মঙ্গলবার, আগস্ট ৪, ২০২৬

হারানো শিকড়,পারিবারিক ভাঙন এবং সামাজিক অবক্ষয়: একজন সাংবাদিকের অন্তরের আকুতি

  • ​মোঃ সোহেল,
  • ২০২৬-০৮-০৩ ১০:১২:৫২

​রাষ্ট্রের সামগ্রিক কল্যাণ, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং নাগরিক অধিকার রক্ষার্থে সচেতন কলমবির হিসেবে বস্তুনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল মতামত প্রকাশ করা সাংবাদিকতার অন্যতম মৌলিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। একটি স্বাধীন রাষ্ট্রে জনস্বার্থ সংশিষ্ট বিষয়ে সমালোচনা, নীতিগত বিশ্লেষণ এবং সংস্কারের পক্ষে জনমত গঠন করার অধিকার সংবাদপত্র ও সংবাদকর্মীদের সংবিধান স্বীকৃত বাকস্বাধীনতা ও রিপোর্টিংয়ের পরিধিভুক্ত। এই নিবন্ধটি সম্পূর্ণভাবে সমাজ সংস্কার, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ইতিবাচক পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে প্রকাশিত একটি সাহিত্যিক ও মননশীল মতামত।
​বর্তমান সরকারের মাদকবিরোধী 'জিরো টলারেন্স' ঘোষণাটি কেবল একটি প্রশাসনিক আদেশ নয়; এটি আমাদের জাতীয় অস্তিত্ব রক্ষার এক তীব্র আর্তনাদ, যা অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয়। একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে রাষ্ট্রের এই কঠোর অবস্থানের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সংহতি জানিয়ে আজ বুকের গভীরে জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস আর কান্নাকে কোনোভাবেই আটকে রাখতে পারছি না। রাষ্ট্র যখন মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক লড়াইয়ে অবতীর্ণ, তখন আমাদের আত্মোপলব্ধির আয়নায় নিজেদের মুখ দেখার সময় এসেছে। আজ যে তরুণটি নেশার ঘোরে অন্ধকার গহ্বরে হারিয়ে যাচ্ছে, সে তো কোনো না কোনো মায়ের কোলজুড়ে আসা অমূল্য রত্ন, কোনো না কোনো পরিবারেরই রক্তমাংসের সন্তান। তফাত শুধু এতটুকুই—পরিবার ও সমাজের আন্তরিক ছোঁয়া ও মায়ায় একজন মাদকাসক্ত মানুষকে নানা যন্ত্রণায় ও ত্যাগে হলেও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার অফুরন্ত সুযোগ থাকে। কিন্তু যারা এই মরক ব্যবসার সাথে যুক্ত এবং পর্দার আড়াল থেকে আমাদের নিষ্পাপ যুবসমাজকে তিলে তিলে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে, তারা রয়ে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী চাইলে আইনের কঠোর ও সর্বোচ্চ প্রয়োগের মাধ্যমে কি এই ঘাতক সিন্ডিকেটগুলোর শেকড় চিরতরে উপড়ে ফেলতে পারে না? অবশ্যই পারে। তবুও আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ ঘটানো সেই অমীমাংসিত প্রশ্নটি থেকেই যায়—কেন আমাদের এই প্রজন্মকে এভাবে তিলে তিলে ধ্বংস হয়ে যেতে দেখতে হচ্ছে?
