মঙ্গলবার, আগস্ট ১১, ২০২৬

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস

  • শৌল বৈরাগী
  • ২০২৬-০৮-০৯ ২০:১৬:০৯
ফাইল ছবি

১৯৮২ সাল। জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের অধীনে আদিবাসী জনগোষ্ঠির কার্যনির্বাহী দল - এর প্রথম সভা হয়। এই সভা থেকেই বিশ^জুড়ে আদিবাসেিদর অধিকার রক্ষার দাবি জোরালো হয়। ফলশ্রæতিতে ১৯৯৩ বছরটিকে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক আদিবাসী বর্ষ হিসেবে ঘোষণা করে এবং ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসে ৪৯/২১৪ নং প্রস্তাবের মাধ্যমে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রতিবছর ৯ই আগষ্টকে আনুষ্ঠানিকভাবে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস ঘোষণা করা হয়। সেই থেকে বিশ^ব্যাপী ৯ই আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে এবং প্রতি বছরই জাতিসংঘ দিবসের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করে থাকে। উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে জানা যায়, প্রতি বছর ৯ আগষ্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসটি বিশ^ব্যাপী পালিত হলেও বাংলাদেশে ২০০৪ থেকে সরকারিভাবে পালিত হয়ে আসছে। আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসটি বিশে^র ৯০টি দেশে ৩৭০ বিলিয়ন আদিবাসীরা প্রতিবছর উদ্যাপন করে থাকেন। তবে বাংলাদেশে ২০০১ ‘সালে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরম’ গঠিত হবার পরে বেসরকারিভাবে বৃহৎদাকারে আন্তর্জাতিক দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। যদিও কিছু কিছু এলাকা ভিত্তিক সংগঠন এবং সংস্থা ১৯৯৪ সালের পর থেকেই সীমিত আকারে সামর্থ্যমত পালন করেছে। বাংলাদেশে আদিবাসী শব্দ নিয়ে বিতর্ক রয়েই গেছে। বাংলাদেশ সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশের উপজাতিদের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায় বা উপজাতি হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে, যদিও বাংলাদেশের উপজাতিরা নিজেদের আদিবাসী দাবি করে আসছে। এ নিয়ে আদিবাসীদের সাথে বাংলাদেশ সরকারের মধ্যে বিতর্ক হয়েই আসছে। আদিবাসীদের আদিবাসী হিসেবে সংবিধানিক ঘোষণা দেয়ার জন্য আদিবাসী, আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করেন এমন সংগঠন ও সংস্থাগুলো জোরালো দাবী করে আসছেন। 
জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালনের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। (১) আদিবাসীদের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষা করা; (২) ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখা; (৩) আদিবাসীদের বঞ্চনা, বৈষম্য ও অধিকার লঙ্ঘন সম্পর্কে বিশ^বাসীকে জানানো; এবং (৪) সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সুরক্ষায় আদিবাসীদের অবদান স্বীকার করা এবং তাদের উন্নয়ন নিশ্চিত করা। আদিবাসী, আদিবাসী সংশ্লিষ্ট সংগঠন, সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আদিবাসীদের উপরোক্ত লক্ষ্যগুলো বাস্তবায়নে বিভিন্ন সরকার প্রধানদের অনেক ধরনের সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চাপ দিতে নিরলসভাবে কাজ করে যাুেচ্ছ।
বাংলাদেশে ৪৫টিরও বেশী আদিবাসী/ক্ষুদ্রনৃগোষ্ঠিদের বসবাস। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী, রংপুর বিভাগের রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, জয়পুরহাট, নাটোর, নওগাঁ, রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, গাইবান্ধা ইত্যাদি জেলাগুলোতে সাঁওতাল, শিং (মিঞ্জ), ওঁরাও, মুন্ডারি, বেদিয়া, মাহাতো, রাজোয়ার, কর্মকার, তেলী, তুরী, ভুইমালী, কোল, বড়া, রাজবংশী, মাল পাহাড়িয়া, মাহালী ইত্যাদি জাতিগোষ্ঠি বসবাস করে। অন্য দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গমাটি, বান্দরবন ও খাগড়াছড়িতে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, মুরং বা ¤্রাে, খিয়াং, লুসাই, পাঙখোয়া, বম, খুমী, চাক ইত্যাদি জনগোষ্ঠির