বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১, ২০২৬

মাতারবাড়ীর উন্নয়নের নেপথ্যের কিংবদন্তি ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরী,

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৯-৩০ ১৫:১৭:৪৫

মহেশখালী (কক্সবাজার)
একসময়কার দুর্গম,নদী-বেষ্টিত ও যোগাযোগে পিছিয়ে থাকা  মাতারবাড়ী  আজ  আর  সেই মাতারবাড়ী নেই। সময়ের  পরিক্রমায়  বদলে  গেছে  জনপদটির চেহারা। দেশের  বৃহৎ  বিদ্যুৎ  ও  অবকাঠামো  উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে   আন্তর্জাতিক  পরিসরেও   পরিচিতি  পেয়েছে মহেশখালীর  এই   দ্বীপাঞ্চল।   কিন্তু   বর্তমানের   এই দৃশ্যপটের বহু আগে, যখন  মাতারবাড়ী  ছিল একান্তই গ্রামীণ  জনপদ, তখনই   শিক্ষা, যোগাযোগ, বাজার ও জনসেবার  অবকাঠামো  গড়ে  তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেছিলেন কিছু দূরদর্শী মানুষ।
তাঁদের  অন্যতম  ছিলেন  মরহুম  আলহাজ্ব  ছিদ্দীক আহমদ  চৌধুরী  মাতারবাড়ীর  মানুষের  কাছে যিনি পরিচিত  ছিলেন  স্নেহ  ও শ্রদ্ধার  নাম ‘ছিদ্দীক মিয়া’ হিসেবে।  স্থানীয়  প্রবীণদের  স্মৃতিচারণে উঠে আসে, তিনি শুধু একজন জনপ্রতিনিধি ছিলেন না;জনপদের দীর্ঘমেয়াদি   উন্নয়ন  নিয়ে   ভাবতেন  এমন  একজন সমাজহিতৈষী ও দানশীল ব্যক্তিত্ব ছিলেন। তাঁর সময়ে নেওয়া  বিভিন্ন  উদ্যোগ  পরবর্তী সময়ে মাতারবাড়ীর শিক্ষা,  যোগাযোগ  ও  সামাজিক অবকাঠামো গঠনে ভূমিকা রাখে বলে স্থানীয়দের দাবি।
প্রত্যন্ত জনপদথেকে সম্ভাবনার মাতারবাড়ী,কক্সবাজার জেলার   মহেশখালী   উপজেলার   মাতারবাড়ী  এখন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের আলোচনায়  গুরুত্বপূর্ণ একটি নাম। গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ প্রকল্পসহ বৃহৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের কারণে বদলে গেছে এ অঞ্চলের পরিচিতি  ও  গুরুত্ব। তবে উন্নয়নের এই নতুন অধ্যায়ের আগে মাতারবাড়ীর মানুষেরজীবন ছিল  অনেকটাই   নির্ভরশীল  স্থানীয়   কৃষি, লবণচাষ, মৎস্য  ও  নৌ-যোগাযোগের  ওপর। শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবার সুযোগ ছিল সীমিত।  যোগাযোগব্যবস্থার। দুর্বল তার  কারণে  সাধারণ  মানুষের  চলাচলেও  ছিল নানা প্রতিবন্ধকতা।  এই বাস্তবতায়  যাঁরা জনপদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তা করেছিলেন,তাঁদের একজন ছিলেন ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরী।
সম্ভ্রান্ত  পরিবারে   জন্ম, মরহুম   আলহাজ্ব  ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরী ১৯১৮ সালে মাতারবাড়ী ইউনিয়নের সিকদারপাড়া  গ্রামে  এক  সম্ভ্রান্ত  মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ    করেন।  তাঁর   পিতা   মরহুম  আলহাজ্ব ফয়জুল্লাহ  সিকদার (মাতব্বর)  ছিলেন  প্রতিষ্ঠিত ও জনদরদী  সমাজসেবক।  স্থানীয়দের  ভাষ্য অনুযায়ী, মানুষের পাশে দাঁড়ানো, সমাজের  প্রয়োজনে এগিয়ে আসা এবং জনকল্যাণকে গুরুত্ব দেওয়ার মানসিকতা তিনি পিতার কাছ থেকেই পেয়েছিলেন।পরবর্তী সময়ে নিজের  কর্মের মধ্য দিয়ে সেই ধারাকেই আরও বিস্তৃত করেন ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরী।
