মঙ্গলবার, আগস্ট ১৮, ২০২৬

আমি কীভাবে বেঁচে আছি?

  • মোহন রায়হান
  • ২০২৩-০৮-০১ ১২:২১:৫২

মোহন রায়হান আর বেঁচে নেই
হয়তো সবাই গতকালই জানতে পারত
কিন্তু আমি বেঁচে আছি। 
সাওল হাট সেন্টারের সি ইউ কাজল ইসলামের কুলখানি শেষ করে তিলকপুর থেকে দুপুর তিনটায় আমি, সাওলের সাবেক এজিএম মিলন, ফটোগ্রাফার ফয়সাল, শাহিন ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হই।
প্রচন্ড গরম, অত্যাধিক মানসিক চাপ, এসিডিটি, সমস্ত পেট, ঘাড়, মাথা, গলা ব্যথা, পুরাতন আ্যজমার শ্বাসকষ্টে আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। ক্রমেই ব্যথা বাড়তে থাকে। মিলন, ফয়সাল ঢাকায় সাওলের  চিকিৎসকবৃ্ন্দ প্রফেসর ডাঃ সাখাওয়াত হোসেন, কার্ডিওলজিস্ট ডাঃ মুতাসিম বিল্লাহ, কার্ডিলজিস্ট ডাঃ ফারহান আহমেদ ইমনের পরামর্শ চাইলে তারা পথে কোথাও কোনো হসপিটালে নেমে ইসিজি ও টপনিন টেস্ট করাতে এবং গ্যাসস্ট্রিকের অসুধ খেতে পরামর্শ দেন। 
দুপচাচিয়ায় একটি হেলথ কেয়ার সেন্টারে নেমে সেগুলো করাই। সেন্টারটি তেমন মানের ছিল না। অনলাইনে ডাক্তাররা রিপোর্ট দেখে বগুড়া পৌঁছে ভাল একটি হাসপাতালে টেস্টগুলো আবার করার নির্দেশ দিলেন। একজন ডাক্তারকে দেখাতে বললেন। সেই মোতাবেক পপুলার বগুড়া শাখায় টেস্ট করিয়ে ডাক্তার দেখালে তিনি আমাকে তক্ষুণি হাসপাতলে ভর্তি হতে বলেন। 
টপনিনের রিপোর্ট পেতে দেরি হবে, ভেবে ফারহানের নির্দেশে হুইল চেয়ারে করে ওরা আমাকে আমার গাড়িতে তুলে, আমার খালাত ভাই বেলাল, যার বাসায় আমি আগের রাতে বিশেষ আতিথেয়তায় রাত্রি যাপন করেছিলাম, সেই বাসায় রেস্ট করাতে নিয়ে যায়। ডাঃ ফারহান আমাকে একসঙ্গে ৬টি ওষুধ খাওয়াতে বললে, ফয়সাল আমাকে সেগুলো খাইয়ে দেয়। আমি আমার ভাইয়ের স্ত্রী বিথী, মেয়ে অর্পার নিবিড় পরিচর্যায় ঘুমিয়ে পড়ি। 
তিনঘন্টা পর টপনিনের দ্বিতীয় রেজাল্ট পাওয়া মাত্র ডাঃ ফারহান ওদের নির্দেশ দেয় আমাকে যেন তক্ষুণি যেকোনো হাসপাতালে সিসিইতে ভর্তি করা হয়। রাত সাড়ে ১০ টায় আমাকে প্রায় অবচেতন অবস্থায় জিয়াউর রহমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আইসিউতে ভর্তি করানোর চেষ্টা করা হয়।
কিন্তু আইসিইর কোন সিট খালি ছিল না। ডাঃ ফারহান কানাডাপ্রবাসী আমার ছেলে সাহসকে ফোন করে অবস্থা অবহিত করে। 
সাহস তখনই বগুড়ায় তার সহপাঠী বন্ধু ডাঃ আবির হাসান দীপকে ফোন করে আমার অবস্থার কথা জানায়। দীপ, আমাদের বন্ধু বগুড়ার খ্যাতিমান চিকিৎসক অধ্যাপক ডাঃ মইনুল হাসান সাদিকের ছেলে। দীপের চেষ্টায় আইসিইউতে আমার ভর্তির পারমিশন হলেও বেড মেলেনি। বাধ্য হয়ে আমাকে সারারাত আইসিইর মেঝেতে অজ্ঞান পড়ে থাকতে হয়।
ভোর ৬টায় আমার ঘুম ভাঙলে আমি চোখ মেলে দেখি, সারারাত নিদ্রাহীন, রক্তজবার মতন লাল চোখ, অশ্রুসিক্ত, উদ্বিগ্ন, উৎকন্ঠিত, বিধ্বস্ত একেকজন- ডাঃ ফারহান, আমার বোন ফরিদা, ভাই জাপান প্রবাসী মুকুল, কবি ও সাংবাদিক আলমগীর নিষাদ, যারা ঢাকা এবং সিরাজগন্জ থেকে রাতেই রওনা হয়ে চলে এসেছে, ভাই বেলাল, আমার সফর সঙ্গী মিলন, শাহীন আর ফয়সাল সবাই  আমাকে ঘিরে বসে রয়েছে! 
আমার কিছু মনে নেই, আমি বুঝে উঠতে পারছি না। জিজ্ঞাসা করলাম, আমি এখানে কোথায় কেন? সমস্বরে সবাই বলল, হাসপাতালে। এরপরেই ওরা সবাই আমাকে তাড়াতাড়ি ধারাধরি করে  হাসপাতালের ট্রলিতে উঠিয়ে সিসিইউযুক্ত একটি এম্বুলেন্সে তুলে নিয়ে ঢাকায় রওনা হয়।
আমি অনেক কিছু জানার চেষ্টা করলাম কিন্তু ওরা সবাই আমাকে বলল, কথা বলা যাবে না। আপনি রেস্ট নেন, ঘুমানোর চেষ্টা করেন। ফারহান আম্ব্যুলেন্সের মধ্যেই আমাকে একটা ইনজেকশন দিল।
আধো ঘুম আধো জাগরণে সকাল ১১ টার মধ্যে ঢাকায় পৌঁছালে সরাসরি আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
আমার চিকিৎসা চলছে। চিকিৎসা বোর্ড আমাকে সম্পূর্ণ বেড রেস্ট দিয়েছে। নো টক, নো মুভ, নো কাজকর্ম, নো টেনশন, নো আ্যটেনডেন্ট। 
আজ সকাল ৭টায় ঘুম থেকে জেগে টয়লেটে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়াতে গিয়ে মাথা চক্কর দিয়ে শরীর কেঁপে বিছানায় পড়ে গেলাম। 
এরকম জীবন তো আমি চাইনি...
আমার পক্ষে কি এভাবে বেঁচে থাকা সম্ভব??


এ জাতীয় আরো খবর