১৯৭২ সালের কোনোএক সকাল বেলায় বাবা আমাকে বিখ্যাত কেপিএম স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়। তখন প্রধান শিক্ষক ছিলেন সাখাওয়াত হোসেন স্যার।
ইউ পেটার্নের সুদৃশ্য মেইন বিল্ডিংয়ের শেষ ক্লাসরুমে পড়াশুনা শুরু করি।
দেশ স্বাধীন হয়ে মানুষের মনে আনন্দের বাতাস বহিলেও শিক্ষাপদ্ধতিতে নীতিগত কোনো পরিবর্তন আসেনি। পাকিস্তানি আমলের পাঠ্যবইগুলোর 'চাঁনতারা' পতাকার স্থলে বাংলাদেশের পতাকার ছবি; আর পাকিস্তান লেখার উপর 'বাংলাদেশ' চিপটিমেরে বসিয়ে দিয়ে পাঠদান শুরু করে দেয়।
এই চিপটিমারা ব্যপারটা চলে সর্বত্র--সাইনবোর্ডে, সরকারি নথিপত্রে, মানুষের চেতনায়ও।
মিলগেটের মাইকে তখনো উর্দু গান বাজানো হয়।
শুধু সকল বেলায় স্কুলএ্যাসেম্বলিতে কানন বড়ুয়া স্যার 'পাক সার জমিন সাদ বাতে'র পরিবর্তে 'আমার সোনার বাংলা' গাইতেন আর আমরা কন্ঠ মেলাতাম। বাঁশের মাথায় উড়তো নতুন পতাকা।
বঙ্গবন্ধু নতুন শিক্ষানীতি প্রনয়নের জন্য বিজ্ঞানী কুদরত-ই-খুদাকে প্রধান করে কমিশন গঠন করে দিয়েছিলেন বটে; ৭৫এ তার মৃত্যু এবং পাকিস্তানপন্থি সেনাসরকার প্রতিষ্ঠার মধ্যদিয়ে এদেশে শিক্ষা সাবেকি রয়ে যায়।
১৯৮২ সালে আমরা এসএসসি পরীক্ষা দিই কিছুটা পরিমার্জিত পাকিস্তানি আমলের দশটি বই পড়ে।
আমার স্কুল শ্রেষ্ঠ, আমার শিক্ষক মহান, আমার দেশ স্বর্গ--এসব শ্রেফ গালভরা কথা; চলমান সুবিধাবাদকে উস্কে রাখার জন্য।
৭২ থেকে ৮২ পযর্ন্ত স্কুলশিক্ষার যে বেহাল দশা ছিলো, তা তেমনি রয়ে গেছে; বরং যুক্ত হয়েছে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি আর ব্যবসা।
৭২-৭৪ সালে সিনিয়র শিক্ষকদের দেখেছি করিডোরে কিংবা টিচার্স রুমে সিগারেট ফুঁকতে।
শিক্ষকরা হরহামেশা ছাত্রদের বেদম বেত্রাঘাত করতো; গালাগাল দিতো। ছাত্র-শিক্ষকের দূরত্ব ছিল ব্যপক।
পাঠদান ছিল নিতান্তই সাদামাটা।
৭৫ এর পর অধিকাংশ শিক্ষক হরিলুটের মতন প্রাইভেট টিউশনিতে মেতে ওঠেন। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলো হয় ওঠে নকলের আখড়া।
স্বজনপ্রীতি, এমনকি বৃত্তি পাইয়ে দেওয়ারও অভিযোগ শুনেছি সেই ছেলেবালায়।
প্রাইমারি শাখার এক শিক্ষক একদিন বাসায় এসে সন্ধ্যায় খেলতে যাওয়ার অপরাধে মায়ের সামনে এমন জোরে চড় মারে, কানের পর্দা ফেটে যায়; আমার জ্বর ওঠে; এবং আজও ঐ কানে কম শুনি।
শিক্ষক পিতৃতুল্য; শিক্ষক মহান। সংস্কৃত শ্লোক আছ-- যদ্যপি আমার গুরু শুরিখানায় যায়/ তদ্যপি আমার গুরু নিত্যানন্দ রয়।
তা সত্বেও এদেশের শিক্ষক এবং শিক্ষাব্যবস্থার প্রতি আমার এতটুকু আস্থা নাই।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পেয়েও ঐ পেশায় যাইনি। কারণ, ওদের মতন হতে গিয়ে ছাত্রের কানে চড় মারবো; ব্যাচে নোট বিলি করে পয়সা কামাবো; আর লোকে বলবে 'মহান'! শিক্ষকের মুখোশ না পরে মুদি দোকান দেওয়া বরং অনেক ভালো।
এসব কারণে ব্যক্তি নয়, ছোটবেলা থেকে পুস্তকই হয়ে ওঠে আমার গুরু।