পাইকগাছা(খুলনা) প্রতিনিধি:
অবৈধ প্রক্রিয়ায় (ভূয়া নিবন্ধনে) নিয়োগ পাওয়া পাইকগাছার কপিলমুনি কলেজের বাংলা বিভাগের বহুলালোচিত শিক্ষক দিপ্তী দত্তকে এমপিও করণে ফের তদ্বির মিশন নিয়ে মাঠে নেমেছে একটি মহল। কলেজ থেকে ই-রিকুইজিশনে চাহিদা পত্রে নাম না পাঠানোর পর সর্বশেষ মিনিস্ট্রি অডিটেও দিপ্তী প্রসঙ্গে সাফাই গাওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কলেজের দায়িত্বশীল সূত্র।
এদিকে দিপ্তীকে এপিও দিতে তদ্বির মিশনের সদস্যরা এর আগে উচ্চতর বাংলা থেকে বাংলায় প্যাাটার্নভূক্ত শিক্ষক তাইয়িবুন্নাহারকে এমপিওসহ ফের উচ্চতর বাংলায় ফিরিয়ে বাংলা বিষয়ের পদটি শূণ্য করে। যদিও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘ দিন ধরে কোন ছাত্র না থাকলেও তাকে দিয়ে বাংলায় পাঠদান করানো হয়। অন্যদিকে এনটিআরসিএ’র ই-রিকুইজিশনে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে শিক্ষক না চাওয়ায় সঙ্গত কারণে শিক্ষক দেয়নি কর্তৃপক্ষ।
তথ্যানুসন্ধানে জানাযায়, খুলনার পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি কলেজ বাংলা বিভাগের প্রভাষকসহ বিভিন্ন শূন্যপদে ২০১০ সালের ৩১ মার্চ দৈনিক জনকণ্ঠসহ একাধিক পত্রিকায় একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২০১০ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর নিয়োগ পরীক্ষার সাক্ষাৎকার বোর্ডের সুপারিশে ১৯ সেপ্টেম্বর কলেজ পরিচালনা পরিষদের ১৯৮ নং সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে অস্থায়ীভাবে নিয়োগ পান তালা উপজেলার ঘোষনগর গ্রামের জয়ন্ত কুমার পালের স্ত্রী দিপ্তী দত্ত।
প্রসঙ্গত, ঐ পদে ১০ জন প্রার্থী আবেদন করলেও ১৮ সেপ্টেম্বর লিখিত পরীক্ষায় মাত্র ৩ জন প্রার্থী অংশগ্রহন করেন। এদের মধ্যে দিপ্তী দত্তকে নিয়োগ দিলেও ঐসময় তার শিক্ষক নিবন্ধন সনদ ছিল না। অথচ জেনারেল বিভাগে শূন্য পদে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক ছিল।
কলেজ সূত্র জানায়, এর আগে দিপ্তী দত্ত শর্ত সাপেক্ষে ২০০৯ সালে অনার্স কোর্সে বাংলা বিভাগে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। পরে জেনারেল বিভাগের বাংলা বিষয়ের শূন্য পদে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি দিলে তিনি সেখানে আবেদন করেন। প্রসঙ্গত, ঐ পদের অপর প্রার্থীদের নিবন্ধন থাকা সত্ত্বেও সেদিন নিয়োগ কমিটি এক অজ্ঞাত কারণে দিপ্তী দত্তকে নিয়োগ দেন।
জানাযায়, দিপ্তীকে ২০১০ সালে নিয়োগ দিলেও তিনি কলেজ শিক্ষক নিবন্ধন পাস করেন ২০১৩ সালে। এর আগে একাধিকবার এমপিও'র জন্য সুপারিশ পাঠালেও তঞ্চকতাপূর্ণ কাগজপত্রের কারণে ফাইলটি বারংবার ফেরৎ আসে। এরপর ২০১৪ সালের ১৪ মে ২২৭ নং ও ২০১৫ সালের ২০ অক্টোবর ২৩৭ নং সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক তার এমপিও'র সুপারিশ পাঠায় তখনকার পরিচালনা পরিষদ। অভিযোগ রয়েছে, ঐ সময়ে পাঠানো এমপিও সুপারিশ ফাইলের কলেজ অফিস কপিতে তখনকার নিবন্ধন পত্রটি খুঁজে পাওয়া যায়নি বলে জানান, অধ্যক্ষ হাবিবুল্ল্যাহ বাহার।
এদিকে কলেজের বাংলা ভাষা ও সাহিত্য (উচ্চতর বাংলায়) নিয়োগ পাওয়া শিক্ষক তাইয়িবুন্নাহার সিদ্দিকার এমপিও শীটে ভুলবশত বাংলা বিষয় উল্লেখ হয়েছে বলে চিহ্নিত করে তা সংশোধনের জন্য ডিজি থেকে এক নির্দেশনার প্রেক্ষিতে তা সংশোধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করা হয়। এর আগে ২০১৩ সালের ২৫ এপ্রিল ৮-২/২৬৮/১৩ নং স্মারকে কলেজ পরিচালনা পরিষদের পক্ষে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদফতরের মহাপরিচালক বরাবর তাইয়িবুন্নাহারের ইনডেক্স নং ৩০৮৭৪৮৯-এর এমপিও শীটে বাংলা ভাষা ও সাহিত্য কোড-১৪৭-১৪৮ এর পরিবর্তে বাংলা উল্লেখ হওয়ায় তা সংশোধনের জন্য আবেদন পাঠানো হয়। তবে ঐ বছরের ২২ জুন কলেজ পরিচালনা পরিষদের ২১৮ নং সভায় তাইয়িবুন্নাহারের আর্থিক দিক বিবেচনায় পরিষদ তার বেতন উত্তোলনের সিদ্ধান্ত দেয়।
