দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে নেপাল থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি শুরু হয়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক জ্বালানি সহযোগিতার ক্ষেত্রে এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হয়ে উঠেছে।
রবিবার (১৫ জুন) পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিবি) নিশ্চিত করেছে যে, শনিবার রাত ১২টা থেকে প্রতিদিন গড়ে ৩৮–৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ভারতীয় ট্রান্সমিশন লাইন ব্যবহার করে বাংলাদেশে সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই বিদ্যুৎ আমদানি কার্যক্রমটি বাস্তবায়িত হয়েছে নেপাল, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে সই হওয়া এক ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায়।
২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময়ে নেপালের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দাহালের ভারত সফরে আলোচিত এই প্রকল্প এখন বাস্তব রূপ পেয়েছে।
২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর,নেপালের কাঠমান্ডুতে এক ঐতিহাসিক ত্রিপক্ষীয় চুক্তিতে স্বাক্ষর করে:
নেপাল ইলেকট্রিসিটি অথোরিটি (NEA)
বাংলাদেশ পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড (BPDB)
ভারতের NTPC Vidyut Vyapar Nigam (NVVN)
চুক্তি অনুযায়ী, ২০২৫ সাল থেকে ২০২৯ সাল পর্যন্ত, প্রতিবছর ১৫ জুন থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত শুষ্ক মৌসুমে নেপাল বাংলাদেশে ৪০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ রপ্তানি করবে।
নেপাল থেকে আমদানি হওয়া বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ দশমিক ৪ সেন্ট (০.০৬৪ ডলার)।
এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ স্বল্প ব্যয়ে পরিচ্ছন্ন জলবিদ্যুৎ পাবে, যা তাপবিদ্যুৎনির্ভর জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে সহায়ক হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরণের ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা নজিরবিহীন। এটি শুধু বিদ্যুৎ বিনিময় নয়, বরং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সংযোগ ও কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদারের এক বড় উদাহরণ।
জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গবেষক ড. তানভীর আশরাফ বলেন, “এই চুক্তি শুধু শক্তি নিরাপত্তা নয়, বরং ভারত ও নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের আস্থা ও সহযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা।”
বাংলাদেশের গ্রীষ্ম ও শুষ্ক মৌসুমে বিদ্যুৎ চাহিদা তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময়ে বিদ্যুৎ সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়, যা ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের অন্যতম কারণ।
নেপালের জলবিদ্যুৎ এখন বাংলাদেশের জন্য ঋতুভিত্তিক একটি বিকল্প উৎস হয়ে উঠতে পারে।
“আমরা যদি এভাবে ৩–৪টি দেশীয় বিদ্যুৎ উৎসকে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারি, তাহলে আমাদের জ্বালানি নিরাপত্তা বাস্তব অর্থেই টেকসই হবে,” -বলেন পিজিবির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা।
এই চুক্তি বাস্তবায়নের পথ একেবারে মসৃণ ছিল না।
ভারতীয় গ্রিড ব্যবহার নিয়ে নানান প্রশাসনিক ও প্রযুক্তিগত জটিলতা ছিল
নেপালের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতাও চুক্তি কার্যকরে কিছুটা বিলম্ব ঘটায়
বাংলাদেশের পক্ষ থেকেও বিদ্যুৎ গ্রহণের জন্য নির্ভরযোগ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হয়েছে
তবে এসব চ্যালেঞ্জ পেরিয়ে অবশেষে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালু হওয়াটা একটি কার্যকর আঞ্চলিক সমন্বয় কাঠামোর প্রমাণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নেপালের জলবিদ্যুৎ এখন বাংলাদেশের ঘরে-এটি শুধু একটি বাণিজ্যিক লেনদেন নয়, বরং আঞ্চলিক সহযোগিতার নতুন রূপরেখার সূচনা।
যেখানে বিদ্যুৎকে কেন্দ্র করে তিনটি দেশের মধ্যে গড়ে উঠছে এক অভিন্ন নেটওয়ার্ক—শক্তি বিনিময়, অর্থনৈতিক সংযোগ এবং কূটনৈতিক স্থিতিশীলতার এক যুগপৎ প্রতিচ্ছবি।