বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২৬

মহেশখালীর সড়কে অপ্রাপ্তবয়স্ক টমটমচালকের দাপট,একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৯-২৩ ২২:৩৪:৪৬
প্রতীকী ছবি

 নেই বয়স-লাইসেন্স যাচাইয়ের,নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন!
মহেশখালী (কক্সবাজার)
মহেশখালী উপজেলার  সাধারণ  মানুষের নিত্যদিনের যাতায়াতের অন্যতম প্রধানবাহন ব্যাটারিচালিতটমটম। অন্যদিকে  এই  যানই  পরিণত হচ্ছে সড়কে আতঙ্কের কারণ  হিসেবে।  ব্যস্ত   সড়ক,  বাজার, স্কুলের সামনে কিংবা  গ্রামীণ জনপদের  সরু পথে বেপরোয়া গতিতে ছুটছে টমটম। অনেক। ক্ষেত্রে স্টিয়ারিংয়ে দেখা যাচ্ছে কিশোরদেরও।  তাদের  অনেকের  বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হয়েছে   কি না, বৈধ   ড্রাইভিং  লাইসেন্স আছে কি না, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ রয়েছে কি না এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে  গেলে  সামনে  আসে  তদারকির বড় ঘাটতির অভিযোগ। সাম্প্রতিক কয়েকটি দুর্ঘটনা সেই উদ্বেগকে আরও গভীর করেছে।  গত ২২  সেপ্টেম্বর  মহেশখালী উপজেলার  বড়  মহেশখালী  জাগিরাঘোনা  এলাকার প্রধান   সড়কে   টমটম  ও   মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে মোহাম্মদ   ফয়সাল  (৩০)  নামে  এক প্রবাসী যুবকের মৃত্যু  হয়েছে, দুর্ঘটনায়  আরও  কয়েকজন  আহত হন।
এর  আগে ১২  জানুয়ারি  শাপলাপুর-ছোট মহেশখালী সড়কে   টমটমের   ধাক্কায়  পাঁচ  বছরের শিশু মিনহার মৃত্যু হয়।  মাত্র  এক  মাসের   ব্যবধানে  ১৪ ফেব্রুয়ারি কালারমারছড়া  মাছবাজার এলাকায় টমটমের ধাক্কায় আট বছরের এক কিশোরীর মৃত্যু,  এরও  আগে ২০২৫ সালের   ৮ সেপ্টেম্বর   ছোট   মহেশখালীর   লম্বাঘোনা বাজারে টমটম  ও  মিশুকের সংঘর্ষে ছয় বছরের শিশু ইমরান হোসেন নিহত এবং দুজন আহত হন।
ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবে দেখলে হয়তো দায়   শেষ হয়  একটি  মামলা বা একটি জরিমানায়। কিন্তু   ধারাবাহিকভাবে  একই  ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে থাকলে প্রশ্ন ওঠে  মহেশখালীর সড়কে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমাতে   আসলে  কী  ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? টমটমের স্টিয়ারিংয়ে কারা বসছে?তাদের বয়স কত?লাইসেন্স আছে  কি না?  যানবাহনগুলো কতটা নিরাপদ? আর এসব   দেখার  দায়িত্ব   যাদের, তারা   কতটা সক্রিয়?
