শনিবার, আগস্ট ১, ২০২৬

মহেশখালী:সম্ভাবনার দ্বীপ থেকে কৌশলগত অর্থনৈতিক হাবে উত্তরণের গল্প,কতটা বদলেছে মানুষের জীবন?

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-০৭-৩১ ২১:৩০:৫৩

মহেশখালী (কক্সবাজার)
একসময় বাংলাদেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন, লবণচাষ, মৎস্য আহরণ, পান চাষ ও কৃষিনির্ভর একটি দ্বীপ ছিল মহেশখালী। আজ সেই মহেশখালী দেশের সবচেয়ে আলোচিত উন্নয়নাঞ্চলগুলোর একটি। বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল, আধুনিক সড়ক যোগাযোগ এবং শিল্পভিত্তিক নতুন নগরায়ণের স্বপ্ন।
রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনায় মহেশখালী এখন শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক অর্থনীতি (ব্লু ইকোনমি), আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক সংযোগের অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্র।
প্রশ্ন হলো এই বিশাল উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর প্রভাব স্থানীয় মানুষের জীবনে কতটা পড়েছে?
উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে মহেশখালী
গত এক দশকে মহেশখালী ও মাতারবাড়ী এলাকায় বিদ্যুৎ, বন্দর, জ্বালানি ও যোগাযোগ খাতে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, এলএনজি অবকাঠামো, সড়ক উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল সব মিলিয়ে এই অঞ্চলকে দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ লজিস্টিক ও শিল্পকেন্দ্রে রূপ দেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব প্রকল্প পুরোপুরি চালু হলে দেশের আমদানি-রপ্তানি, জ্বালানি সরবরাহ ও শিল্পায়নে নতুন গতি আসবে।
অর্থনীতি বদলাচ্ছে, বদলাচ্ছে ভূমির ব্যবহার
যেখানে একসময় বিস্তীর্ণ লবণক্ষেত, কৃষিজমি ও উপকূলীয় চর ছিল, সেখানে এখন নির্মাণ হচ্ছে শিল্প ও অবকাঠামো। ফলে জমির মূল্য কয়েক গুণ বেড়েছে। অনেক জমির মালিক আর্থিকভাবে লাভবান হলেও ভূমিহীন, বর্গাচাষি, দিনমজুর, জেলে ও ক্ষুদ্র কৃষকদের বড় একটি অংশ নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হিমশিম খাচ্ছেন।
কর্মসংস্থান: প্রত্যাশা ও বাস্তবতা
বৃহৎ প্রকল্পের কারণে নির্মাণপর্বে বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, দক্ষতার অভাব এবং নিয়োগনীতির কারণে অনেক স্থায়ী পদে বাইরের কর্মীরা সুযোগ পাচ্ছেন। ফলে স্থানীয় তরুণদের একটি অংশ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত বলে মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কারিগরি প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন এবং স্থানীয়দের অগ্রাধিকারভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত হবে।
জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে
অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমির দাম, বাড়িভাড়া, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য এবং শ্রমের বাজারেও পরিবর্তন এসেছে। এতে একদিকে কিছু মানুষের আয় বেড়েছে, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোর জীবনযাত্রার ব্যয়ও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ
উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য, পাহাড়, বনাঞ্চল, খাল ও জলাভূমির ওপর উন্নয়ন কার্যক্রমের প্রভাব নিয়ে পরিবেশবিদদের উদ্বেগ রয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও বিভিন্ন এলাকায় পরিবেশগত পরিবর্তনের কথা তুলে ধরছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা না গেলে দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
অবকাঠামোর উন্নয়ন
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, নতুন সড়ক, বিদ্যুৎ সঞ্চালন, প্রশাসনিক কার্যক্রমের সম্প্রসারণ এবং বিভিন্ন সরকারি সেবার উন্নতি মহেশখালীকে আগের তুলনায় অনেক বেশি সংযুক্ত করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন
উন্নয়ন কি কেবল অবকাঠামো নির্মাণের নাম, নাকি মানুষের জীবনমানের উন্নয়নও এর অংশ?
মহেশখালীর উন্নয়নকে সফল বলতে হলে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান, পুনর্বাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পরিবেশ সুরক্ষা এবং সামাজিক ন্যায়বিচার সব ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান অগ্রগতি নিশ্চিত করতে হবে।


এ জাতীয় আরো খবর