সোমবার, অক্টোবর ৫, ২০২৬

সোনাদিয়ার অবৈধ ঘের উচ্ছেদ হবে তো?

  • গাজী মোহাম্মদ আবু তাহের,
  • ২০২৬-১০-০৫ ২১:২৯:৪৪
ফাইল ছবি

আদালতের নির্দেশের পরও বহাল ঘের,প্যারাবন উজাড়;  নৌবাহিনীকে  সম্পৃক্ত  করে  এবার বড় অভিযানের উদ্যোগ!
মহেশখালী (কক্সবাজার)

সোনাদিয়ার প্যারাবন দখল: উচ্ছেদ হবে,নাকি আবারও ফিরে আসবে দখলদার?
একদিকে উচ্চ আদালতের  নির্দেশ, অন্যদিকে  একের পর  এক  প্রশাসনিক  অভিযান  তারপরও  থামছে না  মহেশখালীর প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন সোনাদিয়া দ্বীপে প্যারাবন ধ্বংস করে চিংড়িঘের তৈরির অভিযোগ।
বছরের  পর বছর ধরে ম্যানগ্রোভ বন কেটে, খাল ও জোয়ার-ভাটার পথ আটকে গড়ে উঠেছে একের পর এক  ঘের   কোথাও  বাঁধ  দেওয়া  হয়েছে,  কোথাও প্যারাবন  পুড়িয়ে  পরিষ্কার  করা হয়েছে। অভিযানে ঘেরের   অস্থায়ী  স্থাপনা ভাঙা হলেও অনেক ক্ষেত্রে
বাঁধ রয়ে গেছে। ফলে প্রশ্ন  উঠেছে এবার কি সত্যিই দখলমুক্ত   হবে   সোনাদিয়া, নাকি   উচ্ছেদের   পর আবারও   ফিরে  আসবে   ঘের?  সাম্প্রতিক  সময়ে সোনাদিয়ার অবৈধ চিংড়িঘের উচ্ছেদে নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।পরিবেশ,বন ও জলবায়ু  পরিবর্তন  মন্ত্রণালয়ের  প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনও  পাওয়া  গেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী  বিভাগ  ও  নৌবাহিনীর  সমন্বয়ে  অভিযানের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের উদ্যোগ চলছে।মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন,অবৈধ দখল উচ্ছেদের পাশা পাশি সোনাদিয়ার জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধারেও পদক্ষেপ নেওয়া হবে।  কিন্তু  মাঠের  বাস্তবতা  বলছে, কাজটি সহজ নয়।  সাত হাজার  একর   প্যারাবন  উজাড়ের অভিযোগ,  ২০২৬   সালের   জুনে    প্রকাশিত  এক প্রতিবেদনে বলা হয়,গত চার বছরে সোনাদিয়ায় অন্তত ৭  হাজার   একর   প্যারাবন  উজাড়  হয়েছে এবং ওই এলাকায়    প্রায়    ৮২  টি   চিংড়িঘের   রয়েছে।   উচ্চ আদালতের  নির্দেশ  থাকা   সত্ত্বেও  এসব  অবৈধ ঘের উচ্ছেদ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
আদালতের নির্দেশ, বাস্তবায়ন কতদূর?
সোনাদিয়া  ও  আশপাশের এলাকায়  ম্যানগ্রোভ বন ধ্বংস বন্ধ  এবং অবৈধ  চিংড়িঘের উচ্ছেদের বিষয়ে উচ্চ  আদালতের  নির্দেশ রয়েছে। ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবরের  নির্দেশেরপরও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি  এমন  অভিযোগ  এসেছে  সাম্প্রতিক  সময়ে। 
ফলে এখন বড় প্রশ্ন  আদালতের  নির্দেশ বাস্তবায়নে বাধা কোথায়? যদি আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও বছরের   পর বছর   ঘের  টিকে  থাকে, তাহলে  শুধু দখলদারদের দায়ী করলেই কি সমস্যার সমাধান হবে? দখল   ঠেকাতে   দায়িত্বপ্রাপ্ত   সরকারি  সংস্থাগুলোর নজরদারি, জনবল  ও  সমন্বয়ের ঘাটতি আছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