স্টিয়ারিংয়ে  কিশোর, যাত্রীবাহী  টমটমে ঝুঁকির যাত্রা
মহেশখালীর   বিভিন্ন   ইউনিয়ন  ও বাজার এলাকায় টমটম  এখন  স্থানীয়   যোগাযোগব্যবস্থার  গুরুত্বপূর্ণ অংশ।   স্বল্প দূরত্বে  দ্রুত  যাতায়াতের  জন্য  সাধারণ মানুষও  এ যানবাহনের  ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যাত্রী পরিবহনের  মতো  দায়িত্বশীল   কাজে চালকের বয়স, প্রশিক্ষণ  ও  দক্ষতা  অত্যন্ত   গুরুত্বপূর্ণ। অপ্রাপ্তবয়স্ক কিংবা   অনভিজ্ঞ   কেউ  যদি  যাত্রীবাহী  যান চালায়, তাহলে  সামান্য  ভুলও  ভয়াবহ  দুর্ঘটনার  কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের  সড়ক  পরিবহণ আইন,২০১৮ অনুযায়ী ড্রাইভিং  লাইসেন্স  ছাড়া  পাবলিক  প্লেসে মোটরযান চালানো বা  চালানোর অনুমতি দেওয়া নিষিদ্ধ। একই আইনে অপেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স  ১৮ বছর  এবং   পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ন্যূনতম বয়স ২১বছর নির্ধারণকরা হয়েছে।আইন লঙ্ঘনের  জন্য  শাস্তির বিধানও রয়েছে। আইনটির ৬৬ ধারায় ধারা ৪ ও ৫-এর বিধান লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয়  মাসের   কারাদণ্ড   বা   সর্বোচ্চ  ২৫ হাজার টাকা জরিমানা, অথবা  উভয়   দণ্ডের  বিধান  রাখা হয়েছে।
তাহলে   প্রশ্ন   মহেশখালীর   সড়কে   নিয়মিত  টমটম চালানো  চালকদের  বয়স  ও  লাইসেন্স কতটা যাচাই করা হচ্ছে?
দুর্ঘটনার পরিসংখ্যান কোথায়? 
মহেশখালীতে টমটম-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা নিয়ে স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ প্রকাশ হলেও উপজেলা বা থানা পর্যায়ে চালকের বয়স,লাইসেন্সের অবস্থা,যানবাহনের ফিটনেস এবং দুর্ঘটনার কারণভিত্তিক সমন্বিত কোনো প্রকাশ্য তথ্যভান্ডার নেই।ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তরও অস্পষ্ট  গত  এক বছরে মহেশখালীতে টমটম, ইজিবাইক,  মিশুক   বা    ব্যাটারিচালিত  তিন চাকার যানবাহনের   সঙ্গে   কতটি  দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং এতে কতজন নিহত বা আহত হয়েছেন?আর এসব দুর্ঘটনার কতটিতে চালক অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন?এই প্রশ্নের উত্তর ছাড়া   অপ্রাপ্তবয়স্ক   চালককে   এককভাবে দুর্ঘটনার প্রধান  কারণ  বলা  যেমন তথ্যগতভাবে দুর্বল, তেমনি বিষয়টির   প্রকৃত   চিত্রও   আড়ালে  থেকে যায়। তাই প্রয়োজন দুর্ঘটনার তথ্যকে বয়স,লাইসেন্স,যানবাহনের ধরন,  সড়কের   অবস্থা  ও   দুর্ঘটনার কারণ অনুযায়ী বিশ্লেষণ করা।
শুধু  চালক   নয়,  দায়ের   প্রশ্ন   মালিকেরও  একজন অপ্রাপ্তবয়স্কের  হাতে   যাত্রীবাহী   টমটমের  স্টিয়ারিং কীভাবে   যায়  এই প্রশ্নের  পাশাপাশি আরেকটি প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ: কে  তাকে  গাড়িটি চালাতে দিচ্ছেন? কারণ চালক অপ্রাপ্তবয়স্ক হলে শুধু ওই কিশোরকে আটক বা জরিমানা  করাই  যথেষ্ট কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। গাড়ির   মালিক   জানতেন   কি না,মালিকের অনুমতি ছিল কি না, নিয়মিত চালক  অনুপস্থিত থাকলে বিকল্প চালক   হিসেবে   কিশোরকে   বসানো  হয়েছিল কি না এসব   বিষয়ও   অনুসন্ধানের   দাবি    রাখে।।  