একজন মানুষ
এক জীবনে কতগুলো চরিত্রে অভিনয় করে-
কারও বাবা,
কারও স্বামী,
কারও প্রেমিক,
কারও ভরসা,
কারও আবার নীরব হতাশা।
বাইরে থেকে তাকে দেখে মনে হয়
সব ঠিক আছে।
শার্টে ইস্ত্রি আছে,
মুখে কৃত্রিম হাসি আছে,
মাস শেষে বাজারের ব্যাগ আছে,
ফেসবুকে পরিবারের সঙ্গে ছবি আছে।
শুধু নেই-
ভেতরের মানুষটার খবর।
সে মানুষটা
প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙে।
একদিন যে ছেলে
মায়ের আঁচল ধরে বলেছিল,
'বড় হয়ে তোমাকে সুখ দেবো'-
আজ সে বৃদ্ধ মায়ের ওষুধের টাকায়
হিসাব মেলাতে পারে না।
রাতের খাবার শেষে
মা যখন জিজ্ঞেস করে,
বাবা,তুই ঠিক আছিস তো?'
সে শুধু হেসে বলে,
'হ্যাঁ,ভালো আছি।'
কারণ পুরুষ মানুষের কান্না
এই সমাজে এখনও অশোভন।
সে একজন বাবা।
মেয়ের স্কুলব্যাগ কিনতে গিয়ে
নিজের জুতোর ছেঁড়া তলা লুকায়।
ছেলের ঈদের জামার হাসির আড়ালে
নিজের পুরোনো পাঞ্জাবির রং ফিকে হয়ে যায়।
সন্তানের সামনে সে পাহাড়ের মতো দৃঢ়,
অথচ মাঝরাতে
চুপচাপ বারান্দায় বসে
ব্যাংকের কিস্তির হিসাব কষে।
তার সন্তান জানে না-
বাবারা অনেক সময়
ভাতের শেষ টুকরোটা খায় না
শুধু পরিবারের জন্য।
সে একজন স্বামী।
স্ত্রীর অভিমান বোঝার সময় তার নেই,
কারণ মাথার ভেতর
বিদ্যুতের বিল,
বাড়িভাড়া,
চাকরি টিকিয়ে রাখার ভয়
একসাথে যুদ্ধ করে।
স্ত্রী ভাবে-
লোকটা বদলে গেছে।
আগের মতো আর গল্প করে না,
চোখে চোখ রাখে না।
কিন্তু কেউ বুঝে না,
দায়িত্ব মানুষের ভেতরের কবিকে
ধীরে ধীরে হত্যা করে।
একসময় যে মানুষটা
বৃষ্টিতে ভিজে প্রেমপত্র লিখত,
আজ সে বাজারের তালিকা লিখে।
সে একজন প্রেমিকও ছিল।
কারও জন্য রাত জেগেছিল,
কারও কণ্ঠ শুনে পৃথিবী সুন্দর লেগেছিল।
তারও ইচ্ছে ছিল
হাত ধরে দূরে কোথাও হারিয়ে যাওয়ার।
কিন্তু প্রেম সবসময়
বাস্তবের কাছে হেরে যায়।
মেয়েটা হয়তো এখন
অন্য কারও সংসারে ব্যস্ত।
আর ছেলেটা-
দাড়ি-গোঁফে বয়স লুকিয়ে
চুপচাপ অফিস শেষে বাসায় ফেরে।
কখনও পুরোনো গান শুনলে
তার বুকের ভেতর হাহাকার ওঠে,
কিন্তু সে এখন আর কাঁদে না।
কারণ জীবন তাকে শিখিয়েছে-
অতিরিক্ত অনুভূতি
মধ্যবিত্ত মানুষের জন্য বিপজ্জনক।
এই শহরে
হাজার হাজার পুরুষ হাঁটে-
কারও চোখে ঘুম নেই,
কারও পকেটে স্বপ্ন নেই,
কারও জীবনে ভালোবাসা নেই।
তবু তারা বেঁচে থাকে।
কারণ তাদের থেমে যাওয়ার অধিকার নেই।
একজন ব্যর্থ বাবা,
একজন ক্লান্ত স্বামী,
একজন হারিয়ে যাওয়া প্রেমিক-
আসলে তারা ব্যর্থ মানুষ নয়।
তারা সেইসব নীরব যোদ্ধা,
যারা প্রতিদিন নিজের স্বপ্ন হত্যা করে
পরিবার নামের পৃথিবীটাকে বাঁচিয়ে রাখে।
সমাজ শুধু সফল মানুষের গল্প লেখে,
কিন্তু এই ব্যর্থ মানুষগুলোর কাঁধের ওপর দাঁড়িয়েই
অনেক পরিবার টিকে থাকে।
আর রাত গভীর হলে
তারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
নিজেকেই শুধু একটা প্রশ্ন করে-
'আমি কি সত্যিই হেরে গেছি,
নাকি সবাইকে বাঁচাতে গিয়ে
নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছি?'