জলাশয় সংস্কার করে বেকার তরুণদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা, মৎস্য উৎপাদনে পরিবেশ সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব
মৎস্য খাতকে আরও শক্তিশালী করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়াতে নতুন নতুন আন্তর্জাতিক বাজার অনুসন্ধানের জন্য দেশের উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
তিনি বলেছেন, দেশের বিস্তীর্ণ নদী-নালা, খাল-বিল, পুকুর ও হাওরকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে একদিকে যেমন মৎস্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব, অন্যদিকে তৈরি হবে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ। এ লক্ষ্যে সরকার জলাশয় সংস্কার করে সেখানে মাছের পোনা অবমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এসব জলাশয় সংশ্লিষ্ট এলাকার বেকার তরুণদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হবে, যাতে তারা উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হয়ে স্বাবলম্বী হতে পারেন।
রোববার দুপুরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা জর্জ ইনস্টিটিউটের মিনি স্টেডিয়ামে জাতীয় মৎস্য সপ্তাহ ২০২৬-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
এবার জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে-‘রুপালী মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’। অনুষ্ঠানে ১৩টি শ্রেণিতে ১৪ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় মৎস্য পদক (স্বর্ণ পদক) প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরিবেশ বাঁচলেই বাঁচবে মৎস্য সম্পদ
মৎস্য সম্পদের টেকসই উন্নয়নের জন্য জলাশয় ও পরিবেশ রক্ষার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের সঙ্গে যুক্ত। মাছের উৎপাদন ধরে রাখতে হলে নদী, খাল, বিল ও হাওরের স্বাভাবিক পরিবেশ রক্ষা করতে হবে।
প্লাস্টিকের বোতল, টিস্যু ও বিভিন্ন ধরনের বর্জ্য জলাশয়ে ফেলার কারণে পানির পরিবেশ ক্রমেই দূষিত হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাছ, পানি, পরিবার ও সামগ্রিক পরিবেশ রক্ষায় নাগরিক সচেতনতা বাড়াতে হবে। পরিবেশ সুরক্ষিত থাকলে বর্তমান প্রজন্মের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মও একটি সুস্থ পরিবেশে বসবাসের সুযোগ পাবে।
রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা
মৎস্য খাতের বৈদেশিক বাণিজ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রায় ৫২টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি করে ৬ হাজার কোটি টাকার বেশি সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে।
তিনি জানান, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে মোট জলজ প্রাণী উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে পঞ্চম এবং অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয় থেকে মাছ আহরণে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের পণ্য শুধু প্রচলিত বাজারে সীমাবদ্ধ না রেখে নতুন নতুন দেশে বাজার তৈরি করতে হবে। উদ্যোক্তাদের নতুন বাজার অনুসন্ধানে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এ ক্ষেত্রে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।
বাংলাদেশের নতুন রপ্তানি সম্ভাবনার উদাহরণ হিসেবে গত জুনে নাইজেরিয়ায় হ্যাচিং ডিম রপ্তানির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
চিংড়ি ও ইলিশে গুরুত্ব
মৎস্য খাতে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, খুলনা অঞ্চলে ৩০০টি ক্লাস্টারের আওতায় ৭ হাজার ৫০০টি ঘেরে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কক্সবাজারের চকরিয়ায় প্রায় ৭ হাজার একর জমিতে ‘শ্রিম্প সিটি’ বাস্তবায়নে মাস্টারপ্ল্যান ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ চলছে।
দেশের মৎস্য সম্পদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইলিশ। প্রধানমন্ত্রী জানান, মোট মৎস্য উৎপাদনে ইলিশের অবদান প্রায় ১০ শতাংশ এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ইলিশ সংরক্ষণ ও উৎপাদন বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনার ধারাবাহিকতায় উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
মৎস্যজীবীদের জন্য সামাজিক সুরক্ষা
মৎস্য খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ যুক্ত বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। মৎস্য চাষিদের কৃষক কার্ড, জেলেদের নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদানের কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো সুন্দরবন ও হাওর অঞ্চলে মাছ ধরার নিষিদ্ধ সময়ে জেলেদের খাদ্য সহায়তার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।
তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার তহবিল
প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করতে সরকার ৫০০ কোটি টাকার উদ্যোগ তহবিল গঠন করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সম্ভাবনাময় নতুন উদ্যোগের জন্য ৫ লাখ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অনুদানের সুযোগ রাখা হয়েছে।
নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে উৎপাদন, প্রযুক্তি ও রপ্তানিমুখী ব্যবসায় এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় বড় ভূমিকা রাখতে পারে। শুধু দেশের চাহিদা পূরণ নয়, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের উপস্থিতি বাড়ানোর মাধ্যমে এই খাতকে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের আরও বড় উৎসে পরিণত করা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী আমিন উর রশীদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী শাহে আলম, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
জাতীয় মৎস্য সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান শেষে প্রধানমন্ত্রী কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া মাঠে বৃক্ষরোপণ এবং কিশোরগঞ্জ স্টেডিয়ামে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে।
মৎস্য খাত | রপ্তানি | কর্মসংস্থান