আইনে লাইসেন্স  ছাড়া  গাড়ি  চালানোর পাশাপাশি চালানোর অনুমতি দেওয়ার বিষয়টিও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সড়কের  বেহাল  দশাও  বাড়াচ্ছে  ঝুঁকি, মহেশখালীর সড়ক   দুর্ঘটনার   পেছনে   শুধু   চালকের   বয়স  বা দক্ষতাকে  দেখলে  পুরো চিত্র পাওয়া যাবে না। বিভিন্ন সড়কের   খানাখন্দ,  সরু   অংশ,   বাজার   এলাকায় পথচারীর  চাপ, অপরিকল্পিত যানবাহন থামানো এবং পর্যাপ্ত   ট্রাফিক   নিয়ন্ত্রণের  অভাবও  দুর্ঘটনার  ঝুঁকি বাড়াতে পারে।  বিশেষ   করে   গ্রামীণ  সড়কে  টমটম, সিএনজি,মোটরসাইকেল, ইজিবাইক ও পথচারী একই জায়গা ব্যবহার করায় সামান্য ভুলেরও। বড় মূল্য দিতে হয়।   মহেশখালীর   সড়ক   নিরাপত্তা   নিয়ে  কার্যকর অনুসন্ধানের  জন্য  তিনটি বিষয় একসঙ্গে দেখতে হবে চালক, যানবাহন  এবং  সড়ক।  বাজার-স্কুলের সামনে সবচেয়ে   বেশি    ঝুঁকি  মহেশখালীর   বিভিন্ন  বাজার এলাকায় একইসঙ্গে থাকে পথচারী,শিক্ষার্থী,দোকানের ক্রেতা-বিক্রেতা  এবং  অসংখ্য   ছোট যানবাহন। এসব এলাকায়   গতি   নিয়ন্ত্রণ   না  থাকলে  দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।  বিশেষ করে শিশুদের চলাচলের পথে টমটমের গতি    নিয়ন্ত্রণ,   হর্ন   ব্যবহার,  যাত্রী   ওঠানামা  এবং
পার্কিংয়ের   বিষয়ে    নিয়ম    মানা   হচ্ছে।  কি না তা নজরদারির  দাবি   রাখে। একটি  পাঁচ   বছরের  শিশু কিংবা   আট   বছরের   কিশোরীর  মৃত্যু কেবল একটি পরিবারের   শোক   নয়;  এগুলো  সড়ক  ব্যবস্থাপনায় কোথায়   দুর্বলতা   রয়েছে,  সেই  প্রশ্নও সামনে আনে। মহেশখালীতে   এ ধরনের   একাধিক শিশুমৃত্যুর ঘটনা ইতোমধ্যে সংবাদে এসেছে।
আইন আছে,প্রয়োগ কতটা? সড়ক পরিবহণ আইন, ২০১৮-এ চালকের বয়স ও লাইসেন্সের বিষয়ে স্পষ্ট বিধান রয়েছে। সরকার ও কর্তৃপক্ষ জনস্বার্থে নির্দিষ্ট এলাকায়  মোটরযান  চলাচল  নিয়ন্ত্রণ  বা নিষিদ্ধও করতে  পারে।  কিন্তু   মাঠপর্যায়ে  নিয়মিত বয়স ও লাইসেন্স    যাচাই,   প্রশিক্ষণ    নিশ্চিতকরণ।।এবং মালিকদের   জবাবদিহির   ব্যবস্থা   কতটা কার্যকর সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।প্রশ্নটি কেবল প্রশাসনের প্রতি নয়;স্থানীয় জনপ্রতিনিধি,যানমালিক,চালক সংগঠন এবং  অভিভাবকদের  প্রতিও। কারণ। অপ্রাপ্তবয়স্ক একজন  কিশোরকে   টমটমের  স্টিয়ারিংয়ে বসতে দেওয়া হলে তার নিজের জীবন যেমন ঝুঁকিতে পড়ে, তেমনি   ঝুঁকিতে   পড়ে   একই  সড়ক ব্যবহারকারী অসংখ্য   মানুষের   জীবন।  প্রয়োজন ‘দুর্ঘটনার পর ব্যবস্থা’  নয়,‘দুর্ঘটনার আগে প্রতিরোধ’ মহেশখালীর সড়কে প্রাণহানি কমাতে কেবল দুর্ঘটনার পর মামলা কিংবা চালক  আটক  যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত 
ও তথ্যভিত্তিক নজরদারি। প্রথম  ধাপে উপজেলা ও থানা   পর্যায়ে   টমটমসহ  তিন   চাকার যানবাহনের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা তৈরি করা যেতে পারে।এরপর চালকের বয়স, লাইসেন্স, প্রশিক্ষণ এবং যানবাহনের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করা দরকার।
অপ্রাপ্তবয়স্ক চালক পাওয়া গেলে চালকের পাশাপাশি কে  তাকে  গাড়ি  চালানোর  সুযোগ দিয়েছেন সেটিও তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন।একই সঙ্গে দুর্ঘটনা প্রবণ  স্থানগুলো  চিহ্নিত  করে  সেখানে গতি নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক   সাইনবোর্ড, বাজার  ও স্কুল এলাকায় বিশেষ  নজরদারি এবং সড়কের প্রয়োজনীয় সংস্কার করতে হবে।
যে প্রশ্নগুলোর উত্তর চায় মহেশখালীর মানুষঃ-
১.মহেশখালীতে বর্তমানে কতটি টমটম চলাচল  
   করছে?