এদিকে কলেজের উচ্চতর বাংলা থেকে বাংলা বিভাগে অন্তর্ভূক্ত প্রভাষক তাইয়িবুন্নাহার তখন মাউশি বরাবর একটি আবেদন করেন যে, তাকে কলেজ কর্তৃপক্ষ জোরপূর্বক তার পদ থেকে অপসারণের অপতৎপরতা চালাচ্ছে এবং তদস্থলে অবৈধ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ পাওয়া জাল সার্টিফিকেটধারী শিক্ষক দিপ্তী দত্তকে স্থলাভিষিক্ত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ জানুয়ারি ১৮’ মাউশির সহকারী পরিচালক সিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল বিষয়টির তদন্তে আসেন। এসময় দিপ্তী তার প্রথম সার্টিফিকেটটি তঞ্চকতাপূর্ণ ছিল বলে স্বীকার করেন।
জানাযায়, জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০১২ অনুযায়ী শিক্ষামন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় উচ্চমাধ্যমিক স্তরে (কলেজ পর্যায়ে) নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী বলা হয়, নতুন করে ১১ টি বিষয়ে কলেজ শিক্ষকরা এমপিও পাবেন। এতে আরো বলা হয়, শিক্ষাক্রমের আলোকে বিষয় পরিবর্তন হলেও কর্মরত কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষকের চাকরি যাবে না বা এমপিও বাতিল হবে না। তবে তাদের চাকরির মেয়াদ শেষ হলে কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে শিক্ষাক্রম-২০১২'র আলোকে উক্ত ১১ বিষয়ে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। এছাড়া মাউশির মাধ্যমিক পর্যায়ের তৎকালীণ উপপরিচালক ড. সাধন কুমার বিশ্বাসের ২০১৩ সালের ৩ অক্টোবরের এক পত্রানুযায়ী বলা হয়, ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন সাপেক্ষে কোনো শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ও নিয়োগ-যোগদানের ভিত্তিতে প্যাটার্নভুক্ত পদসমূহ পূরণ করার পর এমপিওভুক্ত ও উদ্বৃত্ত কোনো শিক্ষকের শিক্ষাগত যোগ্যতা ঐ পদের অনুরূপ হলে তাকে ঐ পদে সমন্বয় করতে হবে। ঐসময় কলেজের শূন্য পদে এর আলোকেই মূলত তার এমপিও হয় বলে দাবি করা হয়। যদিও কলেজ ভূলবশত তার এপিও শিটে উচ্চতর বাংলার স্থলে বাংলা লেখা হয়েছিল বলে দাবি করে।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে তথ্যানুসন্ধানে আরো জানাযায়, সরকারের শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের অফিস আদেশের স্মারক নং-ডিআইএ/খুলনা/১টি-১১/(অংশ)/খুলনা। তারিখ ২/১১/১৪ মোতাবেক অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর মোঃ মফিজ উদ্দিন আহমদ ভুঁইয়া স্বাক্ষরিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছিল, বিসিএস (সাধারণ শিক্ষা) ক্যাডারের কর্মকর্তা অত্র অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক মোঃ রাশেদুজ্জামান এবং সহকারি শিক্ষা পরিদর্শক মোঃ নেয়ামত উল্যাহ গত ১৯/১১/১৪ থেকে ২২/১১/১৪ পর্যন্ত অভিযোগের ভিত্তিতে কপিলমুনি ডিগ্রী কলেজটি তদন্ত ও অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা করবেন। চিঠির ১৯ নম্বর ক্রমিকে উল্লেখ করা হয় যে, বেগম দিপ্তী দত্ত, প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, কপিলমুনি ডিগ্রী কলেজ। অভিযোগের স্বপক্ষে প্রামান্য রেকর্ডপত্রসহ সেখানে উপস্থিত থেকে তদন্ত কাজে সার্বিক সহযোগিতা প্রদানের জন্য অনুরোধ করা হয়। এরপর বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক তদন্ত হলেও বিষয়টির অদ্যাবধি কোন সুরাহা হয়নি।