একদশক ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান,জনপ্রতিনিধি হিসেবে   তাঁর    রাজনৈতিক   ও  সামাজিক  নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ   অধ্যায়   শুরু   হয় ১৯৫২ সালে। ওই বছর তিনি   মাতারবাড়ী  ইউনিয়ন  পরিষদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব   গ্রহণ   করেন  এবং ১৯৬২  সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন    করেন।   স্বাধীনতার   পরও   তিনি  দুই  দফা মাতারবাড়ী  ইউনিয়ন  পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন   বলে   স্থানীয়  সূত্রে জানা  যায়। পাশাপাশি তিনি চট্টগ্রাম   জেলা   পরিষদের   সদস্য  হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।  দীর্ঘ সময়  জনপ্রতিনিধিত্ব করার ফলে এলাকার  মানুষের  সঙ্গে  তাঁর নিবিড় যোগাযোগ গড়ে ওঠে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এলাকার রাস্তা, শিক্ষা, বাজার ও  বিভিন্ন  জনসেবামূলক  প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা তিনি সরাসরি মানুষের কাছ থেকেই উপলব্ধি করতেন।
শিক্ষার  আলো  ছড়ানোর  উদ্যোগ, একটি জনপদকে এগিয়ে  নিতে  শিক্ষা  যে সবচেয়ে  গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি এ উপলব্ধি   ছিদ্দীক  আহমদ  চৌধুরীর  কর্মকাণ্ডে প্রতি ফলিত   হয়েছিল    বলে    স্থানীয়রা   মনে    করেন।
মাতারবাড়ীতে   শিক্ষা   বিস্তারে  তাঁর অবদানের সঙ্গে মাতারবাড়ী   ইসলামিয়া  আজিজিয়া কাসেমুল উলুম মাদ্রাসা, মাতারবাড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং মাতারবাড়ী  উচ্চ  বিদ্যালয়ের  নাম  উল্লেখ  করা হয়।
তৎকালীন   বাস্তবতায়   একটি  প্রত্যন্ত  অঞ্চলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিস্তার সহজ কাজ ছিল না।অর্থনৈতিক ও যোগাযোগগত  সীমাবদ্ধতার  মধ্যেও  শিক্ষার  সুযোগ সম্প্রসারণে তাঁর ভূমিকা স্থানীয় ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে আছে।  আজ   মাতারবাড়ীর   অসংখ্য  মানুষ   বিভিন্ন পেশায়  প্রতিষ্ঠিত।  তাঁদের   অনেকের  শিক্ষাজীবনের সূচনাস্থল  স্থানীয় এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষার অবকাঠামো  গড়ে  তোলার  সেই   সময়ের উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি   সামাজিক   প্রভাব  রয়েছে  বলেও  মনে করেন স্থানীয়রা।
জনসেবার প্রতিষ্ঠান গড়ায় ভূমিকা, শিক্ষার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনের বিষয়টিও তাঁর কর্মকাণ্ডে  গুরুত্ব  পেয়েছিল। স্থানীয়দের  দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পরিবার  কল্যাণ   কেন্দ্র, মাতারবাড়ী  নতুন বাজার,তৎকালীন পূবালী ব্যাংক বর্তমানে কৃষি ব্যাংক এবং  টেলিযোগাযোগ  ব্যবস্থার  টি অ্যান্ড টি স্থাপনের ক্ষেত্রেও তাঁর উদ্যোগ ও ভূমিকা ছিল। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার  মধ্য দিয়ে শুধু একটি বাজার বা সেবা কেন্দ্র তৈরি হয়নি;বরং প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের সঙ্গে বৃহত্তর প্রশাসনিক,আর্থিক ও সামাজিক ব্যবস্থার যোগাযোগও বাড়তে শুরু করে।
