মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২৬

সিন্ডিকেট,আমদানি নীতি ও বাজার ব্যবস্থাপনায় প্রশ্নের মুখে দেশের লবণখাত

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৮-০৩ ২৩:৪৩:১০

মহেশখালী (কক্সবাজার)

বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি   লবণশিল্প।  কক্সবাজারের  মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া,  চকরিয়া  ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপকূলীয়  এলাকায়  হাজার হাজার পরিবার মৌসুমি লবণ উৎপাদনের  ওপর  নির্ভরশীল। প্রতিবছর কোটি কোটি  টাকার  লবণ  উৎপাদিত হলেও উৎপাদকদের অভিযোগ   ন্যায্যমূল্য,  বাজার   ব্যবস্থাপনা, সংরক্ষণ সুবিধার  অভাব  এবং  মধ্যস্বত্বভোগীদের  দৌরাত্ম্যের কারণে প্রকৃত লাভ থেকে  বঞ্চিত  হচ্ছেন তারা। এমন বাস্তবতায় শিল্প  মন্ত্রণালয়ে  লবণের ন্যায্যমূল্য,দেশীয় উৎপাদন,  বিদেশ   থেকে   আমদানি, বাজার নিয়ন্ত্রণ এবং প্রান্তিক চাষিদের স্বার্থ রক্ষাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে উচ্চপর্যায়ের   বৈঠক   অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকের আগেই বাজারে লবণের দাম কমে যাওয়ায় নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বৈঠকের আগেই কেন কমল লবণের দাম?
লবণচাষিদের  একটি  অংশের  অভিযোগ, বৈঠকের খবর  প্রকাশের পরপরই কয়েক দিনের মধ্যে বিভিন্ন মিল  মালিক  লবণের  ক্রয়মূল্য  কমিয়ে  দেন। এতে প্রান্তিক চাষিরা আশঙ্কা করছেন,সরকারি উদ্যোগের সুফল  তারা  নাও  পেতে  পারেন। তাদের  প্রশ্ন যদি সরকার ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে উদ্যোগী হয়,তাহলে বৈঠকের  আগেই  বাজারে  মূল্য কমে যাওয়ার কারণ কী? এটি কি বাজারের স্বাভাবিক নিয়ম,নাকি কোনো প্রভাবশালী গোষ্ঠীর সিদ্ধান্ত এ বিষয়ে স্বচ্ছ ব্যাখ্যা দাবি করছেন তারা।
সিন্ডিকেটের   অভিযোগ,  লবণচাষিদের  একটি  বড় অংশের দাবি, বাজারে দীর্ঘদিন ধরে কিছু প্রভাবশালী ব্যবসায়ী, মিল  মালিক  ও  মধ্যস্বত্বভোগীদের  একটি শক্তিশালী    প্রভাব    রয়েছে।     তাদের   অভিযোগ,উৎপাদনের মৌসুমে ইচ্ছাকৃতভাবে দাম কমিয়ে রাখা হয়, আর পরে সেই লবণ  বেশি দামে বিক্রি করা হয়।
তবে এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বিষয়টি  নিরপেক্ষ তদন্তের   মাধ্যমে   যাচাই   করার  দাবি  জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। অবৈধ  আমদানির  অভিযোগ  লবণখাতে দীর্ঘদিন ধরে আরেকটি আলোচিত বিষয় হলো বিদেশি লবণ আমদানি। উৎপাদকদের অভিযোগ, দেশে পর্যাপ্ত লবণ  উৎপাদন  থাকা  সত্ত্বেও কখনো কখনো বিদেশি লবণ   আমদানির   সুযোগ   তৈরি  হয়। এছাড়া  কিছু মহলের   অভিযোগ,  কাস্টমস  ফাঁকি  বা  অনিয়মের মাধ্যমে বিদেশি  লবণ  বাজারে  প্রবেশ করলে দেশীয় বাজারে  মূল্য  কমে   যায়  এবং  ক্ষতিগ্রস্ত  হন স্থানীয় চাষিরা।  সরকার  চাইলে  কাস্টমস,  এনবিআর, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং আইনশৃঙ্খলা  বাহিনীর সমন্বয়ে একটি নিরপেক্ষ  তদন্তের  মাধ্যমে  প্রকৃত  চিত্র তুলে আনতে পারে।