তবে দিপ্তী দত্তকে এমপিও দিতে বরাবরই একটি মহলের অপতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ ৫ আগস্ট গত সরকারের পতনের পর কলেজের পরিচালনা পরিষদ ভেঙ্গে যাওয়ায় বর্তমানে এডহক কমিটি দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সম্প্রতি মিনিস্ট্রি পরিদর্শনে দিপ্তী দত্ত প্রসঙ্গে দিপ্তীসহ তার অনুসারীরা তার পক্ষে সাফাই গেয়েছেন। এক প্রশ্নের জবাবে দিপ্তী পরিদর্শকদের জানান, তিনি এমপিও পেতে আবেদন করেছেন যা, প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে নতুন করে কাংলা বিভাগের পদটি শূণ্য ঘোষণার পর হতে কলেজ থেকে প্রতিবছর ই-রিকুইজিশনে চাহিদা পত্রে এনটিআরসিএ’র কাছে বাংলা কিখাগের শিক্ষক চেয়ে আবেদন করা হয়নি তাই, প্রতিষ্ঠান থেকে সেখানে শিক্ষকও দেওয়া হয়নি।
সূত্র জানায়, পূর্বের পছন্দের প্রার্থীদের স্থলাভিষিক্ত করতেই কলেজ থেকে এনটিআরসিএ’র কাছে ই-রিকুইজিশনে শিক্ষক চেয়ে আবেদনই করা হয়নি। এর আগে ডিজি থেকে তাইয়িবুন্নাহারের প্রথমত উচ্চতর বাংলা থেকে বাংলা ও পরে বাংলা থেকে উচ্চতর বাংলায় কোড পরিবর্তন করে চিঠি চালাচালি এবং শেষ পর্যন্ত একজন ছাত্র-ছাত্রী না থাকলেও কোর্ড পরিবর্তনপূর্বক উচ্চতর বাংলায় এমপিও বহাল রেখে বাংলা পদটি শূণ্য করা হয়।
ধারণা করা হচ্ছে, সর্বশেষ কলেজের পরিচালনা পরিষদের নির্বাচনের আগে এডহক কমিটির সময়ে চুপিসারে কর্তৃপক্ষ দিপ্তী দত্তকে বাংলা বিভাগে এমপিও করাতে অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে।
কেননা ২০১০ সাল থেকে তার বিতর্কিত নিয়োগ পরবর্তী অদ্যবধি পরিচালনা পরিষদসহ উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের নানা কর্মকান্ড বিশেষ করে ঘটা করে বাংলা পদ শূণ্য করার পরও এনটিআরসিএ কে ই-রিকুইজিশনে শিক্ষক চেয়ে আবেদন না করায় বিষয়টিকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
এদিকে ছাত্র-ছাত্রী না থাকায় উচ্চতর বাংলার ইনডেক্সধারী তাইয়িবুন্নাহারকে দিয়ে বাংলা ক্লাশ করানো, দিপ্তীকে এমপিও দিলে এক বাংলা বিভাগে প্রতি বছর সরকারকে সর্বমোট ৩ জন ও ১ জনকে অতিরিক্ত বেতন (এমপিও) দিতে হবে। এছাড়া এনটিআরসিএর কাছে আবেদন না করায় একদিকে যেমন কলেজ শিক্ষক বঞ্চিত হচ্ছে অন্যদিকে প্রতি মাসে কলেজ ফান্ড থেকে নন এমপিও শিক্ষকদের সম্মানী হিসেবে মোটা অংকের অর্থ গচ্চা দিতে হচ্ছে । এতে কলেজের ফান্ড তলানিতে ঠেকছে। অথচ এক অজানা কারণে সেদিকে খেয়াল নেই কর্তৃপক্ষের কারো।
এমপিওভূক্ত শিক্ষকদের অনেকেই বলেন, কলেজ থেকে তাদেরই বেতন বাকি রাখা হয় মাসের পর মাস। সেখানে উদ্বৃত্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতাদির বিষয়গুলি পুণ:বিবেচনার সময় এসেছে।
এব্যাপারে কলেজের পরিচালনা পরিষদের সভাপতি পাইকগাছা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহেরা নাজনিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই। নিয়োগ সংক্রান্ত সরকারি বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এব্যাপারে কলেজের অধ্যক্ষ হাবিবুল্ল্যাহ বাহার বলেন, দীপ্তি দত্তকে তৎকালীণ পরিচালনা পরিষদ নিয়োগ দিয়েছিলেন। তবে নানা জটিলতায় একদিকে যেমন তার এমপিও হচ্ছেনা।
পক্ষান্তরে তাকে অব্যাহতিপূর্বক এনটিআরসিএ’র ই-রিকুইজিশনে চাহিদা পদে নামও পাঠানো যাচ্ছেনা। এতে করে উভয় সংকটে গত প্রায় ১৫ বছর বাংলা বিভাগের পদটি শূণ্য রয়েছে। আগামীতে পূর্ণাঙ্গ কমিটি হলে বিষয়টির সুষ্টু সমাধানে কার্যকরী ব্যাবস্থা গ্রহন করা হবে।