শনিবার, আগস্ট ১, ২০২৬

মানুষ পণ্য নয়-সচেতনতাই মানবপাচার রোধের সবচেয়ে বড় শক্তি

  • এস এম আজাদ হোসেন
  • ২০২৬-০৭-৩০ ২০:০৫:৪১

৩০ জুলাই বিশ্বজুড়ে পালিত হচ্ছে 'বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস-২০২৬'। জাতিসংঘ ঘোষিত এই দিবসের মূল লক্ষ্য মানবপাচারের ভয়াবহতা সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে সচেতন করা, পাচারকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের সুরক্ষা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা। প্রযুক্তির বিস্তার,অভিবাসনের চাপ এবং সংঘাতময় বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে মানবপাচার এখন আরও জটিল ও বহুমাত্রিক অপরাধে পরিণত হয়েছে।

মানবপাচার: আধুনিক বিশ্বের লুকানো দাসত্ব
মানবপাচার এমন একটি সংগঠিত অপরাধ, যেখানে প্রতারণা, প্রলোভন, জোরপূর্বক বা ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে মানুষকে শোষণের উদ্দেশ্যে স্থানান্তর, বিক্রি বা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এর শিকার হন নারী, পুরুষ ও শিশুরা। অনেককে বাধ্য করা হয় যৌন শোষণ, জোরপূর্বক শ্রম, গৃহকর্মে নির্যাতন, ভিক্ষাবৃত্তি, শিশু শ্রম কিংবা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা একে 'আধুনিক দাসত্বের সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ' হিসেবে আখ্যা দিয়ে আসছেন।

কেন বাড়ছে মানবপাচার?
দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বিদেশে উচ্চ আয়ের চাকরির প্রলোভন, শিক্ষার অভাব, সামাজিক বৈষম্য, সংঘাত, জলবায়ুজনিত বাস্তুচ্যুতি এবং অনলাইন প্রতারণা-এসব কারণ মানবপাচারের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ভুয়া চাকরির ওয়েবসাইট ব্যবহার করে পাচারকারীরা সহজেই মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে। অনেকেই বৈধ কর্মসংস্থানের আশায় বিদেশে গিয়ে পাচারচক্রের ফাঁদে পড়ছেন।

বাংলাদেশের বাস্তবতা
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বাংলাদেশ মানবপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। প্রতিবছর উন্নত জীবনের আশায় বহু মানুষ বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করেন। এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে সক্রিয় হয়ে ওঠে দালালচক্র।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সীমান্তবর্তী এলাকা, উপকূলীয় অঞ্চল এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। নারী ও শিশু পাচারের পাশাপাশি শ্রমিক পাচারও উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

আইন আছে,প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ
বাংলাদেশে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ কার্যকর রয়েছে। আইন অনুযায়ী মানবপাচার একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। এছাড়া সরকার সীমান্ত নজরদারি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান, সচেতনতামূলক কর্মসূচি এবং ভুক্তভোগীদের পুনর্বাসনে বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু আইন করলেই হবে না; দ্রুত বিচার, আন্তঃদেশীয় সহযোগিতা এবং দালালচক্রের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়াই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

প্রতিরোধে করণীয়
-বিদেশে যাওয়ার আগে সরকারি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সব তথ্য যাচাই করা।
-ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রলোভন থেকে সতর্ক থাকা।
-শিশুদের বিদ্যালয়ে রাখা এবং তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
-সন্দেহজনক দালাল বা পাচারচক্রের তথ্য দ্রুত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো।
-পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন ও গণমাধ্যমের সমন্বিত সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা।

ভুক্তভোগীদের পাশে দাঁড়ানো জরুরি
মানবপাচারের শিকার ব্যক্তিরা শুধু আর্থিক ক্ষতির মুখোমুখি হন না; অনেকেই শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে দীর্ঘমেয়াদি সংকটে পড়েন। তাই তাদের চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, মানসিক পরামর্শ, পুনর্বাসন এবং সম্মানজনকভাবে সমাজে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ সমান গুরুত্বপূর্ণ।

সবার দায়িত্ব,সবার অঙ্গীকার
মানবপাচার কোনো একক দেশের সমস্যা নয়; এটি একটি বৈশ্বিক মানবাধিকার সংকট। এই অপরাধ নির্মূলে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আন্তর্জাতিক সংস্থা, নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগই সবচেয়ে কার্যকর পথ।
'বিশ্ব মানবপাচার প্রতিরোধ দিবস' আমাদের মনে করিয়ে দেয়-মানুষ কখনোই পণ্য নয়। প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই একটি সভ্য সমাজের পরিচয়। সচেতনতা,আইন প্রয়োগ এবং মানবিক দায়িত্ববোধ একসঙ্গে কাজ করলেই মানবপাচারমুক্ত নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখকঃ কলামিস্ট,মানবাধিকার কর্মী। 


এ জাতীয় আরো খবর