জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) কার্যক্রম এক অনিশ্চয়তার মুখে। আগামী ২৮ জুন থেকে দেশের সকল ট্যাক্স, কাস্টমস ও ভ্যাট অফিসে ‘কমপ্লিট শাটডাউনের’ ঘোষণা দিয়েছে এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ। মূল দাবি-বর্তমান এনবিআর চেয়ারম্যানের অপসারণ। দাবি পূরণ না হলে রাজস্ব প্রশাসন কার্যত অচল হয়ে যাবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন আন্দোলনরত নেতারা।
বৃহস্পতিবার (২৬ জুন) বিকেলে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব ভবনের বাইরে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তারা এ ঘোষণা দেন।
সংবাদ সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন পরিষদের সভাপতি হাছান মুহম্মদ তারেক রিকাবদার। মহাসচিব সেহেলা সিদ্দিকাসহ অন্যান্য কেন্দ্রীয় নেতারাও উপস্থিত ছিলেন।
তারা বলেন, “আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপস্থিতি, গেইট বন্ধ করে কর্মচারীদের আটকে রাখা-এসব নিপীড়নের ভাষা আমাদের পরিচিত। এ দৃশ্য ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের দমন-পীড়নের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।”
তাদের মতে, প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে যেমন গণঅভ্যুত্থান ঠেকানো যায়নি, তেমনি রাজস্ব সংস্কারের দাবিও দমন করা যাবে না।
সংস্কার পরিষদ সাফ জানিয়ে দিয়েছে-২৭ জুনের মধ্যে এনবিআর চেয়ারম্যানকে অপসারণ করা না হলে ২৮ জুন থেকে দেশব্যাপী শুরু হবে অনির্দিষ্টকালের পূর্ণাঙ্গ কর্মবিরতি। তবে আন্তর্জাতিক ফ্লাইট সংশ্লিষ্ট যাত্রীসেবাকে এই কর্মসূচির বাইরে রাখা হবে।
এছাড়া, ২৮ জুন তারা “মার্চ টু এনবিআর” কর্মসূচির মাধ্যমে সারাদেশ থেকে বিভাগীয় রাজস্ব দপ্তরগুলো থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে রাজস্ব ভবনের সামনে অবস্থান নেবে।
সংবাদ সম্মেলনের আগে থেকেই রাজস্ব ভবনের পরিস্থিতি ছিল বেশ উত্তপ্ত।
নেতারা অভিযোগ করেন, “বৃহস্পতিবার সকাল থেকে এনবিআরের তিনটি গেটেই বিপুল সংখ্যক পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, সেনাবাহিনী এবং কোস্টগার্ড মোতায়েন ছিল। কার্যত রাজস্ব ভবন অবরুদ্ধ করে রাখা হয়।”
বলা হয়, “আমাদের শান্তিপূর্ণ কলম বিরতি কর্মসূচিকে প্রতিহত করতে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। কোনো কর্মী অফিসে ঢুকতে পারেনি।”
এ অবস্থাকে নেতারা “নির্বাচনোত্তর প্রশাসনিক রূপান্তরের প্রতিশোধপরায়ণতা” বলেও ব্যাখ্যা করেন।
উল্লেখ্য, এনবিআর সংস্কার ঐক্য পরিষদ এনবিআর চেয়ারম্যান অপসারণসহ চার দফা দাবিতে কয়েক দফা আন্দোলন চালিয়ে আসছে। তাদের দাবিগুলো হলো:
বর্তমান চেয়ারম্যানের অপসারণ
রাজস্ব প্রশাসনের কাঠামোগত সংস্কার
সব বিভাগের কর্মকর্তাদের মধ্যে সমতা প্রতিষ্ঠা
নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা
গত শনিবার থেকে তারা পুনরায় আন্দোলন শুরু করেন। এর ধারাবাহিকতায় আজ বৃহস্পতিবার কলম বিরতি পালনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি নিরাপত্তা বলয়ের কারণে।
সরকারি পক্ষ থেকে এখনো কোনো প্রতিক্রিয়া আসেনি। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হলে আলোচনার বিকল্প খোঁজা হতে পারে।
অন্যদিকে, সংস্কার ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন- “আমরা ২৮ জুন পর্যন্ত সময় দিচ্ছি। এরপর শুধু শাটডাউন নয়, গণঅবস্থান ও সারা দেশে বিক্ষোভ হবে।”
বাংলাদেশের রাজস্ব প্রশাসন অনেক দিন ধরেই কর্মপরিবেশ, ক্ষমতার ভারসাম্য ও নীতিগত দুর্বলতায় ভুগছে। এবারের আন্দোলন শুধু একজন কর্মকর্তার অপসারণ নয়, বরং গোটা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের ডাক। শাটডাউন কার্যকর হলে সেটির প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ প্রশাসন নয়, দেশের রাজস্ব আহরণ, বাণিজ্য প্রবাহ ও আমদানি-রপ্তানি খাতেও পড়বে সরাসরি।
সরকার এখনো নিশ্চুপ। কিন্তু সময় যে দ্রুতই ফুরিয়ে আসছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।