শুক্রবার, এপ্রিল ১৭, ২০২৬

মানবিকতার আঙিনায় মায়ার সংসার: ডি এ পারভেজ ও তার ঘরে আসা নতুন অতিথি

  • ড. এ আর জাফরী
  • ২০২৬-০৩-১৩ ২৩:১৫:২১

বিকেলের ম্লান আলো তখন ঢাকার ব্যস্ত রাজপথের ধুলোবালি মেখে ডি এ পারভেজের ড্রয়িংরুমের জানালায় এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। বাইরে তখনো সহস্র মানুষের হাহাকার, অধিকারবঞ্চিতদের দীর্ঘশ্বাস আর ফাউন্ডেশনের শত কাজের চাপ। কিন্তু এই চার দেয়ালের ভেতর অন্য এক পৃথিবী-যেখানে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন-এর মহাসচিব ডি এ পারভেজ কেবল একজন প্রথিতযশা সমাজকর্মী নন, বরং এক নিঃসঙ্গ প্রেমিকের প্রতিচ্ছবি, যার হৃদয়ের অনেকটা অংশ জুড়ে আছে নীরবতা আর বাকিটা জুড়ে এক অদ্ভুত মায়ার সংসার।

স্মৃতির সতেরো বছর ও এক অনন্য আত্মত্যাগ :
সতেরোটি বসন্ত আগে তার জীবন থেকে ঝরে গিয়েছিল এক প্রিয় মুখ। সেই যে শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, ডি এ পারভেজ তা আগলে রেখেছেন পরম মমতায়। স্ত্রীর বিদেহী আত্মার প্রতি অটুট শ্রদ্ধা আর সন্তানদের মানুষ করার ব্রত নিয়ে নিজের হৃদয়ে নতুন কোনো প্রণয়ের নোঙর ফেলেননি তিনি। আজ ছেলে-মেয়ে উচ্চশিক্ষার শিখরে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু সেই বিশাল অট্টালিকার নিস্তব্ধতায় আজ যারা প্রাণের স্পন্দন জাগিয়ে রাখে, তারা মানুষ নয়—তারা হলো একদল অবলা বিড়াল।

ইসলামের ঐতিহ্যে বিড়ালপ্রীতি ও সুন্নাহর ছায়া :
পারভেজ সাহেবের এই বিড়ালপ্রীতি যেন ইতিহাসের সেই স্বর্ণালি অধ্যায়কে মনে করিয়ে দেয়। ইসলামের ইতিহাসে আমরা দেখি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অসামান্য বিড়ালপ্রীতি। কথিত আছে, একবার একটি বিড়াল তাঁর চাদরের ওপর ঘুমিয়ে পড়লে তিনি বিড়ালটির ঘুম ভাঙাননি, বরং চাদরের সেই অংশটি কেটে ফেলে উঠে দাঁড়িয়েছিলেন।
এমনকি তাঁর অন্যতম প্রিয় সাহাবী আব্দুর রহমান ইবনে সাখরকে তিনি ভালোবেসে ডাকতেন ‘আবু হুরায়রা’ বা ‘বিড়ালের পিতা’ বলে। রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রায়ই আবু হুরায়রার কাছে তাঁর সেই ছোট্ট সঙ্গীর খোঁজখবর নিতেন। আজ ডি এ পারভেজের ঘরেও যেন সেই সুন্নাহর এক আধুনিক প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি মানবতার কাজে যতক্ষণ বাইরে থাকেন ততক্ষণ মানুষের উপকারে দৌড়ঝাঁপ করেন, আর ঘরে ফিরে নিবিড় মমতায় মেতে ওঠেন এই প্রাণীদের সেবায়।

চতুষ্পদী চার বিবি ও এক গৃহকর্তা :
ডি এ পারভেজের সংসারে এখন চার চারটে ‘বিবি’র রাজত্ব। বাইরে থেকে ক্লান্ত হয়ে ফিরে যখন তিনি সোফায় বসেন, শুরু হয় তাদের ‘নির্যাতনের’ এক মধুর মহড়া।
 -কেউ কাঁধে চড়ে বসে: যেন দিনের সবটুকু না বলা কথা কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলতে চায়।
 -কেউ কোলে মুখ লুকায়: সবটুকু অধিকার নিয়ে জানান দেয় যে, এই মানুষটি কেবল তাদেরই।
 -অভিমানী মুখ: আবার কেউ হয়তো ঠিকমতো মনোযোগ না পেয়ে কোণে গিয়ে মুখ বেজার করে বসে থাকে।
এই ৪ বিবির আছে আবার ৩ সন্তান। তাদের খেদমতেই পারভেজ সাহেব বিভোর থাকেন। তারাও যেন বোঝে এই নিঃসঙ্গ মানুষটির হৃদয়ের হাহাকার, তাই ছায়ার মতো সঙ্গ দেয় তাকে।

নতুন নাত-নাতনির আগমন; আনন্দের হিল্লোল :
গল্পের শ্রেষ্ঠ অংশটি রচিত হলো গতকাল। যেন পারভেজের ঘরে ঈদের চাঁদ নেমে এলো। কোনো এক ‘বিবির’ কোল আলোকিত করে জন্ম নিল তিনটি ফুটফুটে ছানা-পারভেজের ভাষায় তার ‘নতুন নাত-নাতনি’। সেই ছোট্ট প্রাণের আগমনে দীর্ঘ ১৭ বছরের একাকীত্বে অভ্যস্ত মানুষটি আজ এক পরম আনন্দিত পিতামহের মতো উৎফুল্ল।
উত্তেজনায় টইটম্বুর হয়ে তিনি ফোন ধরলেন। ওপাশ থেকে ভেসে এলো সেই কণ্ঠস্বর, যাতে মিশে ছিল অকৃত্রিম উচ্ছ্বাস-
'ভাই, আমার ঘর আজ নতুন আলোয় ভরে উঠেছে। কাল রাতে আমার নতুন নাত-নাতনি এসেছে পৃথিবীতে। আমি যে কী খুশি, আপনাকে বলে বোঝাতে পারবো না! মিষ্টি পাঠাতে চাই, কিন্তু ওদের রেখে এক মুহূর্তের জন্য যে বাইরে যাওয়ার উপায় নেই। আপনি কবে আসছেন আমার এই মানিকদের দেখতে?'
তার কণ্ঠের সেই মাধুর্য শুনে মনে হচ্ছিল, কোনো রাজসিক ধনভাণ্ডার নয়, বরং এই তিনটি বিড়ালছানাই যেন তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
ডি এ পারভেজের এই সংসার এক অনন্য প্রেমের উপাখ্যান। যেখানে বিচ্ছেদ আছে কিন্তু বিরহ নেই, যেখানে নিস্তব্ধতা আছে কিন্তু একাকীত্ব নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সেই আদর্শকে বুকে ধারণ করে তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন, ভালোবাসা কেবল মানুষের জন্য নয়, বরং প্রতিটি প্রাণের জন্য সমানভাবে বহমান।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক-দৈনিক ঐশী বাংলা।
ধর্ম সচিব :বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন।


এ জাতীয় আরো খবর