​আজকের এই কোলাহলপূর্ণ বর্তমান সমাজের দিকে তাকালে অতীতের সেই স্নিগ্ধ দিনগুলোর কথা মনে করে চোখের কোণে জল জমে যায়। অতীতে আমাদের সমাজের মুরুব্বি ও গুণীজনরা পরবর্তী প্রজন্মের নৈতিকতা ও সুস্বাস্থ্যের প্রতি কতটাই না দায়িত্বশীল ছিলেন! একটু পেছনে ফিরে স্মৃতির পাতায় চোখ রাখলে মনে পড়ে, আগের মানুষ খাঁটি সরিষার তেল দিয়ে তরকারি রান্না করে পরম তৃপ্তিতে ভাত খেতেন। সেই খাঁটি সরিষার তেলের গুণের কারণে তখন মানুষের শরীরে আজকের মতো গ্যাস্ট্রিক বা নানাবিধ জঠরব্যাধির বালাই ছিল না, ফার্মেসির দরজায় দরজায় দৌড়ানোরও প্রয়োজন পড়ত না। অথচ বর্তমান যুগে সয়াবিন তেল ও ফরমালিনযুক্ত কৃত্রিম খাবার খেয়ে আমাদের প্রজন্মের শরীরে গ্যাস্ট্রিক ও ডায়াবেটিসের বাসা স্থায়ী হয়েছে, যার নিরাময়ে প্রতিনিয়ত ফার্মেসির চড়া মূল্যের ওষুধের ওপর নির্ভর করতে হয়। সরিষার তেলের সেই সরল দিনগুলোতে যেমন ছিল না এত রোগব্যাধি ও দুশ্চিন্তা, তেমনি চারদিকে ছিল না আজকের মতো গজিয়ে ওঠা ফার্মেসির ছড়াছড়ি ও বাণিজ্যের আগ্রাসন।
​বিষয়টি আরেকটু গভীরে নিয়ে গেলে সমাজের অবক্ষয়ের চিত্রটি আরও হৃদয়বিদারক হয়ে ওঠে। আমি যখন ছোটবেলায় গ্রামের ছোট্ট স্কুলে পড়াশোনা করতাম, তখন পড়াশেনায় কোনো ত্রুটি দেখলে শিক্ষকের হাতের বেতের মৃদু আঘাত পেতাম। পরদিন সেই পড়াটা শতভাগ মুখস্থ করে ক্লাসে হাজির হতাম, যাতে শিক্ষক আর গায়ে হাত তোলার সুযোগ না পান; আর সেই শাসনের মাঝেই লুকিয়ে থাকত ভবিষ্যতের এক সুদৃঢ় ভিত। আজ কোনো শিক্ষাঙ্গনে পড়াশোনার সামান্য ত্রুটির জন্য শিক্ষক শাসন করলে শিক্ষার্থীরা তা অভিভাবকদের ভুলভাবে বোঝাচ্ছে, আর অভিভাবকদের অতি-সংবেদনশীলতার কারণে শিক্ষকরা আজ লাঞ্ছিত ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। শিক্ষাঙ্গনের সেই পবিত্র ভীতি, শিক্ষককে পিতার আসনে বসানোর ঐতিহ্য এবং পরমসহিষ্ণু নৈতিকতার শিক্ষা আজ আধুনিকতার মোড়কে কোথায় হারিয়ে গেল? এই করুণ পতন দেখতে গিয়ে বুক ফেটে কান্না আসে।
​আরেকটু গভীরে প্রবেশ করলে দেখতে পাই আমাদের জন্মলগ্ন থেকেই ভাঙতে থাকা পারিবারিক কাঠামোর এক করুণ ও নিঃসঙ্গ চিত্র। আগে যখন ছেলেমেয়েদের পারিবারিকভাবে মুরুব্বিদের সম্মতিতে বিয়ে হতো, তখন নতুন বধূরা শাশুড়ি ও পরিবারকে নিজের আপন করে নিয়ে এক যৌথ সংসারে সাংসারিক মায়ায় ব্যস্ত থাকত। তারা নিজেদের একক ফ্যামিলি ভাবার চেয়ে যৌথ পরিবারের বিশাল মায়াটাকে অনেক বড় মনে করত। কিন্তু বর্তমান সমাজে ছেলেমেয়েরা হঠকারিতায় নিজেদের পছন্দমতো বিয়ে করে ফেলছে। অনেক সময় মা-বাবা তা মেনে নেন, আবার অনেকে সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক চাপে মেনে নিতে পারেন না; যার ফলে শুরুতেই একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত হয় তরুণ-তরুণী দম্পতিরা। বর্তমানে ছেলেমেয়েরা বিয়ের পরপরই সামান্য অজুহাতে আলাদা হয়ে যাওয়ার প্রবণতা দেখাচ্ছে, যার সরাসরি ও নিষ্ঠুর আঘাত এসে পড়ছে একটি সুখী ও সংহত পরিবারের ওপর, ডেকে আনছে অকাল পারিবারিক ভাঙন। আজকের এই ভাঙন আমাদের চোখের সামনেই আমাদের শেকড়গুলোকে সমূলে উপড়ে ফেলছে।
​প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও প্রজাতন্ত্রের সেবক: আমাদের কাঠামগত ভাবনা
​একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রশাসনিক মেরুদণ্ড হলো বাংলাদেশ সচিবালয়। দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে মাননীয় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী মহোদয়গণ নিযুক্ত থেকে নীতি নির্ধারণ করেন এবং তাদের অধিনস্তে সম্মানিত সচিব মহোদয়গণ প্রতিটি স্তরে ও জায়গায় নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করেন। তাদেরই নির্দেশনায় মাঠপর্যায়ে বিভাগ, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন প্রশাসনিক শাখা জনসেবায় নিয়োজিত থাকে।