ঘেরের স্থাপনা ভাঙে,বাঁধ থাকে! সোনাদিয়ায় আগের অভিযানের  অভিজ্ঞতা  এই প্রশ্নকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে  তুলেছে।  একটি   অভিযানে   প্রশাসন   তিনটি চিংড়িঘেরের  অস্থায়ী  ঘর ও গুদাম উচ্ছেদ করলেও ঘেরের  বাঁধ  কাটা হয়নি। ফলে  ঘেরের মূল কাঠামো অনেকাংশে থেকে যায়।  শুধু ঘরের  কাঠামো সরিয়ে দিলেই  প্যারাবন  পুনরুদ্ধার  সম্ভব নয়। চিংড়িঘেরের জন্য নির্মিত বাঁধ ও বন্ধ জলপথ অপসারণ না করলে জোয়ার-ভাটার   স্বাভাবিক    প্রবাহ   বাধাগ্রস্ত   হবে। ম্যানগ্রোভ বনের ছোট ছোট খাল দিয়ে জোয়ার-ভাটা প্রবেশ  করাই  এই  বাস্তুতন্ত্রের প্রাণ। বাঁধ দিয়ে এসব জলপথ বন্ধ হলে বন ধীরে ধীরে প্রাণহীন হয়ে পড়তে পারে।এবারের অভিযান সফল কি না, তার মাপকাঠি শুধু কতটি ঘর ভাঙা হলো তা নয়।কতটি ঘেরের বাঁধ অপসারণ  করা  হলো, কতটি  খাল  পুনরুদ্ধার করা হলো  এবং কতটা  প্যারাবন  পুনরুজ্জীবনের সুযোগ পেল সেটিই হবে আসল হিসাব।
২৫ অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এরপর?
চলতি  বছরের মে  মাসে  সোনাদিয়ায় যৌথ অভিযানে সরকারি জমিতে নির্মিত ২৫টি অবৈধ কটেজ ও বিভিন্ন স্থাপনা   উচ্ছেদ   করা   হয়।   নৌবাহিনী, কোস্ট গার্ড, পুলিশ,   আনসার, পরিবেশ   অধিদপ্তর, বন  বিভাগ ও ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অভিযানে অংশ নেন। তখন প্রশাসনের   পক্ষ   থেকে   বলা  হয়েছিল, তালিকাভুক্ত অবৈধ কটেজ,  চিংড়ি  ও  কাঁকড়ার  ঘেরসহ   অন্যান্য দখলদার স্থাপনা  ধাপে  ধাপে উচ্ছেদ করা হবে। এখন সেই ঘোষণার বাস্তবায়নের দিকেই নজর স্থানীয়দের।
কটেজ  উচ্ছেদ  হয়েছে  ঘেরও  কি  উচ্ছেদ হবে? ঘের উচ্ছেদ হলে বাঁধও কি কাটা হবে?আর বাঁধ কাটার পর জায়গাগুলো   পুনরায়  দখল  ঠেকানো  হবে কীভাবে?
অবৈধ ঘেরের অর্থনীতি কত বড়? সোনাদিয়ার ঘেরকে ঘিরে   শুধু   পরিবেশের  প্রশ্ন  নয়, রয়েছে  বড় ধরনের অর্থনৈতিক স্বার্থও। চিংড়ি ও লবণ উৎপাদনের মাধ্যমে সোনাদিয়ার সরকারি বনভূমি অবৈধভাবে ব্যবহার করে বছরে বিপুল অর্থের বাণিজ্য হচ্ছে। 
মামলা হয়েছে,কিন্তু দখল থামেনি কেন?চলতি বছরের এপ্রিলে  সোনাদিয়া  ও  ঘটিভাঙ্গা এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন উজাড়  ও  দখলের  ঘটনায় বন বিভাগ ৩০ জনের বিরুদ্ধে মামলা করার হয়।একই সময়ে যৌথ অভিযানে অবৈধ   চিংড়িঘেরের   বিভিন্ন   স্থাপনা  উচ্ছেদে  করা হয়েছে।  এরপরও যদি নতুন করে প্যারাবন কেটে ঘের তৈরির ঘটনা ঘটে,  তাহলে প্রশ্ন ওঠে মামলা ও উচ্ছেদ কি   কেবল   বিচ্ছিন্ন  অভিযান, নাকি  এর সঙ্গে স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থাও থাকবে?