যোগাযোগব্যবস্থায়   ছিল   দীর্ঘমেয়াদি  চিন্তা, ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরীর সবচেয়ে বেশি আলোচিত অবদানের একটি ছিল যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন। মাতারবাড়ী ও ধলঘাটার   মানুষের   যাতায়াত  সহজ  করতে  সড়ক নির্মাণের   উদ্যোগ   নেওয়ার   কথা   এখনও  স্থানীয় প্রবীণদের মুখে শোনা যায়।  বিশেষ  করে মাতারবাড়ী নতুন  বাজার  থেকে  পূর্বদিকে  কোহেলিয়া  নদী হয়ে উত্তর রাজঘাট পর্যন্ত সড়ক নির্মাণের উদ্যোগকে তাঁরা তাঁর  দূরদর্শী  কর্মকাণ্ডের  অন্যতম  উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ   করেন।  স্থানীয়    প্রবীণদের     কয়েকজনের স্মৃতিচারণ অনুযায়ী,  ওই সড়ক নির্মাণের সময় তাঁকে বিরোধিতা ও বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। এমনকি এক পর্যায়ে স্থানীয় কিছু মানুষের হামলায় তিনি আহত ও   রক্তাক্ত   হয়েছিলেন   এমন   বর্ণনাও  স্থানীয়ভাবে প্রচলিত। স্থানীয় স্মৃতিতে ঘটনাটি যেভাবে টিকে আছে, তা থেকে অন্তত বোঝা যায় জনপদের অবকাঠামোগত পরিবর্তনের উদ্যোগ সবসময় যে বাধাহীন ছিল না,সেই অভিজ্ঞতাও  ছিদ্দীক  আহমদ  চৌধুরীর  কর্মজীবনের সঙ্গে   যুক্ত। বাধা  তাঁকে  থামাতে   পারেনি, জনস্বার্থে নেওয়া উদ্যোগ বাস্তবায়নে  প্রতিবন্ধকতা এলেও তিনি পিছিয়ে যাননি  এমনটাই মনে  করেন স্থানীয় প্রবীণরা।
তাঁর  সময়ের  মাতারবাড়ী  এবং বর্তমান মাতারবাড়ীর মধ্যে পার্থক্য বিশাল। আজ যে সড়ক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার   ও   সেবাব্যবস্থাকে  স্বাভাবিক  বলে মনে হয়, সেগুলোর    অনেক   কিছুর   সূচনা  হয়েছিল  সীমিত সুযোগ-সুবিধার  সময়।  এই কারণেই  স্থানীয় মানুষের কাছে তাঁর অবদান শুধু অতীতের কোনো রাজনৈতিক ইতিহাস    নয়;   বরং   একটি   জনপদের  সামাজিক পরিবর্তনের  সঙ্গে যুক্ত একটি অধ্যায়। জনপ্রতিনিধিত্ব ছিল   মানুষের   কাছাকাছি   থাকার   মাধ্যম, ছিদ্দীক আহমদ   চৌধুরীর   নেতৃত্বের   আরেকটি   দিক  ছিল সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক।
স্থানীয়দের   বর্ণনায়, তিনি   মানুষের  সমস্যাকে কাছ থেকে   দেখতেন   এবং   সমাধানে   উদ্যোগী  হতেন। জনপ্রতিনিধিত্বকে  তিনি  কেবল  আনুষ্ঠানিক  দায়িত্ব হিসেবে   না   দেখে   সামাজিক  দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন   এমন   স্মৃতিই   প্রবীণদের  কাছ  থেকে  পাওয়া যায়। দানশীলতা ও সমাজসেবার কারণে তাঁর আলাদা পরিচিতিও তৈরি হয়েছিল।তাঁর কাছে সাহায্য চাইতে   আসা  মানুষকে  সাধ্য  অনুযায়ী  সহযোগিতা করার নানা স্মৃতিচারণ এখনও স্থানীয়দের মুখে শোনা যায়।
