলল অস্ত্র তৈরির আস্তানার সন্ধান,পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২১ আগস্ট রাতে মহেশখালী থানার এসআই মোহাম্মদ ইকবাল হোসেনের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল শাপলাপুর বাজার এলাকায় রাত্রীকালীন টহলে ছিল। রাত আনুমানিক ৮টা ২৫ মিনিটের দিকে স্থানীয় গ্রাম পুলিশ নয়ন উদ্দিনের মাধ্যমে পুলিশ জানতে পারে, মিঠাছড়ি বাজার এলাকায় স্থানীয় লোকজন একজন সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করে রেখেছেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে হেফাজতে নেয়। পুলিশ জানায়, আটক ব্যক্তি নিজের পরিচয় রহমত উল্লাহ ওরফে বাশি হিসেবে দেন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে তিনি পাহাড়ের ভেতরে একটি ভাড়া করা ঘরে অস্ত্র তৈরির বিভিন্ন সরঞ্জাম থাকার কথা জানান বলে দাবি পুলিশের। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মহেশখালী থানার (ওসি) মো. আব্দুস সুলতান ঘটনা স্থলে পৌঁছান। এরপর গ্রেপ্তার ব্যক্তিকে সঙ্গে নিয়ে মিঠাছড়ি পশ্চিম পাড়ার পাহাড়ের ভেতরে একটি বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। পুলিশ বলছে, তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে একাধিক ব্যক্তি দৌড়ে পালিয়ে যায়।খাটের নিচে মিলল যেসব সরঞ্জাম, পুলিশের জব্দ তালিকা অনুযায়ী,ওই কক্ষের খাটের নিচ থেকে উদ্ধার করা হয় বন্দুকের কাঠের বাট ২টি; হাতে তৈরি কাঠের বন্দুকের বাট ২টি; ছোট-বড় ট্রিগার মেকানিজম ৪টি;
অস্ত্র তৈরির ব্যারেলের অংশ ৬টি; ছোট-বড় ট্রিগার ৮টি; রিসিভার কভারের সদৃশ অংশ ৫টি; ছোট-বড়
স্প্রিং ১৫টি;অন্যান্য ক্ষুদ্র অস্ত্রের যন্ত্রাংশ ১৫টি;লোহার হাতুড়ি ২টি; লোহা ধার দেওয়ার লেদ ১টি;লোহার বাটাল ২টি; লোহার পাইপ ১টি;ড্রিল মেশিন ১টি; স্ক্রু ড্রাইভার ৩টি; করাত ১টি; হাতে চালিত ড্রিল মেশিন ১টি; পরিমাপের স্কেল ১টি; ইলেকট্রিক উড প্ল্যানার ১টি; লোহা কাটার গ্রাইন্ডার ১টি;দেশীয় তৈরি কুড়াল ১টি;বড় টর্চলাইট ১টি; ইলেকট্রিক হ্যাকসো ১টি;লোহা কাটার হ্যান্ড করাত ১টি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ২১ আগস্ট রাত ৯টার দিকে এসব সামগ্রী জব্দ তালিকার মাধ্যমে জব্দ করা হয়।
কারা জড়িত খতিয়ে দেখছে পুলিশ, পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার রহমত উল্লাহকে জিজ্ঞাসাবাদে আরও কয়েকজনের নাম পাওয়া গেছে। তাদের মধ্যে নমি উদ্দিন (৪২) নামে একজনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া আরও কয়েকজন অজ্ঞাত ব্যক্তির সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়েছে। পুলিশের প্রাথমিক দাবি, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাপরস্পর যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে লোকচক্ষুর আড়ালে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র তৈরির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এসব অস্ত্র আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করতেন। দুর্গম পাহাড়ে অস্ত্র তৈরির অভিযোগে উদ্বেগ
মহেশখালীর বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য চ্যালেঞ্জিং এলাকা। পাহাড়ের ভেতরে জনবসতি থেকে কিছুটা দূরে ভাড়া করা ঘরে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনা স্থানীয় নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে অস্ত্র তৈরির যন্ত্রপাতির পাশাপাশি একাধিক
অস্ত্রের অংশবিশেষ উদ্ধারের দাবি করায় বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। উদ্ধার করা প্রতিটি যন্ত্রাংশের প্রকৃতি, এগুলো দিয়ে কী ধরনের অস্ত্র তৈরি করা সম্ভব,
কোথায় অস্ত্রগুলো সরবরাহ করাহতো এবংএর পেছনে অর্থের জোগানদাতা বা ক্রেতা কারা এসব প্রশ্নের উত্তর তদন্তেই বেরিয়ে আসবে।
পুলিশের অভিযান অব্যাহত, মহেশখালী থানা পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির দেওয়া তথ্য যাচাই করে পলাতক ব্যক্তিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে। একই সঙ্গে উদ্ধার হওয়া সরঞ্জামগুলোর ব্যবহার ও অস্ত্র তৈরির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এ ঘটনায় মহেশখালী থানায় মামলা হয়েছে। মামলার নম্বর ২৫, তারিখ ২২ আগস্ট ২০২৬। জিআর নম্বর ২৫৫/২৬। মামলায় The Arms Act,1878-এর ধারা19A প্রয়োগ করা হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। অস্ত্র তৈরির আস্তানার সন্ধান ও সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনায় এখন মূল প্রশ্ন মহেশখালীর পাহাড়ে এই কর্মকাণ্ড কতদিন ধরে চলছিল, এর সঙ্গে আরও কতজন জড়িত এবং তৈরি করা অস্ত্র কোথায় সরবরাহ করা হতো। তদন্ত এগোলেই এসব প্রশ্নের উত্তর মিলবে বলে আশা করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।