বিসিকের   ভূমিকা   নিয়ে   বিতর্ক, বাংলাদেশ  ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) দেশের লবণশিল্পের উন্নয়নে  গুরুত্বপূর্ণ   ভূমিকা  পালন  করে।   তবে কিছু লবণচাষির   অভিযোগ, বাজার  ব্যবস্থাপনায়  বিসিক আরও   কার্যকর   ভূমিকা   রাখতে   পারলে    চাষিরা ন্যায্যমূল্য  পেতেন।   অন্যদিকে  বিসিকের  পক্ষ থেকে বিভিন্ন  সময়ে  দাবি  করা  হয়েছে, তারা  লবণখাতের উন্নয়ন,  উৎপাদন    বৃদ্ধি   এবং    বাজার  ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী  করতে   কাজ  করছে।  প্রান্তিক  চাষিদের বাস্তবতা,  মাঠপর্যায়ে  চাষিদের   ভাষ্য, জমির ইজারা, শ্রমিকের   মজুরি,   ডিজেল,  পরিবহন  এবং অন্যান্য উৎপাদন   ব্যয়   প্রতিবছর   বাড়ছে। কিন্তু  উৎপাদিত লবণের  দাম   অনেক  সময় সেই ব্যয়েরও নিচে নেমে আসে।   ফলে  অনেক  চাষি ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন এবং পরবর্তী  মৌসুমে   উৎপাদনে  আগ্রহ  হারিয়ে ফেলেন।
অর্থনীতিবিদ   ও   কৃষি   বিশ্লেষকদের  মতে, লবণের ন্যায্যমূল্য   নিশ্চিত   করতে   হলে  শুধু  দাম নির্ধারণ করলেই হবে না।এর পাশাপাশি বাজারে প্রতিযোগিতা মূলক   পরিবেশ   নিশ্চিত  করতে হবে। উৎপাদকদের কাছ  থেকে  সরাসরি  লবণ  সংগ্রহের  ব্যবস্থা করতে হবে,  সংরক্ষণাগার  ও  গুদাম  সুবিধা  বাড়াতে  হবে।
অবৈধ  আমদানি  ও  বাজার  কারসাজির অভিযোগ 
দ্রুত  তদন্ত  করতে  হবে।   সংশ্লিষ্ট  সব   প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
চাষিদের   প্রত্যাশা    প্রান্তিক    লবণচাষিদের   আশা, সরকারের সাম্প্রতিক  উদ্যোগ কেবল বৈঠকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না;বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া হবে।তারা চান, বাজারে   স্বচ্ছতা   প্রতিষ্ঠিত   হোক,  অনিয়মের অভিযোগ   নিরপেক্ষভাবে  তদন্ত  হোক এবং  দেশীয় উৎপাদকরা যেন তাদের উৎপাদিত লবণের ন্যায্যমূল্য পান। বাংলাদেশের লবণশিল্প কেবল একটি শিল্পখাত নয়; এটি উপকূলীয় অঞ্চলের লাখো মানুষের  জীবন-জীবিকার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।তাই এই খাতে ন্যায্যমূল্য,স্বচ্ছ বাজারব্যবস্থা,জবাবদিহি এবং সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে শুধু চাষিরাই নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিও  উপকৃত  হবে।  এখন  দেখার বিষয়, শিল্প মন্ত্রণালয়ের  বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবে কতটা কার্যকর হয়  এবং  প্রান্তিক  লবণচাষিদের  মুখে কতটা স্বস্তির হাসি ফিরিয়ে আনতে পারে।


এ জাতীয় আরো খবর