পারিবারিকভাবেও জনসেবার ঐতিহ্য,ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরীর পরিবারও স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দীর্ঘদিন যুক্ত ছিল।  তাঁর   সহোদর   ভাই   মরহুম  আবুল  হোসাইন চৌধুরীও তৎকালীন ধলঘাটাসহ মাতারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের   চেয়ারম্যানের  দায়িত্ব  পালন করেছিলেন।
ফলে   একটি   সময়  মাতারবাড়ীর স্থানীয় প্রশাসন ও জনসেবামূলক   নেতৃত্বে    এই   পরিবারের  গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল।
সময় বদলেছে, স্মৃতি বদলায়নি,আজকের মাতারবাড়ী বড়বড় উন্নয়নপ্রকল্পের কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক ভাবে আলোচিত।   কিন্তু   প্রবীণ  প্রজন্মের  কাছে এই মাতারবাড়ীর আরেকটি ইতিহাস রয়েছে যে ইতিহাসের সঙ্গে  জড়িয়ে  আছে  স্থানীয়  মানুষের জন্য জীবনভর কাজ করা কিছু মানুষের নাম। সেই তালিকায় ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরীর নাম বিশেষভাবে উচ্চারিত হয়।কারও কাছে  তিনি  চেয়ারম্যান, কারও কাছে দানবীর, কারও কাছে   সমাজসংস্কারক।   তবে    সবচেয়ে   বেশি  যে পরিচয়টি  স্থানীয়  মানুষের  স্মৃতিতে  টিকে আছে, তা হলো  মানুষের  জন্য  কাজ করা একজন আপনজন।
২০০৩ সালে প্রয়াণ, দীর্ঘ কর্মময় জীবন শেষে মরহুম আলহাজ্ব ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরী ২০০৩ সালের ১০ জুলাই  ইন্তেকাল  করেন।  তাঁর  মৃত্যুর দুই দশকেরও বেশি   সময়    পেরিয়ে     গেছে।    প্রজন্ম বদলেছে। মাতারবাড়ীর ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব বদলে গেছে। বদলে  গেছে  মানুষের জীবনযাত্রাও। কিন্তু তাঁর নাম এখনও উচ্চারিত হয় শ্রদ্ধার সঙ্গে। কারণ মানুষের জীবন  থেকে  মানুষ  চলে  গেলেও মানুষের জন্য করা কাজ   থেকে  যায়।  ইতিহাসের  পাতায়  থাকুক  তাঁর অবদান,একটি জনপদের উন্নয়ন কখনো একদিনে ঘটে না।  এর পেছনে থাকে বহু প্রজন্মের মানুষের শ্রম, স্বপ্ন, উদ্যোগ ও আত্মত্যাগ। মাতারবাড়ীর বর্তমান উন্নয়ন ও পরিবর্তনের   পেছনেও  রয়েছে   বহু মানুষের অবদান। তাঁদের   মধ্যে   যাঁরা  উন্নয়নের প্রাথমিক ভিত্তি নির্মাণে কাজ   করেছেন,  তাঁদের  স্মরণ  করা স্থানীয় ইতিহাস সংরক্ষণেরও অংশ। মরহুম আলহাজ্ব ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরী   ছিলেন  সেই  প্রজন্মের একজন, যিনি প্রত্যন্ত মাতারবাড়ীর  সীমাবদ্ধতার  মধ্যেও শিক্ষা, যোগাযোগ, বাজার   ও    জনসেবার     প্রয়োজনীয়তা    উপলব্ধি করেছিলেন।  আজ মাতারবাড়ী যখন দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ  উন্নয়ন অঞ্চলে  পরিণত হয়েছে, তখন সেই পুরোনো  দিনের সমাজসেবকদের অবদান নতুন করে স্মরণ করার সময় এসেছে।তাঁদের রেখে যাওয়া শিক্ষা একটাই   একজন   দূরদর্শী  মানুষের স্বপ্ন কখনো শুধু তাঁর  নিজের  সময়ের  জন্য  হয় না; তার সুফল ভোগ করে পরবর্তী প্রজন্মও।
মরহুম  আলহাজ্ব  ছিদ্দীক আহমদ চৌধুরীর কর্ম ও স্মৃতি মাতারবাড়ীর ইতিহাসে তেমনই একটি অধ্যায় হয়ে থাকুক।মহান আল্লাহ তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।


এ জাতীয় আরো খবর