শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৬

জা ফ র তা লু ক দা র

  • যুঝু
  • ২০২৩-১১-০১ ২২:৪৯:১৩

ছেলেবেলায় আমোদ-ফুর্তিতে শরিক হতে কোথাও একা যাবার রেওয়াজ ছিল না আমাদের। বিশেষ করে ট্রাকের পেছনে যেমন দশ হাত দূরে থাকুন কথা লেখা থাকে, আমার বেলায়ও তদ্রুপ খেটে যেত কথাটা। কিন্তু হঠাৎ একদিন প্রথাটা ভাঙলো মোতালেব স্যারের প্ররোচনায়। একটু খোলাসা করে বললে বিষয়টা পরিস্কার হবে। 

একসময় আমাদের বাড়িতে মৌলভি,তালবেয়ালিনের সঙ্গে একজন প্রাইমারি মাস্টার লজিং রাখার চল ছিল।বেঁটেখাটো মোতালেব স্যার আর যাহোক মানুষটা ভালো। বাড়ি দৈবজ্ঞহাটি। উনি আমাকে লোভ দেখালেন ষাড়ের যুঝু দেখার। গরু নিয়ে বরাবর হালচাল করতে দেখেছি কিষেণদের। দু'একটা পাগলা গরু অবশ্য থাকলেও থাকতে পারে। তাই বলে সেই নিরীহ গরু বাঘ-সিংহের মতো দাঁতমুখ খিচিয়ে যুদ্ধ করবে এটা কোনো কাজের কথা নয়। কিন্তু স্যার যখন বলেছেন তখন আর অবিশ্বাস করার জো নেই। আব্বার কাছে বায়না ধরতেই অনুমতি মিলল। মা পরাণ মানিকের মাথায় ফুঁ দিয়ে ছেড়ে দিলেন মাস্টারের হাতে। 
তখন পথঘাট অতো সুবিধার ছিল না। আমরা হেঁটেই রওয়ানা দিলাম। লাফিয়ে লাফিয়ে যতো চলি না কেন পথ আর ফুরোয় না। সরু কাঠির মতো দুখানা পা নাচার হয়ে যায় অবসাদে। কিন্তু মনের সাধে কোথাও ঘুরতে পারছি এমন একটা উত্তেজনায় ভুলে যাই সব কষ্টের
বিষ-পিঁপড়ার কামড়। 
মোতালেব স্যারের বাড়িতে ভালোই অভ্যর্থনা জুটল। বাবা-মা-ভাই-বোন মিলে আদর যত্নে মাথায় করে রাখল ভিন গাঁয়ের রোগাপটকা টিনটিনে মুখচোরাকে। মাছধরা আর ঘোরাঘুরির ফুর্তিতে কটা দিন ভালোই কাটল। অবশেষে হাটবারে সেই বিখ্যাত ষাঁড়ের যুঝু দেখার জন্য রওয়ানা দিলাম উত্তেজনায় কাঁই হয়ে। 
লোকে লোকারণ্য হয়ে গেছে বিশাল মাঠ। মাইকে ফাটাফাটি গান বাজছে। জিলাপি ভাজা ঘ্রাণে ভুর ভুর করছে বাতাস। সবাই চিৎকার করে ছাতা আর লাঠি নিয়ে নাচানাচি করছে। শুরু হয়ে গেল যুদ্ধের দামামা।  মাঠের মাঝখানে গলায় রঙিন মালা পরা দুটো ষাঁড় মহাক্রোধে মাথায় মাথা ঠেকিয়ে বেধড়ক ফুঁসছে। হৈ-চৈয়ের উত্তেজনায় শিং বাগিয়ে তারা ঝাঁপিয়ে পড়ল একে অন্যের ওপর। সময় বয়ে যায়। কেহ নাহি হারে। সমানে সমান। হঠাৎ চোখের পলকে কী ঘটল। শাদা রঙের চুটো ষাঁড়টা মওকা পেয়ে লাল প্রতিপক্ষকে গুঁতিয়ে দাবড়ে চলল মাঠের বাইরে। বিশাল গর্জনে জনতা ফেটে পড়ল। জয় হলো শাদার।
আমাদের গ্রামে সেসময় জালাল মাস্টারের খুব নামডাক। বড়বাড়ির লজিং মাস্টার বলে তার হাঁকের জোর ছিল উঁচু তারে বাঁধা। বিদ্যা জহিরের সঙ্গে নেচে বেড়াত তার বেতের লাঠির  কারিশমা। জালাল মাস্টারের প্রিয় ছাত্র মন্টু। তাকে যুঝুর জন্য তৈরি করেছেন ঝেড়েমুছে। মন্টু আমার সমবয়সী হলেও রীতিমতো বুদ্ধির জাহাজ। মোতালেব স্যার তার ভোঁতা ছাত্রটিকে ঘষেমেজে হাতালের সবচেয়ে অকেজো গরুটার সমকক্ষ করতে পারলেন না!
জালাল মাস্টার সুযোগটা কাজে লাগালেন। মন্টুকে সাজিয়ে-গুছিয়ে ঘোষণা দিলেন ষাঁড়ের যুঝুর। প্রতিপক্ষ সেই বিখ্যাত মুখটেপা অকেজাে গরু। মোতালেব স্যারের মনে কী ছিল কে জানে! বুক চেতিয়ে চ্যালেঞ্জটা নিলেন। বড় বাড়ির কাচারি ঘরে অনেক উৎসুক চোখের সামনে শুরু হলো পরীক্ষার লড়াই। প্রশ্নের পর প্রশ্ন। চাপা গর্জন আর ধমকে রীতিমতো জমে উঠল সেই বিখ্যাত শাদা আর লালের মরণপণ যুঝু। কে হারে কে জেতে! অনেক গুঁতোগুঁতির পর অকস্মাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে লাল দৌড়ে পালালো যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে। 
জালাল মাস্টারের আগুন চোখ ক্ষোভে-দুঃখে ছাই বর্ণ হয়ে গেল।


এ জাতীয় আরো খবর