সোমবার, আগস্ট ৩, ২০২৬

'অন্ধকারের অদৃশ্য মানচিত্র'

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৮-০২ ২২:৩২:০৮

বন্ধুরা,আজ প্রকাশিত হল পর্ব-৪৭। গত পর্বে আমরা জেনেছিলাম বাদুড় আসলে পাখি নয়,স্তন্যপায়ী প্রাণী। আজ রাহি, অরণ ও শিসু আবিষ্কার করবে-অন্ধকারে চোখের চেয়েও বড় একটি শক্তি আছে,আর সেটিই বাদুড়কে রাতের আকাশের দক্ষ পথপ্রদর্শক বানায়।

রাহি ও অরণের সবুজ পৃথিবী
নতুন অধ্যায়: 'নিঃশব্দ পাহারাদার'
পর্ব-৪৭:

পরদিন সন্ধ্যায় আকাশে মেঘ ছিল না।
গ্রামের পুরোনো আমবাগানে আজ আবার হাজির হলো রাহি,অরণ আর শিসু।
তাদের সঙ্গে ছিলেন নাসির স্যারও।

শিসু আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল,
-'স্যার,এত অন্ধকারে বাদুড় গাছের সঙ্গে ধাক্কা খায় না কেন?'

নাসির স্যার মৃদু হেসে বললেন,
-'আজ তোমরা সেই রহস্যই জানবে।'

তিনি দুই হাত একবার জোরে তালি দিলেন।
শব্দটি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

স্যার বললেন,
-'ভাবো তো,যদি সেই শব্দ ফিরে এসে তোমাকে বলে দিত সামনে কী আছে?'

অরণ কৌতূহলী হয়ে বলল,
-'শব্দও কি পথ দেখাতে পারে?'

ঠিক তখনই বাতাসে বটপাতা মৃদু দুলে উঠল।
বটদাদুর কণ্ঠ ভেসে এল,
-'প্রকৃতির কাছে অসম্ভব বলে কিছু নেই।'

এমন সময় একটি বাদুড় খুব দ্রুত উড়ে এসে একটি ডালের পাশ ঘেঁষে ঘুরে গেল।
তারপর আরেকটি।
কিন্তু একবারও কোথাও ধাক্কা খেল না।

নাসির স্যার বললেন,
-'বাদুড় খুব সূক্ষ্ম শব্দ তৈরি করে। সেই শব্দ সামনে থাকা গাছ,ডাল বা অন্য বস্তুর গায়ে লেগে ফিরে আসে। ফিরে আসা সেই শব্দ শুনেই সে বুঝতে পারে সামনে কী আছে।'

শিসু বিস্ময়ে বলল,
-'মানে,ওরা শব্দ দিয়ে পথ দেখে!'

রাহি হাসল।
-'চোখের পাশাপাশি শব্দও ওদের বন্ধু।'

অরণ নোটবই খুলে লিখল,
'নতুন সূত্র-বাদুড় শব্দের প্রতিধ্বনি ব্যবহার করে পথ খুঁজে নেয়।'

ঠিক তখনই তারা দেখল,একটি বাদুড় উড়তে উড়তেই বাতাসে ভাসতে থাকা ছোট্ট একটি পোকা ধরে ফেলল।

শিসু অবাক হয়ে বলল,
-'এত ছোট পোকাও ও ধরতে পারে!'

নাসির স্যার মাথা নাড়লেন।
-'তাই তো অনেক ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা কমাতে বাদুড় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।'

বটদাদু বললেন,
-'যে প্রাণীকে মানুষ অকারণে ভয় পায়,সে-ই হয়তো প্রতিরাতে কৃষকের ফসল পাহারা দেয়।'

এমন সময় হালকা বাতাস বইতে শুরু করল।
জোনাকিরা একে একে জ্বলে উঠল।
চাঁদের আলো আর জোনাকির ক্ষীণ আলো মিলিয়ে আমবাগান যেন এক জাদুকরী দৃশ্যে ভরে উঠল।

রাহি মুগ্ধ হয়ে বলল,
-'রাত কখনো নিঃশব্দ নয়। শুধু তার ভাষা আলাদা।'

ফেরার সময় অরণ ডায়েরিতে লিখল,
'আজ আমরা শিখলাম, শুধু চোখ নয়, মন দিয়েও পৃথিবীকে দেখা যায়।'

বটদাদুর কণ্ঠ শেষবারের মতো ভেসে এল,
-'প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর একটি বিশেষ ক্ষমতা আছে। সেই ক্ষমতাকে সম্মান করতে শিখলেই মানুষ সত্যিকারের জ্ঞানী হয়।'

আকাশে তখন একটি বাদুড় নীরবে ডানা মেলে দূরের বনের দিকে উড়ে গেল।
আর তিন বন্ধুর মনে জন্ম নিল নতুন কৌতূহল-
সব বাদুড় কি একই রকম?
নাকি তাদের মধ্যেও আছে বিস্ময়কর বৈচিত্র্য?

আজকের সবুজ প্রতিজ্ঞাঃ
আমি প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীর গুরুত্ব বোঝার চেষ্টা করব এবং অকারণে কোনো বন্য প্রাণীকে বিরক্ত বা ক্ষতি করব না।

সবুজ তথ্যঃ
অনেক বাদুড় অন্ধ নয়। তাদের চোখও কাজ করে। তবে রাতের অন্ধকারে পথ খুঁজতে এবং ছোট পোকামাকড় শনাক্ত করতে তারা প্রতিধ্বনির সাহায্য নেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা ব্যবহার করে। এ কারণেই তারা অন্ধকারেও অত্যন্ত দক্ষভাবে উড়তে পারে।

বন্ধুরা,আমাদের পরের পর্বে রাহি,অরণ ও শিসু জানতে পারবে,বাদুড় শুধু পোকা খায় না। কিছু বাদুড় রাতের আঁধারে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়ায়,মধু পান করে এবং অজান্তেই এক ফুলের পরাগ অন্য ফুলে পৌঁছে দেয়। তারা আবিষ্কার করবে,রাতের বেলাতেও প্রকৃতির একটি অদৃশ্য বাগান পরিচর্যা চলে,আর সেই বাগানের সবচেয়ে পরিশ্রমী মালীদের একজন হলো বাদুড়।


এ জাতীয় আরো খবর