২.এসব যানবাহনের কতটির বৈধ কাগজপত্র রয়েছে?
৩. কতজন চালকের বৈধ লাইসেন্স রয়েছে?
৪. গত এক বছরে অপ্রাপ্তবয়স্ক চালকের বিরুদ্ধে  
    কতটি অভিযান পরিচালিত হয়েছে?
৫. টমটম-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনায় গত এক বছরে কতজন  
    নিহত ও আহত হয়েছেন?
৬. এসব দুর্ঘটনার কতটিতে চালকের বয়স ১৮ বছরের  
    নিচে ছিল?
৭. অপ্রাপ্তবয়স্ক চালককে গাড়ি চালানোর অনুমতি 
     দেওয়া মালিকদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া 
      হয়েছে?
৮. দুর্ঘটনাপ্রবণ সড়ক ও স্থানগুলো চিহ্নিত করে 
    প্রশাসন কী ব্যবস্থা নিয়েছে?এই প্রশ্নগুলোর উত্তর  
    পাওয়া গেলে মহেশখালীর সড়কে টমটমের প্রকৃত  
    ঝুঁকির চিত্র আরও স্পষ্ট হবে।
মহেশখালীর মানুষেরজন্য টমটম প্রয়োজনীয়।পরিবহন ব্যবস্থার অংশ  কিন্তু  প্রয়োজনীয়তার  অর্থ এই নয় যে নিরাপত্তার  প্রশ্নটি  উপেক্ষিত থাকবে। একটি টমটমের স্টিয়ারিংয়ে অপ্রাপ্তবয়স্ক হাত,বৈধ লাইসেন্সহীন চালক কিংবা অদক্ষ চালক যে কারণেই  হোক, তার সঙ্গে যদি দুর্বল   নজরদারি  ও  আইন প্রয়োগের ঘাটতি যুক্ত হয়, তাহলে  একটি  স্বাভাবিক  যাত্রাই  মুহূর্তে পরিণত হতে পারে মৃত্যুযাত্রায়।  সাম্প্রতিক   বছরগুলোর  একাধিক দুর্ঘটনা   অন্তত   একটি   বিষয়   স্পষ্ট   করে  দিয়েছে মহেশখালীর  সড়ক নিরাপত্তাকে আর কেবল দুর্ঘটনার পর  আলোচনার  বিষয়  হিসেবে  রাখার  সুযোগ নেই। এখন   প্রয়োজন   তথ্য    সংগ্রহ, কারণ   শনাক্তকরণ, নিয়মিত নজরদারি এবং আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ।
কারণ   প্রতিটি   দুর্ঘটনার   পর   একটি  পরিবার শুধু একজন    মানুষকে    হারায়     না;   হারায়   একজন
উপার্জনক্ষম   সদস্য,  একজন   সন্তান,  একজন বাবা অথবা একজন মাকে। সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায় তাই শুধু চালকের নয়, প্রশাসন, মালিক, চালক ও পুরো সমাজের।

 


এ জাতীয় আরো খবর