বন বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন,জনবল সংকটও বড়বাধা সোনাদিয়া দুর্গম এলাকা হওয়ায় বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের নজরদারিও কঠিন।  স্থানীয় দখলদারদের প্রতিহত   করতে   গিয়ে    বনকর্মীদের  ওপর  হামলার ঘটনাও  ঘটেছে   এবং  সংশ্লিষ্ট বিট  কার্যালয়ে কর্মরত জনবল  খুবই   সীমিত।  মাত্র   কয়েকজন  কর্মী  দিয়ে বিশাল প্যারাবন রক্ষা করা কঠিন।ফলে শুধু একদিনের অভিযান   নয়  স্থায়ী  পাহারা, পর্যাপ্ত  জনবল, নৌযান, নজরদারি  ও  দ্রুত আইনি  ব্যবস্থা ছাড়া সোনাদিয়াকে দীর্ঘমেয়াদে রক্ষা করা কঠিন হতে পারে।
রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ,চাই নিরপেক্ষ তদন্ত
সোনাদিয়ার   ঘের   দখলকে   ঘিরে   বিভিন্ন  সময়ে রাজনৈতিক  দলের নেতা-কর্মীসহ প্রভাবশালী ব্যক্তি দের বিরুদ্ধে  অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কিছু ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা তা অস্বীকার করেছেন।
তাই কারও বিরুদ্ধে অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে না   ধরে   সরকারি   জরিপ,  ভূমির   রেকর্ড, ঘেরের মালিকানা,  মামলা, স্থানীয়   সাক্ষ্য  এবং  সরেজমিন তদন্তের ভিত্তিতে প্রকৃত দখলদার শনাক্ত করা জরুরি।
রাজনৈতিক   পরিচয় যা-ই হোক,  সরকারি বনভূমি ও পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা দখলের বিরুদ্ধে একই আইনি  ব্যবস্থা  নিশ্চিত  করাই  হবে কার্যকর সমাধান।
সোনাদিয়ার সামনে এখন তিনটি বড় প্রশ্ন,সোনাদিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ভর  করছে  তিনটি বিষয়ের ওপর, প্রথমত, নৌবাহিনীসহ  সংশ্লিষ্ট  সংস্থাগুলোর  সমন্বয়ে  ঘোষিত বড় পরিসরের  উচ্ছেদ অভিযান বাস্তবে কবে শুরু হয় এবং কতটা কার্যকর হয়। দ্বিতীয়ত,শুধু ঘেরের ঘর নয়, অবৈধ বাঁধ, স্লুইসগেট  ও জলপথ বন্ধের অবকাঠামো অপসারণ   করে    জোয়ার-ভাটার   স্বাভাবিক  প্রবাহ ফিরিয়ে   আনা  হয়  কি না।   তৃতীয়ত, উচ্ছেদের পর পুনরায় যাতে  প্যারাবন  কেটে নতুন ঘের তৈরি না হয়, সে  জন্য  স্থায়ী  নজরদারি  ও  আইনি  ব্যবস্থা কতটা শক্তিশালী করা হয়।
সোনাদিয়া রক্ষার লড়াই এখন আর শুধু বন রক্ষার প্রশ্ন নয়;  এটি  আইনের  শাসন, সরকারি  সম্পদের সুরক্ষা, উপকূলীয় পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তার প্রশ্ন। আদালতের   নির্দেশ   রয়েছে,  সরকারি  উদ্যোগ রয়েছে, নৌবাহিনীকে  সম্পৃক্ত  করার সিদ্ধান্তও সামনে এসেছে।   এখন   প্রয়োজন   সেই   সিদ্ধান্তের  দৃশ্যমান বাস্তবায়ন।
সোনাদিয়ার মানুষতাই অপেক্ষায় অভিযান শুধু ঘোষণা হবে,নাকি সত্যিই কাটা হবে অবৈধ ঘেরের বাঁধ, ফিরবে জোয়ার-ভাটা,পুনরুজ্জীবিত হবে প্যারাবন? এই প্রশ্নের উত্তরই  নির্ধারণ  করবে, এবারের উদ্যোগ সোনাদিয়ায় আরেকটি সাময়িক উচ্ছেদ অভিযান হয়ে থাকবে,নাকি সত্যিকার অর্থে শুরু হবে দখলমুক্ত, জীববৈচিত্র্যবান্ধব সোনাদিয়া  পুনরুদ্ধারের  নতুন  অধ্যায়। “সোনাদিয়ার প্যারাবন   দখল: উচ্ছেদ   হবে,  নাকি  আবারও ফিরে আসবে দখলদার?”


এ জাতীয় আরো খবর