দেশে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আট মাসে ৭৪৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও অভিযান পরিচালনা করেছে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। এসব অভিযানে মোট ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা এবং সাতটি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনা তদারকি ও ১ হাজার ২১০টি খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, মাসভিত্তিক অভিযানের সংখ্যা ও জরিমানার পরিমাণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য রয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে আটটি অভিযানে ছয় লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। মার্চে ৮৩টি অভিযানে জরিমানার পরিমাণ ছিল ৪০ লাখ ১০ হাজার টাকা। এপ্রিলে ৮৯টি অভিযানে জরিমানা আদায় হয় ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। মে মাসে ৮৫টি অভিযানে ২২ লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
জুনে ৮৪টি অভিযানে ১৯ লাখ টাকা জরিমানা ও একজনের কারাদণ্ড হয়। জুলাইয়ে ১১৯টি অভিযানে জরিমানা আদায় করা হয় ৪৮ লাখ ২৬ হাজার টাকা; এ মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আগস্টে ১৯৭টি অভিযানে জরিমানার পরিমাণ দাঁড়ায় ৮৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা। সেপ্টেম্বরে ৭৯টি অভিযানে ৫১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা এবং একজনের কারাদণ্ডের তথ্য জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
'অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য তৈরি,ভেজাল ও বিধিবহির্ভূত উপকরণ ব্যবহারের মতো অপরাধ অভিযানে উঠে এসেছে।' রাজধানীর বিভিন্ন খাদ্যপ্রতিষ্ঠানে অনিবন্ধিত ব্যবসা পরিচালনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার প্রস্তুত, লেবেলবিহীন মাছ-মাংস সংরক্ষণ এবং কর্মীদের স্বাস্থ্যসনদ না থাকার মতো অনিয়ম শনাক্ত করা হয়েছে।
বিভিন্ন জেলায় অভিযানে চানাচুর তৈরিতে পায়ে মাড়ানো, পোড়াতেল ব্যবহার, অনুমোদনহীন রাসায়নিক রং প্রয়োগ, উৎপাদনস্থলে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপস্থিতি এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের ঘটনাও ধরা পড়ে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে।
বিএফএসএর সদস্য (আইন ও নীতি) এবং চেয়ারম্যানের চলতি দায়িত্বে থাকা মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে জানান, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাঠপর্যায়ে তদারকি ও অভিযান আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগের মধ্যে কার্যক্রম সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে না। খাদ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণের প্রতিটি ধাপে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। খাদ্যের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং ক্ষতিকর রং, গন্ধ ও অন্যান্য অননুমোদিত উপাদানের ব্যবহার বন্ধেও গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রম চলছে।
খাদ্যস্থাপনা তদারকির আওতায় বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান এবং খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ, পরিবেশন ও বিপণনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি মানা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করছে কর্তৃপক্ষ।
খাদ্যপণ্যের মান যাচাইয়ে ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মসলা, শিশুখাদ্য এবং বেকারিপণ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের ১ হাজার ২১০টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়েছে।
এদিকে নিরাপদ খাদ্য সম্পর্কে মানুষের সচেতনতা বাড়াতে বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালানো হচ্ছে। এসব প্রচারে স্বাস্থ্যসম্মত খাদ্য উৎপাদন ও বিপণন, নিরাপদ খাদ্য গ্রহণ এবং ভোক্তাদের করণীয় তুলে ধরা হচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে অপরাধের ধরন ও মাত্রা অনুযায়ী অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অপরাধভেদে জরিমানার পরিমাণ এক লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা এবং কারাদণ্ডের মেয়াদ ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত হতে পারে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ড একসঙ্গেও দেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশে নিরাপদ খাদ্য আইন প্রণয়ন করা হয় ২০১৩ সালে এবং নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ গঠিত হয় ২০১৫ সালে। খাদ্য অধিকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর অংশ হিসেবেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
খাদ্যে ভেজাল ও জনস্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপাদান ব্যবহারের অপরাধে বিভিন্ন দেশেও শাস্তির বিধান রয়েছে। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান আইন, ২০০৬-এ অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা রয়েছে। চীনের আইনেও অনিরাপদ খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
বিএফএসএর মতে, অভিযান, নিয়মিত তদারকি, খাদ্য নমুনা পরীক্ষা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে। ভবিষ্যতে জেলা পর্যায়ে এসব কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য, ভেজালবিরোধী অভিযান, খাদ্য নিরাপত্তা