​কিন্তু গভীর বেদনা ও অশ্রুসিক্ত নয়নে লক্ষ্য করতে হয় যে, এই বিশাল প্রশাসনিক ব্যবস্থার প্রতিটি কর্মী ও কর্মকর্তার বেতন-ভাতা নির্বাহ হয় এ দেশের সাধারণ মেহনতি মানুষের কষ্টের আয়ের ট্যাক্সের টাকায়। প্রজাতন্ত্রের এই কর্মচারীরা জনগণের সেবক হিসেবে নিজেদের নিয়োজিত রাখার কথা থাকলেও, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ সেবা নিতে গিয়ে নানামুখী হয়রানি বা ঘুষের অনৈতিক দাবির সম্মুখীন হন—যা বিভিন্ন দায়িত্বশীল গণমাধ্যমের সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানেও মাঝেমধ্যে প্রকাশ পায়। জনগণের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রযন্ত্রে সেবা পেতে গিয়ে যদি খোদ জনগণকেই এ ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়, তবে তা রাষ্ট্রের মূল চেতনার সাথে এক ধরনের বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। প্রশাসনকে প্রকৃত অর্থে জনকল্যাণমুখী করতে হলে ক্ষমতার অহংকার ভুলে সেবার মানসিকতাকেই সবার ওপরে স্থান দিতে হবে।
​প্রবাসের সোনালী রোদ ও শেকড়বিচ্ছিন্নতার অন্তর্দাহ
​যেহেতু এই মাটির প্রতিটি ধূলিকণার সাথে আমাদের অস্তিত্ব জড়িত, তাই দেশকে হৃদয়ে ধারণ করে প্রবাসের মাটিতে কঠোর শ্রম দিয়ে যাওয়া আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের অবদান কোনোভাবেই অস্বীকার করা যায় না। তাদের পাঠানো বৈদেশিক মুদ্রা ও পরিশোধিত ট্যাক্সের বিশাল অংশই আজ সরকারের রাজস্ব আয়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে অর্থনীতিকে সচল রেখেছে। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্য, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা মিশনগুলোতে সেবা নিতে গিয়ে আমাদের রেমিট্যান্স যোদ্ধারা প্রায়ই চরম অবহেলা ও দীর্ঘসূত্রিতার শিকার হন বলে গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ পায়। ঘামঝরা পরিশ্রমে দেশ সমৃদ্ধকারী এই মানুষগুলো যদি প্রবাসে নিজ দেশের কূটনৈতিক কার্যালয় থেকেই প্রয়োজনীয় সেবা ও সম্মান না পান, তবে তা আমাদের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতারই এক করুণ বহিঃপ্রকাশ।
​এর পাশাপাশি, প্রবাসজীবনের চিত্র আরও এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হচ্ছে। অতীতে প্রবাসে যাওয়ার পর পারিবারিক বন্ধন ও যৌথ পরিবারের মায়ায় মানুষ নিজ শেকড়ের সাথে যুক্ত থাকত। কিন্তু বর্তমান যুগে অনেক তরুণ বা দম্পতি প্রবাসে বা দেশে পা রাখার পরই যৌথ পরিবারের বিশাল আশ্রয়ের মায়া ত্যাগ করে হঠকারিতায় একক পরিবার বা 'নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি'-র আধুনিক মোড়কে অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন। এই অতি-ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও মানসিক দূরত্বের ভয়াবহ দাবানল ধীরে ধীরে সমাজে পরকীয়া ও পারিবারিক বিশ্বাসের অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে। যৌথ পরিবারের মায়াময়ী ছায়া এবং পারস্পরিক দায়বদ্ধতা হারিয়ে যাওয়ার ফলেই আজ আমাদের পারিবারিক ও সামাজিক কাঠামোর এই নিদারুণ ভাঙন দেখা দিয়েছে।
​উপসংহার ও আকুতি
​এই ভাঙা ধারণা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা ও বিচ্ছিন্নতা যখন পরবর্তী প্রজন্মের কোমল মনে স্থান করে নিচ্ছে, তখন বর্তমান এই ডিজিটাল যুগে তারা হতাশা থেকে অবৈধ পন্থার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। ফলশ্রুতিতে আজ আমাদের সমাজে নারী নির্যাতন, মাদকের ভয়াবহ বিস্তার, ছিনতাই এবং নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড দাবানলের মতো বেড়েই চলেছে। অথচ পৃথিবীর ইতিহাস বলে, যে জাতি তার পরিবার ও শেকড়কে হারিয়ে ফেলে, সে জাতি নৈতিকতার মানদণ্ডে দেউলিয়া হয়ে যায়।
