মঙ্গলবার, আগস্ট ২৫, ২০২৬

নারী দিবসের ভাবনা

  • শামীম আজাদ
  • ২০২৫-০৩-০৮ ২৩:১৪:০৩

নারীর স্তন্য পান করে, নারীর কোলে বড়ো হয়ে নারীর বিরুদ্ধে সেই স্তন নিয়েই এত সহিংসতা ও বিরূপতার কারণ কি? এই নারী দিবসে মেয়েরা, আপনারা কি ৩০ সেকেন্ড একটু চোখ বুঁজে ভেবে দেখবেন? 
তাদেরকে মনেপ্রাণে এভাবে নারীর প্রতিপক্ষ করে প্রথমে বড়ো করলো কে? কেন? আপনিই তো তাকে জন্ম দিয়েছেন। ক্ষুধার্ত হলে শত প্রতিকূল পরিবেশেও গোপন স্থান খুঁজে, তাকে আগলে, গা ঢেকে তার শিশু ঠোঁটে দুধভরা স্তনের বোঁটা তুলে দিয়েছেন। বোধ বুদ্ধি হবার সময় গান গেয়েছেন, ঘুমপাড়াতে গল্প বলেছেন, ভাষা শিখিয়েছেন, ব্যবহার শিখিয়েছেন।আপনার কোলে বসেই একটি কোমল মতি ছেলেশিশু নিয়েছে পৃথিবীর প্রথম পাঠ।আপনি যদি দুনিয়ার সব প্রতিকূলতা থেকে আগলে তাকে তখন বড়ো করতে পারেন তখন সমাজের এই কুশিক্ষাটি থেকে তখনই আগলাতে পারলেন না? সুযোগ পেয়েও তাকে ‘মানুষ’ করলেন না। মেয়েকে মেয়ে আর ছেলেকে ছেলেই করলেন, সমান মানুষ না! 
জানেন বিশ্বের প্রতি ৩জন নারীর ১ জন জীবনের কোন একটি সময়ে ঘরে প্রচন্ডভাবে সহিংসতার শিকার হচ্ছেন? বিশ্বে ২০ কোটি নারী যৌনাঙ্গচ্ছেদের মতো বর্বর প্রক্রিয়ার শিকার হয়। তথাকথিত 'পারিবারিক সম্মান রক্ষার' মতো মধ্যযুগীয় বিধির জন্যে প্রতি বছর বিশ্বে আত্মহত্যা করে ৫ হাজার তরুনী। 
তো আপনি আপনার আত্মীয় পুরুষটিকে বোঝাবেন কি করে? যুক্তি ও বাস্তব বিচারবুদ্ধি যে আপনার অস্ত্র তা তো এখানে কাজ করবে না। কারণ পুরুষের অস্ত্র পেশীশক্তি এবং পশুশক্তি। তাই বুদ্ধি, যুক্তি আর বাস্তব চিন্তার সঙ্গে না পেরে পুরুষ হিংস্র হয়ে ওঠে, সহিংসতা হয়ে ওঠে তার ভাষা আর অপব্যবহার করে  সবচেয়ে বড় অস্ত্র ‘ধর্ম’। পরাজিত পুরুষের সেটাই ঘরবাড়ি।সেটাই হয় মুখ্য শক্তির উৎস।
আমার প্রিয় কবি ও চিন্তক খলিল জীব্রানের লেখা ' চিলড্রেন' আমার বড়ো প্রিয়। বিশেষ করে যেখানে তিনি বাবামাকে লক্ষ্য করে লিখেছেনঃ
তুমি তীর আর ওরা ধনুক 
ওরা তোমাদের থেকে হলেও 
ওরা তুমি নও ...  মানে তোমা থেকেই সে উত্থিত হয় । 
আর আমাদের বাংলাদেশে একটা কথা প্রচলিত আছে : 
কাঁচাতে না নোয়ালে বাঁশ, 
পরে করে ঠাস ঠাস। 
নারী, ওরা কাঁচা থাকতেই তাকে নারী বান্ধব পুরুষ করে গোড়ে তোলার সুযোগ ছিল। এ শুধু ভবিষ্যতে আপনার পুত্রবধূ সুবিধা পাবে বলে নয়। সে নারীর অপার সম্ভাবনার জগত খুলে যাবে বলে। পৃথিবীতে অন্তত একজন মানবিক পুরুষ দিয়ে গেছেন বলে তার পুরো সমাজটাই সুন্দর থাকবে। লোকে বলবে ধন্যি মা। 
আমরা নারীরা এমন কেন? তা তো এত ছোট পরিসরে বলবার ক্ষমতা রাখি না। আমি শুধু আমার উপলব্ধির কথা বলতে পারি। একটি পূর্ণ বৃত্ত ধরেই গল্পচ্ছলেই বলি; একটি দেশে মেয়েদের অধিকার বা প্রাপ্তি  সে বৃত্তের কতটা? ছেলেদের তিন আর মেয়েদের হলো এক। বোধশক্তি হবার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি বোঝে সে নারী হিসেবে সবচেয়ে দরিদ্র, গরীব। তাঁর সম্বল ঐ চার আনা বা চারভাগের একভাগ মাত্র। সুতরাং ঐটুকুই যদি চলে যায় সে ভয়ে মুঠোর এমন শক্ত করে ধরে রাখে যে বলার না! এমনকি অন্য নারীকেও তাঁর ভাগ দিতে চায় না। পুত্রের কাছে তাদেরকেও শত্রু করে তাকে বড় করে তোলে। তারপর একদিন বৃদ্ধ হয়ে যখন নারী তা উপলব্ধি করে তখন মুঠো খুলে দেখে সেই চারভাগের একভাগ ক্ষমতাও এখন অচল। হায়! 
শেষে নারীর বিরুদ্ধে বিরূপতা দুটো কথা বলি। এক, ‘একটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজের নারীর জীবনের বহু বাস্তবতাই নির্ধারিত হয় পুরুষের মানসিকতা এবং তার ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক কর্মকান্ডের দ্বারা’ (সেলিম জাহান)। সুতরাং নারীরই দায়িত্ব নারীর প্রতি পুরুষের মনে শুধু ভালবাসা নয়  সঠিক মনোভাব গড়ে দেয়া। 
দুই, একজন পুরুষকে সে পুরুষ হবার আগে বিদ্যালয়েই নৈতিক জ্ঞান দিয়ে বুঝাতে হবে পৌরুষ্যের উৎস পেশী নয়, সংবেদনশীলতা ও বিবেচনাবোধ। 
সব শেষ কথা পৃথিবীর অর্ধেক যদি নারী করিতে পারে এবং অর্ধেক তার নর তবেই সমাজ এগুবে না হলে নয়।
এবারের নারী দিবসে উদ্যোক্তাদের কাছে একটা পরামর্শ রাখতে চাই। যত বেশি পারবেন পুরুষ বক্তা রাখুন। না পারলে নিজের বাবা ভাই জামাতা চাচা মামা যাকে পারবেন নিয়ে আসুন। আই এ্যাম সিরিয়াস। 
শুভ নারী দিবস।

 


এ জাতীয় আরো খবর