আবাসস্থল। দেশের উত্তরাঞ্চলের ময়মনসিংহ, শেরপুর, টাঙ্গাইল, সিলেট, জামালপুর, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় ক্ষুদ্র-নৃগোষ্টির জনগনের বসবাস। এ সকল জেলায় প্রধানত: গারো, হাজং, কোচ, বর্মন, বানাই, ডালু, হাদি, মনিপুর, খাসিয়া, পাত্র, ত্রিপুরা, বিষ্ণুপ্রিয়া ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির জনগণ বসবাস করে। এই ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠি সবাই দাবী করে তারা প্রত্যেকেই এখানকার আদিবাসী। বিশে^ও তাবৎ আদিবাসী জনগোষ্ঠির পাশাপাশি বাংলাদেশের ৩০ লক্ষাধিক ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠিও তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয়, ভ‚মির অধিকার, শিক্ষা-স্বাস্থ্যসহ সকল প্রকার নাগরিক মর্যাদা ও স্বীকৃতির দাবীতে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করে আসছে।      
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয়, ‘ঐড়হড়ঁৎ ওহফরমবহড়ঁং সরফরিাবং: ঝধভবমঁধৎফ ষরভব ধহফ বিষষ-নবরহম’ যার বাংলা ভাবার্থ হলো ‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো: জীবন ও সুস্থ্যতা রক্ষা করা’। ভৌগোলিকভাবে আদিবাসী জনগোষ্ঠি এলাকাসমূহ খুবই দূর্গম এলাকায় বসবাস করে। এই জনগোষ্ঠির শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবিক মৌলিক চাহিদাগুলো অনেকটাই ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। তারা প্রকৃতির সাথেই নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। প্রয়োজনীয় আলো, ব্যবহার ও খাবার পানি, শিক্ষা, স্বাস্থসেবা ইত্যাদিতে নৃ-গোষ্ঠির জনগণ নিজেদের ও পুর্বপুরুষদের উদ্ভাবিত জ্ঞান, পদ্ধতি ও কৌশল ব্যবহারেই বেশী নির্ভরশীল। নিজস্ব উদ্ভাবন ব্যবহার করেই আদিবাসী গোষ্ঠী টিকে আছে। চলতি বছরের প্রতিপাদ্য বিষয় আদিবাসীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সময়োপযোগি। আমাদের দেশেও ১৯৯০ দশকের আগে অধিকাংশ মায়েরাই সন্তান জন্মদানের জন্য গ্রামীণ দক্ষ অদক্ষ ধাত্রীদের (দাই/দাইমা ইত্যাদি নামেও পরিচিত) উপরই বেশী নির্ভর করতেন। কেননা কিছু শহুরে মা ব্যবতীয় ৮০-৯০ ভাগ মায়েদেরই নির্ভর করতে হত ঐ দক্ষ বা অদক্ষ ধাত্রীদের উপরই। এতে করে অনেক মা-দেরকেই সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে অকালে ঝরে পরতে হয়েছে। ১৯৮০ পরবর্তী সময়ে কিছু কিছু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা ধাত্রীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন এবং তথাকথিত ধাত্রীদের দক্ষ করে গড়ে তোলেন। আদিবাসী সমাজগুলো শিক্ষা-দীক্ষায় এখন অনেক এগিয়ে গেলেও তাদের দুর্গম এবং রাজধানী, জেলা এমনকি উপজেলা থেকেও অনেক দুরে এবং সহজ যাতায়াত নাই। তাই মা’য়েদের নির্ভরতা এখনও সেই ধাত্রীদের উপরই রাখতে হয়। সাধুবাদ জানাই জাতিসংঘকে এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে বেছে নেয়ার জন্য। তবে, শুধুমাত্র দিবস পালনের জন্য নয়, এইসব ধাত্রীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণে প্রশিক্ষিত করা, তাদরে প্রযোজনীয় প্রাথমিক যন্ত্রপাতি দেয়া, সরকারিভাবে কিছুটা সম্মানী প্রদানের ব্যবস্থা করা, মূল্যায়ণ ও যথাযথ প্রদান করা হলে আনেক মা ও সন্তানদের অকালে ঝরে যেতে হবে না। জাতিসংঘের সাথে সাথে প্রতিটি দেশের সরকার থেকে এ বিষয়ে যথাযথ উদ্যোগ গ্রহণ করতে ও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। কেননা দিবসের প্রতিপাদ্যের তাৎপর্য হলো: আদিবাসী সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যগত স্বাস্থব্যবস্থা ও জ্ঞান সংরক্ষণ, মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষায় আদিবাসী ধাত্রীদের অবদানকে স্কীকৃতি ও সম্মান প্রদান এবং বিশ^জুড়ে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা। আদিবাসীদের অধিকার নিশ্চিত হোক। দিবসরে লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও পূরণ করতে পারলেই দিবস পালনের স্বার্থকতা হবে। সকল আদিবাসীদের শুভেচ্ছা।

কলামিষ্ট ও লেখক।      


এ জাতীয় আরো খবর