​আজকের এই অবক্ষয়ের বহুমুখী ছায়া কেবল আমাদের পারিবারিক জীবন বা সমাজেই সীমাবদ্ধ নয়, এর ডালপালা বিস্তার লাভ করেছে আমাদের জন্ম ও প্রজনন স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও গ্রাস করে। চিকিৎসা বিজ্ঞান ও পরিসংখ্যানের দিকে তাকাইলে বুক কেঁপে ওঠে এবং চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে, যখন এক ভয়ংকর সত্য আমাদের সামনে উন্মোচিত হয়। পৃথিবীর উন্নত রাষ্ট্রগুলোতে মায়েদের স্বাভাবিক প্রসব বা নরমাল ডেলিভারির হার শতকরা হিসেবে অনেক বেশি এবং সিজারিয়ান অপারেশনের সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত, কারণ সেখানে চিকিৎসকরা ও সমাজব্যবস্থা মায়ের প্রাকৃতিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে সর্বাগ্রে স্থান দেয়। অথচ অত্যন্ত দুঃখ ও উদ্বেগের সাথে লক্ষ্য করছি যে, আমাদের বাংলাদেশে দিন দিন ক্রমান্বয়ে সিজারের সংখ্যা মহামারীর মতো বৃদ্ধি পাচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় ও বাণিজ্যিক মানসিকতা নিয়ে পরিচালিত সিজারিয়ান অপারেশনের কারণে একদিকে যেমন সদ্যোজাত শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে মায়েরা সম্মুখীন হচ্ছেন দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক জটিলতার। যে মাতৃত্বের পবিত্রতা ও প্রাকৃতিক সুষমা একসময় আমাদের সমাজে স্বাভাবিক নিয়মে অটুট ছিল, তা আজ কতিপয় চিকিৎসা ব্যবসায়ীর খপ্পরে পড়ে যান্ত্রিক ও কৃত্রিম হয়ে উঠেছে। শেকড়বিচ্ছিন্ন আধুনিকতা কীভাবে আমাদের জন্মপ্রক্রিয়াকেও বাণিজ্যে পরিণত করেছে, এটি তারই এক মর্মান্তিক প্রমাণ।
​এমতাবস্থায় বুকভাঙ্গা কষ্ট আর চোখের জল সংবরণ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ মহলের কাছে আমার বিনীত প্রশ্ন—আমরা কি ধীরে ধীরে আমাদের সেই হারানো সোনালী সমাজব্যবস্থায় ও মায়ের আঁচলের ছায়ায় ফিরে যেতে পারব না? ছোটবেলায় আমাদের মন সবসময় খোলা মাঠে খেলাধুলায় মনোযোগী ছিল, আর মা-বাবা সহ পরিবারের প্রতিটি সদস্যের প্রতি ছিল এক অদৃশ্য অথচ গভীর আত্মিক টান। পরিবারের মুরুব্বি ও বড়দের প্রতি ছিল আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভয়মিশ্রিত ভক্তি, আর ছোটদের প্রতি ছিল বুকভরা স্নেহ ও মায়া। সেই পারিবারিক সৌহার্দ্য, সান্ধ্যকালীন রূপকথার গল্প আর মুরুব্বিদের আশির্বাদপুষ্ট মায়াময়ী পরিবেশ আজ যান্ত্রিকতার করাল গ্রাসে হারিয়ে যেতে বসেছে।
​একটু গভীরে ভাবলে সত্যি অবাক লাগে—আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আরও কত রাষ্ট্র স্বাধীন হয়েছে, আর তারা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও মানবসম্পদে আজ পৃথিবীর কত উঁচুতে গিয়ে পৌঁছেছে! আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তারা কীভাবে এত দূরে এগিয়ে গেল? পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো মানবসম্পদ। পরিসংখ্যান বলে, আমাদের দেশে জনশক্তি বা মানবসম্পদের কোনো ঘাটতি নেই; বরং এটিই আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি। অথচ মেধা পাচার, সঠিক পরিচর্যার অভাব এবং সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে কেন আমাদের প্রিয় রাষ্ট্রটি সেই কাঙ্ক্ষিত উন্নয়নের শিখরে পৌঁছতে বারবার হোঁচট খাচ্ছে?
​রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারক, প্রশাসনিক অভিভাবক ও সচেতন মহলের প্রতি আমার একান্ত নিবেদন, মাদকের ভয়াল অভিশাপ থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে, সিজারের বাণিজ্য রোধ করে মাতৃস্বাস্থ্য রক্ষা করতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে এবং সামাজিক অবক্ষয় চিরতরে দূর করতে আসুন আমরা সবাই যার যার অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল হই। কোনো একটি পরিবার থেকে যেন আর কোনো মাদকসেবী, মাদক বিক্রেতা বা শেকড়হারা সন্তান তৈরি না হয়। আমার এই না বলা কথাগুলো ও লেখাটি পড়ে যদি একজন মানুষও সচেতন হয়ে অপরাধের জগত ছেড়ে তার মায়ের সুশীতল কোলে, পরিবারের নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে আসে, তবেই আমাদের এই সাংবাদিক জীবনের প্রকৃত সার্থকতা আসবে। রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সার্বিক মঙ্গলেই আমাদের সবার চূড়ান্ত মুক্তি।

লেখকঃ সাংবাদিক,


এ জাতীয় আরো খবর